চমৎকৃত জয়দেব বলল, ‘তোর তো একটা দোকান রয়েছে তা হলে আবার তিন লাখ দিয়ে ঘর নিতে গেলি কেন?’
‘আমার ব্যবসার মালিক আমি একা হতে চাই। ভাইয়ের সঙ্গে পার্টনারশিপে দোকান চালাতে পারব না, বাড়িতে এই নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়ে গেছে। হাঁড়ি আলাদা, সিঁড়িও আলাদা হয়ে গেছে।’
জয়দেব বলল, ‘তোর তো দেখছি অনেকটা আমার মতোই ব্যাপার। আমার অবশ্য ঝামেলা এখনও শুরু হয়নি তবে শুরু হতে কতক্ষণ! আমাদের দোকানের ক-টা অংশীদার তা তো জানিস। কারোর সঙ্গে কারোর মনের মিল নেই। ভবিষ্যতে গণ্ডগোল বাঁধবেই। আমি সিওর এ ব্যাপারে। তাই ভাবছি আলাদা একটা কিছু করে এই জামাকাপড়ের দোকান থেকে বেরিয়ে যাব। রেডিমেড গারমেন্টসে এখন কোটিপতিরা এসে গেছে, ওদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারা যাবে না। জ্যাঠার যা ব্যবহার সত্যিকারের কর্মচারী হলে বরং সহ্য করা যায়।’
গৌরাঙ্গ বলল, ‘তা হলে তোর দোকানের শেয়ারটা বেচে দিয়ে গুডলাকে একটা ঘর নে। ভিমানী আমার বন্ধু, আমি বললে দিয়ে দেবে। জ্যাঠার সঙ্গে কথা বল।’
‘কী কথা বলব?’
‘বলবি আমার অংশটা বেচব আপনি কিনে নিন।’
সেদিন বাড়ি ফিরে জয়দেব তার বাবার সঙ্গে কথা বলল। বাবা অশক্ত, ডায়াবেটিসের রোগী, সঙ্গে উচ্চচ রক্তচাপ। বেশিরভাগ সময় ঘরেই কাটান। তিনি শুনেই বললেন, ‘আলাদা ব্যবসা করতে গেলে টাকা লাগে, পাবি কোথায় টাকা? তা ছাড়া দাদাই বা কিনবে কেন? যদি না কেনে তখন কী করবি? বাবা উইলে বলে গেছে তার বংশের বাইরের কাউকে দোকান বিক্রি করা যাবে না। আর যদি বিক্রি করতেই হয় তা হলে প্রত্যেক শরিকের কনসেন্ট নিতে হবে। রাজি হলেও ভাইয়েরা মনে হয় না বেচবে। তোর জ্যাঠা বাইরের কাউকে বেচতে কনসেন্ট দেবে না, জ্যাঠার কাছেই বেচতে হবে। বেচলে কত টাকা চাইবি ঠিক করেছিস? আগে সেটা ঠিক কর, তারও আগে ঠিক কর কীসের ব্যবসা করবি।’
জয়দেব পরদিনই জানতে চাইল গৌরাঙ্গর কাছে, কত টাকা দাম চাইবে সে।
গৌরাঙ্গ বলল, ‘দ্যাখ জয়, দোকানের আসল দাম ঠিক হয় লোকেশান, পজিশান আর স্পেস কতটা তার উপর, মালপত্র কত টাকার আছে সেটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। মার্কেটে যেখানে ঢোকার মুখেই তোদের দোকান, খদ্দেরের আসা-যাওয়ার সুবিধা দেখলে, যতটা জায়গা নিয়ে, তাতে কম করে কুড়ি লাখ তো দাম হবেই। কিন্তু দোকানের মালিক তো তোর জ্যাঠা আর বাবা। এখনও তো তুই ভাগীদার হোসনি। যদি তোর বাবা তার ভাগটা বেচে সেই টাকা তোদের তিন ভাইকে ভাগ করে দেন আগে সেটা ঠিক কর।’
তিক্তমুখে জয়দেব বলল, ‘হবে না। বাবাকে বেচতে দেবে না জনার্দন আর বিষ্টু। ওরা দোকানের কর্মচারী হয়েই নির্ঝঞ্ঝাটে থাকতে চায়। রোজগার বাড়াবার কোনো উদ্যোগ ওদের নেই।’
গৌরাঙ্গ হেসে বলল, ‘জানি, অনেকদিন তো তোর ভাইদের দেখছি। বিষ্টুটা তো মদ ধরেছে।’
‘কালও বাড়িতে রাতে ঝামেলা করেছে। সহ্য করতে না পেরে ঠেঙিয়েছি, আমাকে দেখে নেবে বলেছে। জ্যাঠাও ওকে আর ক্যাশে বসতে দেয় না, গোলমাল করেছে টাকাপয়সার। বাবাকে জ্যাঠা বলেছে যে, গুরু, আর একবার যদি দেখি ক্যাশে শর্ট পড়েছে বিষ্টুকে তা হলে আর দোকানে ঢুকতে দোব না। বাবা তো লজ্জায় মরে যাচ্ছে।’
‘একটা কাজ তো করতে পারিস, বাবাকে বল না দোকানটা পার্টিশান করে নিতে। দুই কর্তা বেঁচে থাকতে থাকতে কাজটা সেরে রাখা ভালো, তোর জ্যাঠতুতো ভাইয়েরাও তো এক-একটা বিষ্টু-জনার্দন। লাঠালাঠি শুরু হবার আগে সম্পর্ক ভালো থাকতে থাকতেই আলাদা হয়ে যা। জ্যাঠা তো আশির কাছাকাছি, এখনও শক্ত রয়েছে কিন্তু কতদিন আর থাকবে?’
জয়দেব গৌরাঙ্গর যুক্তিগুলোই বাবার কাছে পেশ করে বলল, ‘সাইজে ছোটো হয়ে যাবে ঠিকই তবে আমাদের ইচ্ছেমতো অন্য কিছুর ব্যবসা করতে কিংবা কাউকে লিজ দিয়ে দিতে পারব। যাক, সেটা পরের ব্যাপার, আগে জ্যাঠামশাইয়ের কাছে কথাটা পেড়ে দ্যাখো তো।’
গুরুচরণ দোকান ভাগের প্রস্তাব দেওয়ামাত্র এককথায় হরিচরণ রাজি হয়ে গেলেন, অবাক হয়ে গেলেন গুরুচরণ। তিনি ধরেই রেখেছিলেন শোনামাত্র দাদা তিরিক্ষে স্বরে বলে উঠবেন, ‘দোকান ভাগ? তোর মাথা খারাপ? উনিশশো তিরিশ সালে বাবা দোকান দিয়েছিলেন, এত বছর পর কী এমন ঘটল যে, সেই দোকান কেটে দু-আধখানা করতে হবে?’
ভাইয়ের মুখ দেখে হরিচরণ বললেন, ‘খুব অবাক হয়ে গেলি দেখছি! কোনো একদিন আমিই তোকে বলতুম, গুরু দোকানটা বিক্রি করে তেলেভাজার ছ-টা দোকান ছ-টা ছেলের জন্য করে দিয়ে চল কাশী চলে যাই। এরা দোকান রাখতে পারবে না। রাখতে গেলে টাকা ঢালতে হবে, ঝকমকে করে তুলতে হবে। নামি কোম্পানির দামি মাল না রাখলে ব্যবসা চালানো অসম্ভব।’
হরিচরণের দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দ শুনে মাথা নামিয়ে গুরুচরণ বলেন, ‘ছেলেগুলো যদি মানুষ হত। তবু জয়টার মধ্যে একটা চেষ্টা আছে দেখছি। দেখা যাক, ভাগ হয়ে যাবার পর ওর হাতেই দায়িত্ব তুলে দিয়ে বলব তুই এবার চালা।’
এরপর দু-জনে কথা না বলে, একজন জানলা দিয়ে বাইরে, অন্যজন মেঝের দিকে তাকিয়ে, মিনিট তিনেক বসে রইলেন। অবশেষে গুরুচরণ বললেন, ‘দাদা চলি।’
‘আয়। ওষুধ ঠিকঠাক খাচ্ছিস তো?’
৩
অন্নপূর্ণা অপেরার পর পর দুটো পালা বাজারে খেয়ে গেল। ‘ধনীর দুলালির মুখে চুনকালি’ আট লক্ষ টাকার এবং ‘তুমি ভারী দুষ্টু’ বারো লাখ টাকার ব্যবসা দিল ভবেশ সাহাকে। দূর গ্রামেগঞ্জে কানাইলাল অভিনয় শেষ করেই মোটরে ছুটেছেন আর এক আসরে নামার জন্য। এখন তিনি নামি অভিনেতা। সুদর্শন রোমান্টিক নায়ক চরিত্র দিয়ে শুরু করে এখন তিনি দুর্ধর্ষ খলনায়করূপে খ্যাতির মধ্যগগনে। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনে তার ছবি থাকে, নামের আগে লেখা হয় ‘নট দুলাল’। মোটরে দু-ঘণ্টার দূরত্ব হলে তিনি অভিনয় শেষে কলকাতায় বাড়ি ফিরে আসেন এবং ফেরেন প্রায় দিনই মত্ত অবস্থায়। ব্যস্ত জীবনের খাটাখাটুনির ধকল সামলাতে অবসন্ন শ্রান্ত স্নায়ুগুলোকে চাগিয়ে তুলতে তিনি মদ খেতে শুরু করেছেন।
