কামিনী বলেন, ‘আর যাত্রার হিরো হয়ে খুব বাড়িয়েছ মানসম্মান।’
‘মানসম্মান তো টাকা দিয়ে তৈরি হয়। সব ব্যাটা তো টাকাকেই খাতির করে। দ্যাখোনি যখন গাড়ি করে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যায় তখন পাড়ার লোক কীভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। দাদা তো সেকেন্ড হ্যান্ড অ্যাম্বাসাডার কিনেছে, আমি নতুন কিনব, শিবু গাঙ্গুলি নতুন একটা পালা লিখছে আমাকে হিরো করে। বলছে লেগে যাবে, আগুন জ্বালিয়ে দেবে। শুয়োরের বাচ্চচা ভবেশটাকে প্যাঁচ মেরে তখন মাইনেটা বাড়িয়ে নোব, তা হলেই নতুন গাড়ি।’
‘একেই বলে গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল! পালা এখন লেখা হচ্ছে তারপর আসরে নামবে, তারপর হিট করবে, তারপর ভবেশ সাহা মাইনে বাড়াবে, তারপর গাড়ি কিনবে। এসব চিন্তা এখন রাখো। সুধীরা ষোলোয় পড়বে সামনের মাসে, পাত্তর এখন থেকেই দ্যাখো।’
বড়ো মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজতে হবে ভেবেই অলস কানাইলালের মাথায় বাজ পড়ল। অবশ্য তিনি ভালোই জানেন এই কাজটি কামিনীবালা তার স্বামীর হাতে ছেড়ে দেবেন না, স্বামীর আনা কোনো সম্বন্ধই তার পছন্দসই হবে না এবং সব তিনি বাতিল করে নিজের মনোমতো পাত্রের সঙ্গেই সুধীরার বিয়ে দেবেন এবং তাই-ই দিলেন। কলুটোলার মধু শীলের নাতি জয়দেব নিউ মার্কেটে তাদের পঁচাত্তর বছরের রেডিমেড পোশাকের দোকানে বসতে শুরু করেছে। কামিনীবালা খোঁজ নিয়ে জেনেছিলেন, ছেলেটি সৎ চরিত্রের, নেশাভাঙ করে না, বি এ পাশ, দেখতে খুবই ভালো, ব্যবসাটা পারিবারিক, বংশটা বনেদি, বয়স চব্বিশ এবং স্বাস্থ্যবান। আর কী চাই? পাত্রটি যাতে হাতছাড়া হয়ে না যায় তাই ‘পাত্রী পছন্দ হয়েছে’ শোনামাত্র কামিনীবালা একমাসের মধ্যে ক্লাস টেন-এ পড়া সুধীরাকে পাত্রস্থ করে হাঁফ ছাড়েন।
কিন্তু হাঁফ ফেলার ফুরসত মিলল না কানাইলালের, মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা নিয়ে প্রস্তুত ছিলেন না, প্রস্তুত হচ্ছিলেন নতুন মোটর গাড়ি কিনে দাদাকে টেক্কা দেওয়ার জন্য। পাত্রের বাবার খাঁই মেটাতে তার জমানো টাকা তো বটেই, ভবেশ সাহার কাছেও হাত পাততে হয়। আগামী ‘হিট পালা’টির কথা ভেবে ভবেশ পঞ্চাশ হাজার টাকা অগ্রিম দেন। সদর দরজায় ঝকঝকে নতুন গাড়ি বাঁধা রাখার স্বপ্ন আবার যে কবে থেকে দেখতে শুরু করবেন এমন একটা ভাবনায় মুষড়ে হতাশ হয়ে পড়েন কানাইলাল।
হতাশাটা বউয়ের কাছে প্রকাশ করার সাহস না থাকায় মনে মনে গজরান আর ঝগড়া করে যান: ‘তোমার আর কী। শুধু তো পেট থেকে বাচ্চচা বার করা। তাদের খাওয়ানো, পরানো, লেখাপড়া শেখানো সবই তো আমার ঘাড়ে। বিয়ের জন্য এই যে দু-লাখ টাকা খরচ হল এটা তো আমাকেই জোগাড় করতে হয়েছে, এখন মুখের রক্ত তুলে ভবেশকে শোধ করতে হবে। প্রথা, সামাজিকতা, বংশের নিয়ম, মর্যাদারক্ষা তাই এই চাই, সেই দিতে হবে নইলে লোকে কী বলবে, তাই পাড়া প্রতিবেশী জ্ঞাতি গুষ্টি বন্ধুবান্ধবদের নেমন্তন্ন করে খাওয়াও, টাকার ছেরাদ্দ করো।’
কানাইলাল বিয়েথা চুকে যাবার পর একদিন কথা প্রসঙ্গে বউকে বলেন, ‘আচ্ছা ছেলের তো ঘড়ি আছে, জুতো ছাতাও আছে তবু বিয়ের সময় এসব চায় কেন বল তো?’
কামিনীবালা এককথায় স্বামীকে চুপ করিয়ে দেন, ‘তোমার বিয়ের সময়ও তো আমার বাবাকে ঘড়ি আংটি খাট বিছানা হিরের বোতাম দিতে হয়েছিল।’
২
শিবু গাঙ্গুলির লেখা ‘রামী চণ্ডীদাস’ পালায় রামী ধোপানির ভূমিকায় বহু টাকা খরচ করে আনা চিৎপুরের সেরা গায়িকা উৎপলা দত্ত এবং সেরা সুরকার তরুণ বেরা থাকা সত্ত্বেও ধোপে টিকল না। কানাইলাল প্রাণ ঢেলে ‘চণ্ডীদাস’কে জীবন্ত করে তোলার চেষ্টা করেন। পাবলিক কিন্তু এই গানের পালাটি নেয়নি। পরিষ্কার ফ্লপ করল। অন্নপূর্ণা অপেরার ড্রেসমেকার থেকে মেকআপ ম্যান সবাই একবাক্যে বলল : ‘অচল, একেবারে অচল। বছর তিরিশ আগে এসব চলত, এখন টেস্ট বদলে গেছে গ্রামের লোকেরও। ঢিমে তালের ক্লাসিকাল সুরে বাঁধা গান এখন তারা আর চায় না। টেঁটিয়া ডায়লগ, অ্যাকশন আর সেক্স দিয়ে গুঞ্জন অপেরার ‘জানোয়ার শ্বশুরকে সতীর লাথি’ দেখুন কীরকম ব্যবসা করে যাচ্ছে। শিবদাকে বলুন ভবেশবাবু ওইরকম পালা লিখতে।’
অন্নপূর্ণা অপেরার মালিক বোকা লোক নন, তিনি শিবু গাঙ্গুলিকে হুকুম দিলেন, ‘শ্বশুরবাড়ি জুতোরবাড়ি’ নামে একটা পালা দু-সপ্তাহের মধ্যে লিখে দিতে। ঠিক দু-সপ্তাহেই লেখা হয়ে এক মাসেই আসরে নেমে গেল ‘শ্বশুরবাড়ির জুতো বউয়ের বাড়ির ঝাঁটা।’ কানাইলাল ভিলেন শ্বশুরের ভূমিকায় দাপিয়ে অভিনয় করে তার হারানো জমি উদ্ধার করে নিলেন। তিন মাসেই শোধ করে ফেললেন দেনা। আবার তিনি নতুন মোটর গাড়ির স্বপ্ন দেখার জন্য তোড়জোড় শুরু করলেন।
নিউ মার্কেটে জয়দেবের ঠাকুরদা মধু শীল প্রতিষ্ঠিত দোকানের মালিক এখন তার দুই ছেলে হরিচরণ ও গুরুচরণ। দোকানের দায়িত্বে ও তত্ত্বাবধানে রয়েছেন বড়ো ছেলে হরিচরণ। দুই ভাইয়ের ছয় ছেলে। দোকানের মালিক ও অংশীদার হবে তারাই বাবাদের মৃত্যুর পর। এই ছয় জ্ঞাতি ভাইদের মধ্যে তিনজন দোকানে বসে এবং বেতন পায় কর্মচারীদের মতো। এদেরই একজন জয়দেব। সে বুঝে গেছে ছয়ভাগের একভাগ হয়ে থাকলে জীবনে স্বচ্ছলতার মুখ দেখা হবে না। জয়দেব উচ্চচাকাঙ্ক্ষী, ভেবে ঠিক করল তাকে আলাদাভাবে কিছু একটার ব্যবসা শুরু করতে হবে। সে খোঁজ নিতে লাগল এবং জ্যাম, জেলি, পেস্ট্রি, চকোলেট ইত্যাদির বিক্রেতা বন্ধু গৌরাঙ্গর দোকানে বসে গল্প করতে করতে শুনল নিউ মার্কেটের পাশেই ‘গুডলাক’ নামে চারতলা বাড়ি উঠবে, তাতে থাকবে শুধুই দোকান ঘর। ঘর ভাড়া নেওয়ার জন্য আগাম বুকিং শুরু হয়ে গেছে। গুডলাকের প্রোমোটার কেতন ভিমানী গৌরাঙ্গর পরিচিত। সে বাড়ির তলার বেসমেন্টে একটা কুড়ি ফুট বাই পনেরো ফুট ঘর বুক করে ফেলেছে তিন লাখ টাকা সেলামি দিয়ে।
