ঠিক যে জায়গায় দাঁড়িয়ে গোপাল বলেছিল তারক দেখল সেখানে দুটো মরচে ধরা মাখনের কৌটো পড়ে। গোপালের খুব ভাইটালিটি ছিল, এই কথা ভাবতে ভাবতে সে বাড়ির দিকে ফিরে চলল।
সদর দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। সাধারণত খিল দেওয়া থাকে। নতুন রান্নাঘরের একদিকের দেওয়াল গাঁথা হয়ে গেছে। বালি আর সিমেন্টে কিচকিচ করছে উঠোন। বৈঠকখানায় আলো জ্বলছে দেখে তারক দাঁড়িয়ে উঁকি দিল। চেয়ারে একটি রুগণ মেয়ে কাত হয়ে হাতলে হেলান দিয়ে বসে। কাঁদ থেকে আঙুল পর্যন্ত হাত, দুই কাঁধের পুট, বাহুর ডৌল, কণ্ঠা, হনু, সব মিলিয়ে তারকের মনে হল তেরো-চৌদ্দ বছরের গোঁপ না ওঠা একটি ছেলের মতো। রংটা মাজা। তাঁতের শাড়িটা মড়মড়ে ফোলানো-ফাঁপানো। উপরের বা নীচের মেয়েলি ঘাটতিগুলোকে সামাল দেবার জন্যই। তারকের দিকে সে তাকাল। চোখ দুটো ভাসা-ভাসা। সেই সময় দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিল সলিলের মুখ।
‘গুহ যে, কী ব্যাপার! অফিস যাওনি কেন? কতক্ষণ এলে?’
তারক যৎপরোনাস্তি অবাক হয়ে বলল। সলিল দ্রুত চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল, মেয়েটিও।
‘তারকদা অনেকক্ষণ বসে আছি।’
‘আজ হঠাৎ ডুব দিলে যে?’
তারক ঘরের মধ্যে এল। মেয়েটি গোছগাছ করে নিচ্ছে কাঁধের কাপড়। সলিল ওর দিকে হাত তুলে বলল, ‘এ হচ্ছে অনীতা। একটা দরকারে, মানে জরুরি দরকারে আমরা আপনার কাছে এসেছি।’
ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই অনীতা ঝটতি তারককে প্রণাম করল। বাধা দেবার জন্য সে ঝুঁকে পড়তেই দেখল ব্লাউজটা কোমর থেকে উঠে যাওয়ায় শিরদাঁড়ার একটা গ্রন্থি ফুলে রয়েছে। তারক অস্বস্তি বোধ করল। প্রণামটা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল বলে তার মনে হল।
‘আমাদের বাড়ির কাছেই থাকে। এবার পার্ট টু দেবে।’
‘ওহ তাই নাকি!’ চাউনিতে প্রশংসা মিশিয়ে তারক তাকাল। মেয়েদের চোখে সে বেশিক্ষণ চোখ রাখতে পারে না। সলিলকে বলল, ‘দাঁড়িয়ে কেন, বোস।’
‘বসছি।’
কিন্তু ওরা কেউই বসল না। সেটা তারকের ভালোই লাগল।
‘আমার বোনের সঙ্গেই পড়ে, খুব বন্ধু ওরা। আমিও ওদের বাড়ি অনেকদিন ধরেই যাচ্ছি।’
তারক মুখখানি স্মিত করে রইল। একবার ভাবল, রসিকতা করা যায় কি না। এই মেয়েটিকে দেখাবার জন্যই কি অফিস কামাই করেছে?
‘তারপর যা হয় আর কী।’ সলিল হাসবার চেষ্টা করল। অনীতা চোখ নামিয়ে নিল।
‘একটু বসো তাহলে। তোমার বউদিকে আজ আনতে যাবার কথা ছিল, কিন্তু যা বাসের অবস্থা, উঠতেই পারলুম না। রোববার ছাড়া যাওয়া যাবে না।’
‘বাচ্চচা কেমন আছে?’
‘ভালো।’ তারকের মন্দ লাগল না দেড়মাস বয়সি পুত্রের কুশল জানায় সলিলের আগ্রহে।
‘উনি প্রথম এলেন, যা হোক কিছু আতিথেয়তার ব্যবস্থা তো করতে হয়।’
এরপর যথারীতি টানাহ্যাঁচড়া শুরু হল কথাটা নিয়ে। অবশেষে, শুধু চা ছাড়া আর কিছু নয় এবং যেহেতু অনীতা অনেক কনিষ্ঠ তাই সম্বোধনে একজনকে তুমি, অন্যজনকে আপনি বলা চলবে না, এই দুটি সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তারক দোতলায় এল। তালা খোলার শব্দ পেয়ে বঙ্কুবিহারী তার ঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠল, ‘কে?’
‘আমি।’
‘যাসনি?’
‘না, এই সময় কি বাসে ওঠা যায়? ফোন করে বলে দিয়েছি রোববার যাব।’
তারক মনে মনে ঠিক করে রাখল, কাল অফিসে গিয়েই ফোন করবে।
‘আর এদিকে আমি গয়লাকে বলে এলুম-‘ ব্যস্ত হয়ে বঙ্কুবিহারী চটি পরতে পরতে বলল, ‘ওরা কারা, অনেকক্ষণ বসে রয়েছে?’
‘আমাদের অফিসেরই। মেয়েটির সঙ্গে ওর বিয়ে হবে।’
ঘরে ঢুকেই ঘড়ি দেখল তারক। চা খাইয়ে ওদের তাড়াতাড়ি বিদায় করেই বেরোতে হবে ইঞ্জেকসান নিতে। বাইরের লোকেদের জন্য বারো টাকা কিলোর চা আলাদা কিনে রাখা আছে। রেণুর বাপের বাড়ির লোকেরাই খায়। ক-মাস রেণু নেই, তাই ওদের আর আসার দরকার হয়নি। হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে চায়ের পাতা। আলমারি থেকে চায়ের কৌটো বার করে তারক গন্ধ শুঁকছিল এমন সময় দরজার কাছ থেকে সলিল বলল, ‘তারকদা একটা কথা আছে।’
চমকে তারক ফিরে তাকাল। এত নিঃসাড়ে উপরে উঠে এসেছে কেন? দেখে মনে হয় ভূতে পেয়েছে।
‘কী কথা?’
‘আপনার সেই ডাক্তারের কাছে একবার যেতে হবে।’
‘কোন ডাক্তার?’
সলিল ঘরের মধ্যে দু-পা এগিয়ে এল। হাত দুটো মুঠো করা নিশ্বাস দ্রুত, শব্দ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে।
‘তোমার আবার ডাক্তারে কী দরকার?’
‘তারকদা অনীতা প্রেগনান্ট, এর জন্য আমিই দায়ী।’
আনাড়ি অভিনেতার মতো কোনোক্রমে মুখস্থ সংলাপ বলেই সলিল হাত দুটো দেহের সঙ্গে সেঁটে কাঠ হয়ে রইল।
‘সে কী! কী করে হল? বলেই তারক বুঝল তার বলাটাও আনাড়ির মতো হল। কী করে হল, সেটা জিজ্ঞাসা না করলেও চলত। হতভম্ব ভাবটা কাটাতে, আপনা থেকেই মুখ থেকে বেরিয়ে পড়েছে। সামলাবার জন্য বলল, ‘তুমি এমন কাজ করে ফেললে, শিক্ষিত বুদ্ধিমান ছেলে হয়ে?’
‘বিশ্বাস করুন, আমি ওকে বিয়ে করব।’
‘তাহলে করে ফেল, ডাক্তারের কাছে যাওয়ার দরকার কী?’
‘লোকে বলবে কী যদি বিয়ের ছ-সাত মাস পরই বাচ্চচা হয়? বিয়ে হতে হতেও তো কিছুদিন লাগবে।’
‘লোকে বলবে কী।’ তারক পুরোপুরি বিরক্তি চাপতে পারল না। সলিল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। নাটকে লেখা নেই এমন একটা সংলাপ বলে তারক যেন তাকে বিপদে ফেলেছে। এবার কী বলতে হবে তার জানা নেই। কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ হুমড়ি খেয়ে সে তারকের পা জড়িয়ে ধরল।
