অবশ্য কেষ্ট সিঙ্গির জীবদ্দশায় শিল্ডটি মোহনবাগানের আর জেতা হয়নি। মারা যাবার আগে উইল করে বাড়িটি আধা-আধি দুই ছেলে নন্দলাল আর কানাইলালকে দিয়ে যান। বাঁদিকের অংশটি পান নন্দলাল, তিনি বি এ বি এল। একতলার ঘরটিতে সেরেস্তা সাজিয়ে ওকালতি করেন ব্যাঙ্কশাল কোর্টে। ফৌজদারি মামলার উকিল হিসাবে জমজমাট পসার করেন, প্রচুর অর্থও উপার্জন করেন। তার দুই ছেলে এক মেয়ে।
বাড়ির ডানদিকের অংশের মালিক কানাইলাল। তিন বছরের চেষ্টায় তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। বাবার মোহনবাগান সদস্য কার্ডটি সযত্নে রক্ষা করা এবং ধুতি পাঞ্জাবি পরার রেওয়াজটি বজায় রাখা ছাড়া সাংসারিক কোনো ব্যাপারে মনোযোগ দেননি। দেওয়ার দায়টা তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন স্ত্রী কামিনীবালার হাতে। কামিনীবালা চারটি কন্যা ও তিনটি পুত্র কানাইলালকে উপহার দিয়ে সংসারটিকে ভরভরন্ত ও একটি ডুবন্ত স্টিমারে রূপান্তরিত করেন। অবশ্য এজন্য তিনি একা দায়ী নন। তিনি বুদ্ধিমতী, বুঝে গেছলেন পুত্রকন্যাসহ ভেসে থাকতে হলে নিজেকেই হাল ধরতে হবে। হাল মানে আয় এবং আয় করার জন্য তিনি নজর দিলেন উঠোনটিতে এবং এইখান থেকেই শুরু হল ভাশুরের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং দুই পরিবারের মধ্যে তিক্ততার সূচনা যা ক্রমশই বেড়েছে।
কানাইলাল জনসমক্ষে রোজগেরে প্রমাণের জন্য ব্যবসা শুরু করেন। একতলার বাঁদিকের ঘরটা দাদার সেরেস্তা। ডানদিকের ঘরে বসে তিনি পুরোনো শিশিবোতল ও খবরের কাগজ কেনাবেচায় মন দেন। কম লাভের কিন্তু নিরাপদ ব্যবসা এবং মোহনবাগানের খেলা দেখার বিঘ্ন ঘটায় না। কানাইলাল সুখে থাকলেও কামিনীবালা ছিলেন না। সংসারে মুখ বাড়ছে আয় সামান্য। স্বামীকে পরামর্শ দিলেন উঠোনটা ভাড়া দাও।
বিভ্রান্ত কানাইলাল বললেন, ‘কাকে দেবে?’
‘যমকে দেবে।’ কামিনীর চাপা গর্জনে কানাইলাল আরও বিভ্রান্ত। ‘শিশি বোতল আর খবরের কাগজ বেচে সংসার চলে? ফুলির মা বলল হারু ডেকরেটর জায়গা খুঁজছে মালপত্তর রাখার, উঠোনটা ওকে ভাড়া দাও না।’
‘উঠোন তো আমার একার নয়, দাদারও। বাবা উইলে উঠোন ভাগ করে দিয়ে যায়নি। বুদ্ধিমান লোক কেন যে এই ভুলটা করলেন! ভাড়া দিতে গেলে দাদাকে জিজ্ঞেস করে দিতে হবে।’
কামিনী বললেন,’তা হলে দাদাকে জিজ্ঞেস করে এসো।’
কানাইলাল জিজ্ঞেস করতে গেলেন সেরেস্তায় নন্দলালের কাছে। শোনামাত্র তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন নন্দলাল।
‘একদম নয়। ভাড়াটাড়া দেওয়া চলবে না। ভাড়াটে বসানো মানে পাঁচজনকে জানিয়ে দেওয়া আমরা গরিব, সংসার চালাতে পারি না।’
দাদার ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বরে মিইয়ে পড়েন কানাইলাল। শুকনো মুখে ঢোঁক গিলে বলেন, ‘কথাটা তো ঠিক।’
‘কীসের ঠিক?’ ধমক দেন নন্দলাল। ‘আমার সংসার তো চলছে। তোর চলে না তাই বলে কি আমারও চলে না? এটাই লোকে জানবে? উঠোনটা জয়েন্ট প্রপার্টি। ভাড়া দিলে আমারও তো অর্ধেক মান অপমানের দায় ঘাড় পেতে নিতে হবে।’ নন্দলাল হতাশভাবে হাতের বইটা টেবলে ছুড়ে চেয়ারে শরীর এলিয়ে বললেন, ‘আড্ডা না মেরে, বাবুগিরি না করে, সিনেমার হিরো হতে গিয়ে পয়সা না উড়িয়ে, মোহনবাগান মোহনবাগান না করে, অমূল্য সময় কাজে লাগিয়ে যদি নিজেকে তৈরি করার দিকে মন দিতিস তা হলে আজ আর তোর এই অবস্থা হত না।’
কানাইলাল মাথা নীচু করলেন। চুল উঠে গিয়ে মাথায় টাক পড়তে শুরু করেছে। তপ্তকাঞ্চনের মতো গাত্রবর্ণ ছিল, এখন গাঢ় তামাটে। মুখের লালিত্য ফুলের শুকনো পাপড়ির মতো বিবর্ণ, নাকের দু-পাশে অভাব আঁচড় বসিয়েছে। কানাইলাল একসময় কান্তিময় সুদর্শন ছিলেন, তার ছিটেফোঁটা এখনও মুখে লেগে আছে। বিয়ের আগে তিনি একটি চলচ্চিচত্রে যুগ্ম প্রযোজক হয়ে টাকা ঢেলে নায়ক হন, ছবিটি একসপ্তাহ পর প্রেক্ষাগৃহ থেকে অন্তর্হিত হয়, আর ফিরে আসেনি। এই ছবির জন্য তার চল্লিশ হাজার টাকা দেনা হয়।
দাদার কাছে তিনি ঋণ চান। নন্দলাল তখন পরামর্শ দেন, ‘ধার করবি কেন বিয়ে কর। বনেদি বড়ো বংশের ছেলে, নিজের বাড়ি রয়েছে, দেখতে সুন্দর, চল্লিশ হাজার নগদ দিয়ে তোকে জামাই করার জন্য অনেকে টাকার থলি নিয়ে এগিয়ে আসবে। বলিস তো আমি মেয়ে দেখি।’
নন্দলাল পাত্রী নয়, পাত্রীর পিতাকে আবিষ্কার করেন। তারই মক্কেল বড়োবাজারের খ্যাংরাপট্টিতে মশলা আর মোমের আড়তদার যুগলচাঁদ পাইনের পঞ্চম কন্যা কামিনীবালাই সেই পাত্রী। যুগলচাঁদ নগদে, যৌতুকে ও গহনায় লক্ষ টাকা ব্যয় করে নিষ্কর্মা অলস কানাইলালকে সংগ্রহ করেন।
বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই কামিনী বুঝে যান তার নরম স্বভাবের বুদ্ধিহীন কিন্তু বনেদি গর্বে স্ফীত স্বামীটিকে চালনা করতে হবে তাকেই। কামিনীবালা মুখরা ও দাপুটে প্রকৃতির। নন্দলালের স্ত্রী সোনামুখী স্বামীকে বলেছিলেন, ‘ঠাকুরপোর জন্য ঠিক মেয়েকেই বউ করা হয়েছে। উঠতে বসতে ঝাঁটাপেটা করার মতো বউই দরকার ছিল তোমার ভাইয়ের। ভাগ্যিস সংসারটা একান্নবর্তী নয় তা হলে তো জান কয়লা করে দিত।’
কামিনীর তাড়নাতেই অর্থ উপার্জনের জন্য কানাইলাল তার এক বাল্যবন্ধুর সঙ্গে, চিৎপুরে অন্নপূর্ণা অপেরায় হাজির হন। সিনেমা-হিরোর ছাপ নামের সঙ্গে থাকায় গ্রামেগঞ্জে তার নামটা সামনে রেখে ব্যবসায়ে সুবিধা হবে ভেবেই কানাইলালকে তারা নায়ক করে নেন তাদের ‘নয়া আনারকলি’ পালায় সেলিমের চরিত্রে। আর কী আশ্চর্য, প্রচণ্ড হিট করল এই পালাটি। ডুয়ার্স থেকে ধানবাদ, চা-বাগান থেকে কয়লাখনি বিপুল ব্যবসা করল অন্নপূর্ণা অপেরা। কানাইলালের তখন রমরমা অবস্থা এই একটি পালা ঘিরেই। তখন তিনি বলেন, ‘দাদা উঠোনটা ভাড়া না দিতে দিয়ে ঠিকই করেছিল, সিংগি বাড়ির মানসম্মান লুটিয়ে যেত।’
