‘হয়েছে কী তোর?’
‘একটা বাজে স্বপ্ন দেখলুম।’
যতক্ষণ স্বপ্নটা থাকে ততক্ষণ সেটাকে সত্যিকারের মতোই সত্যি লাগে। বনানী উঠে গিয়ে জল খেল।
বাবা আর বাসু মুখোমুখি বসে খেয়ে গেল। মাথা নামিয়ে, কথা না বলে। বনানী তাকিয়ে রইল। তার মনে হল সে যেন নিজের দিকেই তাকিয়ে, ওদের মধ্য দিয়ে নিজেকেই দেখছে। মিনিট কেটে যাচ্ছে, আরও মিনিট রয়েছে, তারপর আরও মিনিট আসবে।
ওরা দু-জন নিঃশব্দে খেয়ে উঠে গেল, একজন নীচে, অন্যজন তার ঘরে।
বনানী খাওয়া শুরু করেছে, তখন ঘর থেকে মা বেরিয়ে এল। ওকে দেখামাত্রই সে আড়ষ্ট হয়ে গেল। একটুআগে দেখা স্বপ্নটা রেকর্ডের মতো মাথার মধ্যে বেজে উঠল। মাকে সে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল যেন সবকিছু বুঝে নিতে চায়। ঝুলে-পরা স্তন, এলোমেলো শাড়ি, না আঁচড়ানো চুল, চওড়া উঁচু কপাল নিয়ে করুণাকর চেহারা। সন্ত্রস্ত জানোয়ারের মতো অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে। ভয়ে যেন কুঁকড়ে রয়েছে।
সব জানি, এ কথাটা ওকে বলে কিছু লাভ আছে কি? ওর চাহনি থেকে বনানীর মনে হচ্ছে, সে ওর বিচারক, ওর জীবনে যেন তার রায়ের উপর নির্ভর করছে।
ওকে নিয়ে কী করবে? ফাঁসি নয় তো জেল!
ট্রেনের সেই পরিস্থিতি থেকেও যেন দমচাপা, ভয় পাওয়ানো সময় বনানী এখন যাপন করছে। মনে হচ্ছে পৃথিবী যেন ঘুরছে না, কোনো অস্তিত্বই নেই, শুধু মুখোমুখি তারা দু-জন ছাড়া।
বনানী এইবার বুঝতে পারছে,তাকে এই বাড়িতেই থাকতে হবে, মাকে দেখাশুনার জন্য। নতুন কোনো ঘটনা ঘটতে না দেবার জন্য। একমাত্র সে জানে ভয়ংকর সত্যটা। স্বপ্নে যা শুনল, সেটা সত্যি কিনা যাচাই করতে মাকে প্রশ্ন করে লাভ কী।
‘তুমি কি কিছু খাবে, একটু লেবুর জল?’
‘আছে লেবু? তুই বোস, আমি দেখছি।’
এ বাড়িতে কিরণের নাম আর যাতে উচ্চচারিত না হয়, তা দেখার জন্য বনানীকে থাকতে হবে। কিরণের স্বাস্থ্য, সজীবতা, উচ্ছ্বাস, লোভ কি মায়ের প্রতি এক ধরনের অপমান নয়?
এখন সে রান্নাঘরে গ্লাসে লেবু নিংড়োচ্ছে, তার জন্য জীবনে আর কী অবশিষ্ট আছে? লজ্জায় সারাজীবনই তো কাটাল। কুশ্রী হওয়ার জন্য লজ্জা, ভাঙা স্বাস্থ্যের জন্য লজ্জা। সেদিন কিরণ আর মায়ের মধ্যে কী কথা হয়েছিল, কখন বিষ মিশিয়েছিল, কোথা থেকে জোগাড় করেছিল, এসব নিয়ে সে কখনো প্রশ্ন করবে না। মা অনুমান করেছে যে আমি জানি, বনানী ভাবল, কথা মারফত বলার মতো জিনিস এটা নয়।
‘তুই একটু খাবি?’
‘দাও।’
এবার থেকে সর্বদা এখানেই কাটাব। গ্লাস হাতে নেওয়ার সময় বনানী এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মায়ের প্রতি তিক্ততা বোধ করলেও তাকে দায়ী করতে পারল না। সবাই অপরাধী, মাকে এই পর্যায়ে পৌঁছে দেবার জন্য।
মা লেবুজলের গ্লাসটা নিয়ে তার চেয়ারটিতে বসল। কী দুর্বল, রুগণ। বনানী ধারণা করতে পারছে না, সামনে চেয়ারে যে বসে সেই তার মা। চোখের সামনে ধীরে ধীরে একটার পর একটা বছর কাটবে আর মা বুড়ি হবে। সে নিজেও হবে। ছোটোমাসির মতো একা জীবন কাটাবে।
বনানীর দিকে তাকিয়ে মা গ্লাসে চুমুক দিল। এখনও তাকে লক্ষ করে যাচ্ছে, কিন্তু কৃতজ্ঞতার স্পর্শ চোখে লেগেছে।
বনানী জানে, মা আর সঙ্গীহীন, একা নয়।
কানাইলালের রেহাই
১
প্রাচীন বাড়িটার দুটো ভাগ। কাঠের বিশাল দুই পাল্লার ফটক দিয়ে ঢুকলে দু-দিকে দুটো ঘর, মাঝের জমিটা মাটির। তারপর একটা বড়ো উঠোন, এটিও মাটির। বাঁদিকের ঘরের পাশ দিয়ে উঠেছে চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ি। দোতলা থেকে চারতলা ছয়টি ফ্ল্যাট। বাড়িটার ডানদিক জরাজীর্ণ অবস্থায়। দু-হাত চওড়া ভিতের দেওয়াল থেকে চুনসুরকির পলেস্তরা খসে গিয়ে ইটে শ্যাওলা জমা। রেইন ওয়াটার পাইপের প্রতিটির নীচের দিক ভাঙা। কার্নিশে অশ্বত্থ গাছ একটু বড়ো হয়ে উঠলে হাত বাড়িয়ে উপড়ে ফেলা যতটা সম্ভব করার জন্য গাছগুলোর শৈশবাবস্থা কখনোই ঘোচে না। বড়ো বড়ো জানলাগুলোয় কাঠের খড়খড়ি। খড়খড়ির বহু পাখি ভেঙে পড়ে গেছে। জং ধরা পাল্লার কবজা এবং স্ক্রু-র মধ্যে সম্পর্কটা দু-পাশের শরিকদের মতোই আলগা, কোনোক্রমে নড়বড়ে আত্মীয়তা টিকিয়ে রাখার মতন। পুরোনো কাঠের সিন্দুক থেকে লেপ কম্বল ইত্যাদি বার করার সময় যে গন্ধ পাওয়া যায় বাড়িটির ডানদিকের অংশ তেমন একটা গন্ধ সতত ভেসে থাকে। এই বাড়ি তৈরি করেছিলেন পাট ব্যবসায়ী মরিস অ্যান্ড সিম্পসন কোম্পানির মুৎসুদ্দি বাবু কৃষ্ণকিশোর সিংহ।
মোহনবাগান যখন মহারাজা দুর্গাচরণ লাহার শ্যামপুকুরের মাঠে ফুটবল খেলত তখন কৃষ্ণকিশোর মোহনবাগানে সেন্টার হাফ ছিলেন এবং মুৎসুদ্দিগিরিতে শিক্ষানবিশি তার আগেই সতেরো বছর বয়সে শুরু করে দিয়েছেন। খুব দ্রুত তিনি বিত্তশালী হয়ে ওঠেন। ফুটবল খেলা ছাড়লেও ক্লাব তিনি ছাড়েননি। ত্রৈমাসিক আট আনা চাঁদা নিয়মিত দিয়ে সদস্যপদ ও মোহনবাগান-প্রেম বজায় রেখেছিলেন। এগারো নম্বর উপেন দত্ত রোডে পৈতৃক বারো কাঠা জমিতে এই দু-মহলা বাড়িটি তৈরি করে গৃহপ্রবেশ করেন যে বছর অর্থাৎ ১৯০৮-এ মোহনবাগান ট্রেডস কাপ জয়ের হ্যাটট্রিক করে। ক্লাবের এগারোজন ফুটবলারকে বাড়িতে নেমন্তন্ন করে ভূরিভোজ করান। এর তিন বছর পর মোহনবাগান আইএফএ শিল্ড জিতে বাঙালিদের এবং কৃষ্ণকিশোরের মগজে ভূকম্পন ঘটিয়ে দেয়। তিনি শান্তিপুর থেকে কীর্তন কুলনিধি শ্যামাপদ আচার্যকে আনিয়ে বাড়ির উঠোনে কীর্তন গাওয়ান, বাড়ির সামনে রাস্তায় মেরাপ বেঁধে যাত্রাপালা আর তরজা গানের আসর বসান, প্রায় দুশো কাঙালিকে এক আনা দক্ষিণাসহ খিচুড়ি খাওয়ান। তারা কেষ্ট সিঙ্গি আর মোহনবাগানের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে বলে ‘বছর বছর শিল্ড জিতুক।’
