‘মর্গে চলে যাবে?’
জবাব এল না। বনানী উপরে উঠে এল। মা চেয়ারে বসে ট্রানজিস্টারের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে। তাকে দেখেও যেন দেখল না। বনানীর মনে হল, আলতো একটা নিশ্চিন্তি যেন মায়ের মুখে। একবার জানতেও চাইল না, বাবা কী খবর নিয়ে ফিরেছে।
‘আমি খাব না রাতে।’
মা শুনতে পেল কি না, তা দেখার জন্য বনানী দাঁড়াল না। এখন তার জরুরি দরকার বিরাট গভীর ঘুম, নয়তো শরীর থেকে প্রত্যেকটি স্নায়ু খুলে খুলে পড়বে। আশ্চর্য, শোওয়ামাত্রই সে ঘুমিয়ে পড়ল।
৭
বাড়িতে না নার্সিং হোমে, হিরু কোথায় আছে বনানী তা জানে না। জানার জন্য সে সল্টলেকে গেছল। ফ্ল্যাটে বাচ্চচা চাকরটি ছাড়া কেউ নেই। সে বলতে পারল না কোথায় নার্সিং হোমটা। পার্ক সার্কাসে, এটুকু বনানীও জানে। কিন্তু একটা বিরাট এলাকায় খুঁজে বার করা সম্ভব নয়। নিশ্চয় ডজনখানেক নার্সিং হোম সেখানে আছে।
হিরুদের ফ্ল্যাটের ভিতরে ঢুকে বনানী কথা বলছিল চাকরটির সঙ্গে। তখন সে শোবার ঘরের দেওয়ালে একটি পরিবারিক ছবি দেখতে পায়। এক মহিলার কোলে বছর চার-পাঁচেকের একটি মেয়ে। মহিলাটি হিরুর মা নয়। বনানীর মনে হল, বোধ হয় হিরুর দিদিমা, যার মৃত্যুর কারণ হত্যা, না আত্মহত্যা, না দুর্ঘটনা, জানা যায়নি।
ফেরার সময় বনানী ভাবল কিরণের মৃত্যুটাও এইরকম হেঁয়ালি তৈরি করে রাখল। আত্মহত্যার পক্ষে সে বাস্তব কোনো যুক্তি খুঁজে পায়নি। তার বিশ্বাস দুর্ঘটনাও নয়। তা হলে বাকি থাকে যা সেটি নিয়ে ভাবতে তার ভয় করে। গত তিনদিন ধরে সে অপেক্ষা করেছে, এইবার হয়তো পুলিশ আসবে তদন্ত করতে। আসেনি। বাবা বলেছিল, না আসার ব্যবস্থা করবে।
কিরণের মরার ব্যাপারটা কেউ জানে না, শুধু তারা চারজন ছাড়া। অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়ার সময় পাড়ার লোকেরা কৌতূহলী হয়েছিল নিশ্চয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউ আর জানতে চায়নি, কেমন আছে। নন্দবাবু শুধু একবার তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল। বনানী সত্যি কথা বলতে গিয়েও বলেনি।
‘ভালো আছে।’
পরে শিউরে উঠেছিল। কোনো সূত্র থেকে নন্দবাবু যদি সত্যিটা জানে তা হলে কী ভাববে তার সম্পর্কে?
বনানী টাইপ স্কুল এবং টিউশনির পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখল। ঘরের আলোটা জ্বালতেই বিরক্তিতে মায়ের কপালে ভাঁজ পড়ল।
‘কী চাই? আমার শরীর ভালো নয়, বিরক্ত করিসনি।’
‘কিছু চাই তোমার?’
‘কী চাইব, চাওয়ার কিছু আছে কী?’
চোখে কঠিন চাহনি, স্বরে তিক্ততা। বনানী বুঝতে পারে বহু বছরের হতাশা এখন মাকে এই অবস্থায় এনে ফেলেছে। আমরা কি খোলামনে মা-র সঙ্গে কখনো কথা বলেছি? কখনো কি ওকে আমাদের দুশ্চিন্তার কথা বলেছি? পরিবারের বাইরের লোকের মতো কি ওর সঙ্গে ব্যবহার করা হয়নি? এসব কি মা লক্ষ করেনি?
কখনো কি মা সুখী হয়েছে? এমনকী ছোটোবেলাতেও মাসিরা তাচ্ছিল্য করত মাকে, তার কুশ্রীতার জন্য। যারা বলে সাব-জজের মেয়ে বলেই বাবা বিয়ে করেছে, তারা কি খুব ভুল বলে? শুরু থেকেই কি মা-র মনে এই ধারণাটা ছিল না, নাকি পরে চোখ খোলে?
জন্ম থেকেই মায়ের সঙ্গে, বনানীর মনে হল, অথচ হঠাৎ যেন সে আবিষ্কার করছে, কিছুই সে জানে না মায়ের সম্পর্কে। যখন মাকে বিচার করার মতো বোধ হল, বা যখন ওকে বিচার করে দেখতে চাইল, ততদিনে মা এখন যা তাই হয়ে গেছে। অতীতকে খুঁজে পাওয়ার কোনো রাস্তাই আর নেই।
‘কিছু খাবে?’
‘ব্যাপার কী, হঠাৎ এত দরদ?’
‘এমনিই, কেন জিজ্ঞাসা করতে নেই? বড়ো বেশি আজকাল তুমি একা থাকো।’
‘তা হলে এখন আমাকে একটু একা থাকতে দে।’
রান্না সেরে বনানী তার ঘরে না এসে, মা যা করে, ট্রানজিস্টার খুলে চেয়ারে বসল। সেতার বাজাচ্ছে কেউ। হিরু বলেছিল, সেতার শুনতে তার ভালো লাগে।
হিরুর কথা ভাবতে ভাবতে বনানীর ঢুলুনি এল। স্বপ্নের মতো একটা আচ্ছন্নতার মধ্যে সে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে। তার মনে হচ্ছে সে মায়ের ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে। ভীতচোখে মা তার দিকে তাকিয়ে। সে প্রশান্ত।
‘কী চাই তোর, কী বলতে এসেছিস?’
‘জানতে এসেছি।’
‘কিছুই জানার নেই।’
‘বিষটা? তুমি দিয়েছ, কীভাবে দিলে?’
‘মিথ্যে কথা। কী বলছিস তুই?’
আতঙ্কে চিৎকার করল মা, কেননা হাতমুঠো করে বনানী এগিয়ে এসেছে।
‘আমাকে মারবি?’
‘হ্যাঁ। কীসের সঙ্গে বিষ দিলে?’
দু-হাতে সে মায়ের কবজি চেপে ধরল। বাচ্চচাদের মতো সরু কবজি।
‘মারিস না।’
‘তা হলে বলো। আমি জানি তুমিই ওকে মেরেছ।’
উত্তর না দিয়ে উদভ্রান্ত চোখে মা তাকিয়ে রইল। ঠোঁটদুটো ফাঁক হয়ে রয়েছে চিৎকার করতে, কিন্তু করা হল না।
‘কেন মারলে?’
‘আমার সবকিছু ও নিয়েছে।’
‘কী নিয়েছে?’
‘আমার ছেলে, আমার স্বামী।’
‘ও রান্নাঘরে বসে ভাত খাচ্ছিল, তুমিও সেখানে ছিলে?’
‘হ্যাঁ।’
‘ও যখন বুঝতে পারল কিছু একটা শরীরে ঘটছে তখন তোমাকে বলেছিল।’
‘হ্যাঁ।’
‘ও কলঘরে গেছল। তখন তুমি দরজাটা বন্ধ করে দাও, যাতে বেরিয়ে এসে নীচে গিয়ে কারোর সাহায্য চাইতে না পারে।’
‘আমাকে কি ফাঁসি দেবে? তুই বলে দিবি না তো?’
ধড়মড়িয়ে বনানী উঠে দাঁড়াল। বাসু কর্কশ শব্দে চেয়ার টেনেছে। বাবাও এবার খেতে আসবে।
মুহূর্তের জন্য দিশাহারা হয়ে বনানী ভেবে পেল না, এখন সে কোথায়! কী ভয়ংকর স্বপ্নটা। বাসুর দিকে তাকিয়ে থেকে বনানী কল্পনা আর বাস্তবের মধ্যেকার তফাতটা বোঝবার চেষ্টা করল। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। এখন সত্যিকারের মনে হচ্ছে। এত বাস্তবিক। কথাগুলোর মধ্যে কোনটা আসল আর কোনটা বানানো সে ঠাওর করতে পারছে না। এমনও ঘটে নাকি স্বপ্নে! সত্যিই কি…
