চেয়ারে মা নেই। অথচ এইসময় বসে থাকে। রান্নাঘরে উঁকি দিল। মা ভাতের হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, ক্লান্ত দেখাচ্ছে, তবে সকালের মতো অতটা নয়।
‘তুমি রাঁধছ যে, কিরণ কোথায়, মাসির ওখানে আবার গেছে?’
‘না।’
‘তবে তাড়িয়ে দিয়েছ।’
কথাটা আপনা থেকেই মুখ এসে গেল। বহুদিন ধরে এটাই সে প্রত্যাশা করে এসেছে।
‘না। ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। দুপুরে ভাত খেয়েই ছটফট করে এলিয়ে পড়ে। আমি একা বাড়িতে। কী আর করব, তাই ওষুধের দোকানের নন্দবাবুকে ডেকে আনি। উনিই ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকিয়ে হাসপাতালে পাঠান।’
‘কতক্ষণ আগে?’
‘দুপুরেই।’
‘বাসু কোথায়? বাবা ফিরেছে?’
‘হাসপাতালে গেছে, আর জি কর-এ।’
‘খুব সিরিয়াস কিছু?’
‘কী জানি।’
তাচ্ছিল্যও নয়, ঔদাসীন্যও নয়, এমন এক স্বরে মা কথাটা বলেই বনানীর দিকে তাকিয়ে রইল। মুহূর্তের জন্য তার মনে হল, মা জানে। কী যেন গোপন করতে চাইছে।
‘ফুড পয়জন?’
‘হবে। বমি করেছে, পায়খানা করেছে।’
‘কী বলছিল?’
‘বলল, বাঁচতে চাই না, বিষ খেয়েছি। বাঁচাবার চেষ্টা তোমরা কোরো না। অনেকবার বলেছে।’
‘তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু শুনলে?’
‘কী করব আমি, কী করতে পারি তখন? নন্দবাবুকে ডেকে আনলাম।’
ঠিক এইভাবে হিরুর বাবা ঘণ্টা দুয়েক আগে তাকেই প্রশ্ন করেছিল। মিলটা অদ্ভুত রকমের। কী ধরনের উদবেগ হয় এবার বনানী বুঝতে পারছে। কিন্তু মা এমন নিস্পৃহ কেন?
কিরণের আত্মহত্যা করার কোনো কারণ, কোনো যুক্তি আছে কি? সে তার স্বভাব ও চাহিদা মতো সুখেই আছে। আপন বলতে কেউ নেই, দায়দায়িত্ব পালনের দাবিও নেই। দুটি পুরুষকে নিয়ে সে দিব্যিই আছে। বিষণ্ণতায় বা আবেগের তোড়ে অথবা পাপপুণ্যের দ্বন্দ্বে মানসিক ভারসাম্য হারাবে এমন সূক্ষ্ম মনও ওর নয় তা হলে?
‘নন্দবাবু যখন এল, তার সামনে কি ও এইসব বলেছে?’
‘না।’
‘শিশি বা কাগজটাগজ কিছু পড়ে আছে কি না দেখেছ?’
হাঁড়ি থেকে হাতায় ভাত চোখের কাছে ধরে পরীক্ষা করছে। বনানীর মনে হল, সময় নেবার জন্যই মা এটা করল।
‘কিছুই তো পাইনি।… তবে একটা হলদে ছোটো দোমড়ানো কাগজ যেন কলঘরের মেঝেয় দেখেছিলাম। সে তো ধোয়াধুয়ির সময় বেরিয়ে গেছে।’
‘তুমি ঠিক বলছ, ও বলেছে নিজে বিষ খেয়েছে?’
‘মিথ্যে বলা আমার স্বভাব নয়।’
এটা সত্যি নয়। বনানী জানে, মা নিজের অজান্তেই মিথ্যে বলে। বা সত্যিটাকে এমন বিকৃত করে যে চেনা শক্ত হয়।
‘বিষ খাওয়ার কোনো কারণ বলেছিল? কারোর নাম করেছিল?’
‘না। সকাল থেকে হাঁফ ওঠার মতো হচ্ছিল, আমি শুনেছিলাম। তখন ওকে খুব মনমরা দেখেছি।’
‘তুমি ভাত খেয়েছ?’
‘হ্যাঁ, অল্প।’
‘সেই ভাতই ও খেয়েছে?’
‘আবার কোথায় ভাত পাবে?’
মা যেন খানিকটা জোর ফিরে পেয়েছে। কতটা মিথ্যা বলছে তা আঁচ করতে না পারলেও কথার মধ্যে সাজানো ব্যাপারটা বনানীর কানে লাগছে।
‘এভাবে তুই আমায় প্রশ্ন করছিস কেন? আমার শরীর বলতে কিছু নেই, বিছানাতেই পড়ে থাকি, তোর বাবা আর ভাই নিজেদের মধ্যে আকচাআকচি করছে সারাদিনই বাড়িতে। আমি একা, তার ওপর তুই এইভাবে জেরা করছিস যেন আমিই বিষ দিয়েছি। আর কত সহ্য করব?’
মা হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠল। বনানী পায়ে পায়ে নিজের ঘরে এল। অন্ধকারটাও তার মুখস্থ। বিছানায় নিজেকে এলিয়ে দিয়ে অস্ফুটে ‘আহ’ বলল। ভোরে ঘুম থেকে উঠে আজ এই প্রথম সে শোবার সুযোগ পেল। সারাটা দিন… কী বীভৎস ভয়ংকর একটা দিন। চোখ বুজে আসছে, এখন সে কী ভাবতে পারে? হিরুকে না কিরণকে? মা কী করছে এখন? রান্না শেষ করে চেয়ারে বসবে আবার?
কিছুক্ষণ পর নীচে তালা খোলার শব্দ পেল বনানী। বাবা সেরেস্তা খুলছে। কিরণের খবর জানতে সে নীচে নেমে এল।
মোমবাতি জ্বলছে। বাবা ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে। কোর্টের পোশাক ছেড়ে যাবার সময় পায়নি, শোনামাত্রই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছল।
‘বাবা খবর কী?’
চমকে সিধে হয়ে বসল।
‘রাতটা কাটে কি না সন্দেহ। কোনো আশা নেই।’
‘কীভাবে ঘটল?’ বনানী বলল, ‘কেন খেল?’ সে নিশ্চিত, কিরণ জীবন ভালোবাসে, ভোগ করতে চায়।
‘আমি জানি না, তোর মাকে জিজ্ঞেস কর।’
‘দাদা কী ওখানে?’
‘ছিল, তারপর কোথায় গেল।’
‘ও কিছু করেনি?’
বাবা জিজ্ঞাসু চোখে প্রশ্নটা বোঝার জন্য কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। তারপর মাথা নাড়ল।
বনানী বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে। তার ঠোঁট কেঁপে উঠল। অপরিচিতের দিকে যেভাবে তাকায় সেইভাবেই সে বাবার দিকে তাকিয়ে। তার মনে হল বাবা কিছু যেন লুকোচ্ছে, মিথ্যে বলার জন্য তৈরি হচ্ছে।
‘দাদা কোনো গালমাল করেনি?’
‘না।’
‘থানা-পুলিশ হবে এইবার।’
‘না। সেসব ব্যবস্থা, মারা গেলে তখন করব। তোকে চিন্তা করতে হবে না। কাউকেই হবে না।’
কাউকেই বলতে, বাবা কাকে বোঝাল? মাকে?
‘তোমার সঙ্গে কি ওর সকালে কোনো কথা হয়েছিল?’
‘কে বলল?’
অপমানিত, অসুখী বাবা মর্যাদাকর একটা ভঙ্গি নেবার জন্য ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে।
‘কেন ও মরছে, তা কি তুমি জান?’
বাবা স্থিরদৃষ্টিতে মোমবাতির দিকে তাকিয়ে রইল। জবাব দিল না। দোতলায় এইমাত্র ট্রানজিস্টর খোলা হল। নারীকণ্ঠে কীর্তন গাইছে কেউ।
‘কাল ওকে পোড়াবার ব্যবস্থা করতে হবে।’
‘না। আমরা ওর বডি ক্লেম করব না বলে এসেছি। মনে হয় না কেউ আর ক্লেম করবেও।’
