নিশ্চয় হিরু কাউকে বলে আসেনি, তারা দু-জন ট্রেনে বেড়াতে বেরোচ্ছে। ব্যাপারটা লুকিয়েই। অবশ্য বলে এলেও ওর মা আপত্তি করত না।
কিন্তু হিরুকে যদি ওরা মেরে ফেলত? যদি অন্ধ করে দিত বা শিরদাঁড়া ভেঙে দিত? এই অজানা জায়গায় সে তখন কী করত? কী করে ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যেত? ব্যাগে তো গোটা তিরিশ মাত্র টাকা। তা ছাড়া মৃত হিরুকে বয়ে নিয়ে যাওয়া! এখানকার লোকেরা নিশ্চয় সাহায্য করত, পুলিশও এসে পড়ত।
ব্যাপারটা চিন্তা করতে করতে বনানী ট্রেনে সারাক্ষণ নিস্পন্দের মতো বসে রইল- কিছু ভালো লোক অবশ্যই আছে, যেমন প্ল্যাটফর্মের ওরা। জল এনে দিল, হিরুকে তুলে বেঞ্চে শুইয়ে দিল। হয়তো ওদেরই কেউ সঙ্গে আসত। অথবা প্রথমে হাসপাতালে তারপর লাশটা কোনো মর্গে পুলিশ পাঠাত। সে বসে থাকত সেখানে। পুলিশই খবর পাঠাত ওদের বাড়িতে। বাবা-মা না আসা পর্যন্ত সে ওইভাবেই বসে থাকত।
বনানী সন্তর্পণে পাশে বসা হিরুর দিকে তাকাল। রুমালটা মুখে চেপে মুখ নীচু করে বসে। দেখে কষ্ট হয়।
এখনও বেঁচে, আর কিনা ওর মৃত্যুর কথা ভাবছি! অপ্রতিভ হয়ে বনানী হিরুর বাঁ হাতটা চেপে ধরল।
‘আর একদিন আমরা আসব, তবে শোধ নিতে নয়, বুঝেছ?’
হিরু ঝিমোচ্ছে কিন্তু হাতে স্পন্দনটা দ্রুত। সেটা অনুভব করতে করতে বনানীর মনে হল, সে নিজেও বোধ হয় বেঁচে আছে।
শেয়ালদা থেকে ট্যাক্সিতে দু-জনে সল্টলেক পৌঁছল। যতই বাড়ির কাছাকাছি হচ্ছে, ভয়ে বনানীর বুক শুকিয়ে আসছে। হিরুই চিনিয়ে দিল বাড়িটা।
‘বাবা কখন ফিরবে?’
‘বাড়িতেই আছে।’
কলিং বেল টেপা এবং দরজা খুলে দেওয়ার মধ্যে সময়টুকুতে বনানীর মনে হল, তার চুল সাদা হয়ে যাবে।
হিরুর মা দরজা খুলেছে। প্রথমেই বনানীকে দেখে মুখে হাসি ফুটল। হাসিটা বিস্ময় এবং আতঙ্কে দ্রুত রূপান্তরিত হওয়া, বনানীর অনুমানমতোই ঘটল এবং পরবর্তী চাপা চিৎকারও।
এ কী! কে করল? কোথায় ঘটল?’
এক ছেলে হওয়ার যন্ত্রণার কথা হিরু বলেছিল। কিন্তু বাবা-মারও যে যন্ত্রণা একটি ছেলে থাকার জন্য কতটা হয়, বনানী নীরবে তা লক্ষ করে গেল। কথা বলার কোনো সুযোগই সে পেল না, পেলেও বলার ইচ্ছে তার নেই।
ট্যাক্সি আনা হয়েছে। হিরুর বাবার বন্ধু, মেডিকেল কলেজের এক অধ্যাপকের নার্সিং হোমে হিরুকে নিয়ে যাওয়া হবে পার্ক সার্কাসে। বাড়িতে পৌঁছনো পর্যন্ত হিরুর হাঁটা বা কথা বলার মতো সমর্থ ছিল, কিন্তু এখন ওর কষ্ট শুরু হয়েছে। ডান হাতটা ওরা ভেঙে দিয়েছে, নীচের ঠোঁট সেলাই করতে হবে। এবার যন্ত্রণা শুরু হয়েছে ডান পাঁজরে আর তলপেটে। মুখে কয়েক জায়গায় রক্ত জমে লাল ছোপ। চোখ প্রায় বন্ধ। কথাও বলতে পারছে না।
পাশের ফ্ল্যাটের একটি লোকের সাহায্যে হিরুকে ওর বাবা নীচে নামিয়ে এনে ট্যাক্সিতে তুলল। ওদের সঙ্গে যাবার জন্য বনানীও ট্যাক্সিতে উঠতে যাচ্ছিল। হিরুর মা, যিনি এতক্ষণ ওর সঙ্গে তিন-চারটির বেশি কথা বলেনি, বনানীকে হাত দিয়ে আটকাল।
‘এবার বাড়ি যাও।’
দরজাটা বন্ধ করে হিরুর মা পাশ ফিরে ছেলেকে জড়িয়ে ধরল। ‘পার্ক সার্কাস। জলদি।’
হিরুর বাবা গম্ভীর মুখে তাকিয়ে সামনে। ঘটনা সম্পর্কে যাবতীয় প্রশ্ন ছাড়া আর কোনো কথা বলেনি। ওরা দু-জনে ব্যাপারটা নিয়ে, স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ত, উদবিগ্ন থেকেছে।
তবু ট্যাক্সিটা চলে যাবার পর, বিরাট বাড়িটার গেটে একা দাঁড়িয়ে, নির্জন প্রায়ান্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বনানীর চোখে জল এল। কেন সে কাঁদছে তা সে জানে না। হিরুর নুয়ে পড়া বিধ্বস্ত শরীরের কথা সে ভাবছে না, এমনকী, ওর মায়ের কর্কশ ‘এবার বাড়ি যাও’ কণ্ঠস্বরও নয়। দুপুর থেকে যা কিছু হয়েছে, সবই তার কাছে অবাস্তব মনে হচ্ছে। নষ্ট, সবই নষ্ট, এমন এক বিশৃঙ্খল অনুভবে সে ভরে যাচ্ছে। বুঝে ওঠার চেষ্টা করল না, কেন এমন চিন্তা তার আসছে।
হঠাৎ তার চোখে ভেসে উঠল সকালে দেখা মাকে! খাবার টেবলে তার নিজের চেয়ারটিতে বসে, সামনে চায়ের কাপ। সকালে সে মাকে কখনো কিছু খেতে দেখেনি। দু-চোখের নীচে কালি, ফলে মনে হচ্ছিল চোখদুটি কোটরে ঢুকে আছে। মা অদ্ভুত চাহনিতে তাকিয়ে রয়েছিল রান্নাঘরের চৌকাঠে।
মা অসুখী। বনানী বাস ধরার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ভাবে, আমাদেরও অসুখী করে তুলেছে, কিন্তু তাই থেকে যন্ত্রণাভোগ মা-ই প্রথম করে। বাসু আর বাবাও করে। ওরা দু-জন এখন পরস্পরকে সহ্য করতে পারছে না। দু-জনের চোখেই জেদের চাহনি চেপে বসেছে। ছেলের থেকে বেশি কিছু কাণ্ডজ্ঞান বাবার ব্যবহারে ধরা পড়ছে না। যা করেছে সেজন্য বাবা লজ্জিত কিন্তু তাকে ধুলোয় লুটিয়ে দেওয়ার জন্য ছেলেকে কোনোদিনই ক্ষমা করবে না।
সম্ভব হবে তো? আমাদের পরিবারটা সত্যিকার পরিবারের মতো আচরণ করবে কি? একে অপরের মুখের দিকে খুশি চোখে, ভবিষ্যতের জন্য নির্ভরতা নিয়ে তাকাবে? বনানী চোখের জল মুছল। হিরুর জন্য নয়, মায়ের জন্যও নয়, সে বুঝতে পারছে নিজের প্রতি দয়া থেকে তার এই কান্না আসছে।
৬
লোডশেডিং তাদের তল্লাটে।
বাস থেকে অন্ধকারেই নেমেছে। ফুটপাথে কোথায় গর্ত, কোথায় কুকুর শুয়ে থাকে বা কোথায় মাথা তুলে আছে পাথর, বনানীর তা মুখস্থ। বাড়ির দরজাতেই হঠাৎ ছমছম করে উঠল তার শরীর। সেরেস্তা-ঘর বন্ধ। কিছু কি ঘটেছে? উঠোন থেকে সে দেখতে পেল খাওয়ার টেবলে হ্যারিকেন জ্বলছে। দাঁড়িয়ে কোনো শব্দ হয় কি না শোনার চেষ্টা করল। কিরণ বাসন বা বালতি কিংবা হাঁটার শব্দ করবেই। কিছুই সে শুনতে পেল না। তা হলে মা-র কিছু…। বনানী গাঢ় অন্ধকারের মধ্যেই ছুটে উপরে উঠল। হাঁটতে শেখা থেকে সে এই সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করছে। এখন শ্বাসপ্রশ্বাসের মতোই সে ভুলে গেছে বা দরকার হয় না লক্ষ করার।
