ওদের ঠেলে, পাগলের মতো বনানী জড়িয়ে ধরল হিরুকে। ফর্সা মুখ এবং গলা বেয়ে রক্তের ধারা নেমে লাল গেঞ্জিটায় বুকের স্থানে স্থানে কালচে করে দিয়েছে।
‘বাস্টার্ড…বাস্টার্ড।’
একটা লাথি বনানীর ঊরুতে লাগল। সে ব্যথা পেল না। হিরুর চুল মুঠোয় ধরে একজন ঝাঁকাচ্ছে।
‘ছাড়ুন ছাড়ুন ওকে আর মারবেন না। আমি ক্ষমা চাইছি, আর মারবেন না, ক্ষমা করুন।’
‘মাগো কী দশা করেছে!’
মেঝের বসা বুড়িটির দিকে কাতর চোখে বনানী তাকাল, মুখ তুলে, আরও কোথাও নিরাপত্তা ও সহানুভূতি আছে কি না খুঁজল।
‘নামিয়ে দে দুটোকে।’
‘বাঞ্চোত সভ্যতা শেখাতে এসেছে! প্রাণে মারিনি ওর বাবার ভাগ্যি। বাস্টার্ড বলা ঘুচিয়ে দিতুম।
আধ মিনিটের মধ্যেই স্টেশন এল।
‘নাম শালা, নাম।’
হিরুকে হাত ধরে মেঝের উপর দিয়ে হিঁচড়ে নিয়ে প্ল্যাটফর্মে ফেলে দিল। বনানীকে পিঠে ধাক্কা দিয়ে নামাল। সে ফ্যালফ্যাল করে কামরাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
‘এবার মুখোমুখি বসে থাক দু-জনে, কেমন!’
বনানীর চোখ জলে ভরে আসছে। আবছা দেখাচ্ছে মানুষগুলো। ট্রেনের দরজায় জানলায় নড়াচড়া করছে শুঁয়োপোকার মতো মুখ। ওরা কী বলছে সে বুঝতে পারছে না। হিরু পা ছড়িয়ে মুখ নীচু করে প্ল্যাটফর্মে বসে। বনানী শুধু শুনতে পাচ্ছে একটা কাতরানির শব্দ। হাঁটু মুড়ে সে ওর পাশে বসল।
‘বাস্টার্ড।’
হিরু শান্ত হও।’
ট্রেনটা নিঃশব্দে ছেড়ে চলে গেল ওদের রেখে দিয়ে।
এবার সে কী করবে?
কৌতূহলী তিন-চারজন এগিয়ে এল। তারা এই ট্রেন থেকেই নেমেছে।
‘অ্যাক্সিডেন্ট নাকি? ট্রেন থেকে পড়ে গেছে?’
বনানী মাথা নাড়ল।
‘কতকগুলো ছেলে ওকে মেরে নামিয়ে দিল। ডাক্তারখানা আছে এখানে?’
‘এই দুপুরে ডাক্তারবাবু কি আর বসে থাকে?’
‘ফেরার ট্রেন কি এখন আছে?’
‘ঘণ্টাখানেক পর পাবেন।’
বনানী ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, ‘উঠতে পারবে?’
ঝিম ধরে বসে আছে হিরু। জবাব না দিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়েই কাতরে উঠল। দুটি লোক এগিয়ে এসে বগলের নীচে হাত দিয়ে টেনে তুলতে যেতেই ও প্রায় চিৎকার করে উঠল যন্ত্রণায়। নীচের ঠোঁট ফেটে ঝুলে পড়েছে। ডান হাতটা কনুই থেকে নড়নড় করছে। নাকের নীচে রক্ত। মুখটা ফুলে উঠে চোখ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
স্টেশনের চায়ের স্টল থেকে একজন মগে জল আনল। বনানী রুমাল ভিজিয়ে মুখ থেকে রক্ত মুছিয়ে দিল।
‘হাড়টাড় ভেঙেছে বোধহয়। বেঞ্চে শুইয়ে দিচ্ছি। এরপরের ট্রেনেই আপনারা কলকাতায় চলে যান।’
লোকগুলি অযথা কোনো প্রশ্ন করল না বা সমবেদনা জানাল না। যেন এসব ঘটনায় খুবই অভ্যস্ত। পাঁজাকোলা করে হিরুকে প্ল্যাটফর্মের একটা বেঞ্চে শুইয়ে দিয়ে তারা চলে গেল।
ঘড়ি দেখার জন্য হাতটা তুলে বনানী দেখল কাচ ভেঙে গেছে, একটা কাঁটা নেই, ঘড়িটা বন্ধ। হিরুর হাতে ঘড়ি নেই, যেহেতু পরে না।
‘ঘড়ি মানেই কাজ, ব্যস্ততা, রুটিনমাফিক চলা। এসব আমার ভালো লাগে না।’
এখন নিশ্চয়ই দুটো-আড়াইটে। কলকাতায় যেতে অন্তত পাঁচটা বেজে যাবে। কী করবে সে পৌঁছেই? বনানী দিশাহারা বোধ করতে লাগল। এখুনি চিকিৎসা দরকার। এক্স-রে করতেই হবে। হাসপাতালে নিয়ে যাবে কি? শেয়ালদা স্টেশনের কাছে নীলরতন হাসপাতাল। নাকি বাবা-মার কাছে পৌঁছে দেবে।
চোখ বুজে হিরু শুয়ে। ওকে যেন আরও লম্বা দেখাচ্ছে। ডান হাতটা শরীরের পাশে রাখা। গভীর নিশ্বাস-প্রশ্বাসে ওঠানামা করা বুকের দিকে তাকিয়ে রইল। বড়ো রোগা। বনানী আলতোভাবে বুকে হাত রাখল।
চোখ খুলে হিরু তাকাল।
‘কষ্ট হচ্ছে? ব্যথা করছে?’
হাসার চেষ্টা করতেই বীভৎস হয়ে উঠল হিরুর মুখ। কিছু একটা বলতে চাইছে। বনানী ওর মুখের কাছে কান আনল।
‘বুল… ওয়ার্কারটা… এবার…’
‘কথা বোলো না। উঠতে পারবে?’
‘হ্যাঁ।’
বনানীর সাহায্যে ধীরে ধীরে উঠে বসল ও। ইশারায় জানাল জল খাবে। চায়ের স্টল থেকে গ্লাসে জল আনল বনানী। কোনোক্রমে হিরু ঠোঁট ফাঁক করল। সে জল ঢেলে দিল।
‘কোথায় ব্যথা?’
মাথা নাড়ল ও।
‘আমরা ফিরে যাব।’
‘এই প্রথম… মারামারি।’
হিরুর ফুলে ওঠা মুখ কয়েক সেকেন্ডের জন্য কঠিন হল।
‘মার খেলাম।… গায়ে জোর নেই।’
‘তোমার বড্ড রাগ, ওটা কমাও।’
‘আবার আসব, এক বছর দু-বছর যতদিন হোক।’
বনানীর বুকের মধ্যেটা ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে যেতে শুরু করল। হিরুও তা হলে অতি সাধারণভাবেই বাঁচার পন্থা চাইছে। সেই সাধারণ রাগ, মান অপমানবোধ, প্রতিশোধ-ইচ্ছা-বাসুর মতোই। হয়তো এই ঘটনাই ওর জীবনকে অন্য খাতে বইয়ে দেবে। বহু বছর পর ও কি এটা বুঝতে পারবে? একটা সুন্দর মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারত।
‘টিকিট কেটে আনছি।’
বনানী উঠে দাঁড়াল। অসহ্য একটা শান্ততা চারিদিক বিরাজ করছে। ঝাঁ-ঝাঁ রোদ, ফুরফুরে হাওয়া এবং বিস্তৃত মাঠ ও আকাশ অবসন্নতা এনে দিচ্ছে। চিবুকে ঘামের ফোঁটা। ট্রেনের লাইন ধরে সোজা তাকালে মন বড়ো নিঃসঙ্গ বোধ করে। ট্রেনের জন্য কিছু যাত্রী এসেছে।
‘কেমন দেখাচ্ছে? বিয়ের বরের মতো?’
‘রুমালটা মুখে চেপে রাখো।’
বনানী হেসে ফেলল। হিরু আবার ছেলেমানুষ হয়ে গেছে। এইরকমই ও থাকে না কেন! সবাই থাকে না কেন? কিরণের মতো খুশিয়াল মেজাজে, হালকা হাসিঠাট্টার মধ্যে। মা, বাবা, বাসু পারে না একসঙ্গে বসে গল্প করতে, যেমন হিরুদের ঘরে হয়। হিরুর বাবা-মা ওকে দেখেই কী কথা বলবে? কী করবে? ডাক্তার, হাসপাতাল বা নার্সিং হোম। তাকে কিছু বলবে কি? বনানী ক্রমশ এই চিন্তায় মুহ্যমান হয়ে পড়তে লাগল।
