‘তাই বলে ধানগাছে তক্তাটক্তা হয় বোলো না যেন।’
‘ওরে বিল্টু, খাট করবি ধানগাছের তক্তায়? দারুণ মজবুত হবে।’
হিরুকে স্পষ্টতই আড়ষ্ট হয়ে যেতে দেখল বনানী। এরা জ্বালাতন করবে যতক্ষণ থাকবে। কতক্ষণ থাকবে কে জানে।
‘এবার খুব ধান হবে।’
‘মনে হয়।’
হিরু গম্ভীর হয়ে গেছে। হাওয়ায় চুলগুলো থরথর উড়ছে। কপালের উপরে কয়েকটা। বনানীর ইচ্ছে করছে কপাল থেকে সরিয়ে দিতে।
‘চালের দাম কমলে, অন্য জিনিসেরও দাম কমবে।’
বনানীর চিবুক আবার হিরুর আঙুলে ঠেকল। হিরু হাতটা সরিয়ে নিল।
‘অন্য কম্পার্টমেন্টে উঠলে হত, যাবে পরের স্টেশনে?’
‘না।’
জেদি ছেলের মতো হিরু শক্ত হয়ে বসে। ট্রেন মন্থর হচ্ছে। বনানীর পাশের লোকটি উঠল।
‘পেয়েছি রে একটা, অ্যাই আমি আমি…গৌতম ভালো হবে না বলছি।’
দুটি ছেলের মধ্যে হাত ধরে টানাটানি চলল। একজন হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বনানীর পাশে বসে দাঁত বের করে হাসল।
কে একজন মন্তব্য করল, ‘মুখোমুখি নয়, পাশাপাশি হল।’
‘রাগ হল বুঝি। আয়, আয়, বোস তা হলে।’
‘থাক উঠতে হবে না, জায়গা হয়ে যাবে। একটু সরে বসুন তো, সরুন সরুন…’
ছেলেটি তার সদ্য-বসা সঙ্গীর পাশের লোকটির হাঁটু ধরে টানল। লোকটি যতটা সম্ভব সরে সামান্য জায়গা করে দিল। কোনোক্রমে ছেলেটি তার পাছা রাখার সুযোগ পেল, এবং তার সঙ্গীর চাপ পড়ল বনানীর উপর। সে জড়োসড়ো হয়ে কুঁকড়ে বসল।
‘এ কী! আপনারা এভাবে বসছেন কেন? দেখছেন না কী অবস্থা হল।’
হিরুর তীক্ষ্নস্বরে, রাগ এবং বিরক্তি ঝাঁঝিয়ে উঠল। যাত্রীদের অনেকেই এদিকে মুখ ফিরিয়ে। ছেলেদুটি যেন মজা পেয়েছে, এমনভাবে দাঁড়িয়ে-থাকা সঙ্গীদের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে মুখ টিপে হেসে হিরুর মুখে দৃষ্টি দিল।
এরা সময় কাটাবার একটা ছুতো চায় এবং তা পেয়ে গিয়ে খুশি। বনানীর বুক ঢিপঢিপ করে উঠল। হিরু যেন বোকামি না করে, যেন না রাগে, যেন আর কথা না বাড়ায়। এরা তপ্ত শারীরিক ঝঞ্ঝাটের মধ্যে ঝাঁপাতে চায়, এটা ওদের খেলা। এরা বাদুড় জাতের। হিরু বাংলার বাইরে থেকে এসেছে, নিঃসঙ্গ জীবনের মধ্য দিয়ে বড়ো হয়েছে, ও এদের বুঝবে না। দুর্বল, শীর্ণ হিরু মস্তিষ্ক চায়।
‘হল কী দাদা, অত চটছেন কেন? আপনি নিজেও তো ঠেলেঠুলে জায়গা করে ওনাকে বসিয়েছিলেন, সেটা কি ভুলে গেছেন?’
কামরার অন্য প্রান্ত থেকে একজন বলল, ‘নিশ্চয় শেয়ালদা থেকে উঠেছে।’
‘কিন্তু এইভাবে কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো অন্যের অসুবিধা করে নয়।’ বনানী আবার চাপ দিলে হিরুর পায়ে। কিন্তু ও সেটা গ্রাহ্যে আনল না।
‘কাণ্ডজ্ঞানহীন ব্যাপারটা কী দাদা? এ লাইনে নতুন উঠেছেন বুঝি? এভাবেই বসা হয়।’
দাঁড়িয়ে থাকাদের একজন বলল। বাকিদের চোখেমুখে সায় আছে। ‘না বসা হয় না। অন্যের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের দিকে নজর দিতে হয়, সেটাই সভ্যতা।’
‘মানে! আমরা অসভ্য, ট্রেনের এত লোক অসভ্য?’
‘আমি কাউকে অসভ্য বলিনি।’
‘আমাদের সভ্যতা শেখাতে এসেছেন? বাড়ি কোথায়?’
‘শুনলুম তো গোচরণে যাবেন। ওই মেয়েটিই একজনকে বলল। তা হলে এ লাইনে কোথায় যাচ্ছেন? এটা তো ডায়মন্ডহারবার লাইন নয়।’
আর একজন পুরোনো যাত্রী বলল। বনানী প্রত্যেক যাত্রীর মুখে মজা এবং কৌতূহলের ছায়া দেখতে পাচ্ছে। এরা সবাই এখন তাদের কোণঠাসা করে এক ধরনের নীরব উল্লাস ভোগ করবে।
‘আমরা কোথায় যাই বা না যাই সেটা আপনার দেখার কথা নয়। ভালোভাবে আচরণ করুন, এটাই শুধু চাই।’
‘দেখুন অনেকক্ষণ আপনার বাড়বেড়ানি শুনেছি। আর একটি কথা নয়, চুপ করে বসে থাকুন।’
বনানীর পাশের ছেলেটিও শান্ত কঠিন কথায় হুমকি দিল।
‘বেশি কথা বললে তুলে ফেলে দোব।’
দাঁড়ানোদের কেউ আবহাওয়া গরম করে তুলতে চায়।
‘আপনারা কি সভ্য মানুষের মতো কথা বলছেন?’
‘হিরু এবার চুপ করো।’
‘কেন টিকিট কেটে আমরা যাচ্ছি।’
‘আর আমরা টিকিট না কেটে যাচ্ছি?’
‘দেখান তো টিকিট?’
হিরু উঠে দাঁড়াল। শরীরের ভঙ্গিতে চ্যালেঞ্জ। সারা কামরা কয়েক সেকেন্ড বিব্রতবোধ করে রাগে ফেটে পড়ল। ওর সামনের ছেলেটি আবার শান্ত গলায় বলল, ‘ট্রেন তোর বাপের নয় শালা… আর একটি কথাও নয়।’
বনানী দেখল হিরুর সারা শরীর কাঁপছে।
‘ওই তো চেহারা, তার রোয়াব!’
‘যেমন দ্যাবা তেমনি দেবী।’
‘শাট আপ ইউ সোয়াইন।’
হিরু অপ্রত্যাশিত কাজ করে বসল, সামনের ছেলেটির গালে চড় বসিয়ে।
ছেলেটি মুহূর্তকয়েক অপলক তাকিয়ে রইল হিরুর মুখে। একটা বিষাক্ত হাসি খেলে গেল ঠোঁটে এবং তাচ্ছিল্যভরে ডান হাতের মুঠো হিরুর পাঁজরে বসিয়ে দিল যার শব্দে বনানী চমকে উঠল। বাঁ হাতের ঘুষিটা মুখে পড়ল। বনানী চিৎকার করে হিরুকে জড়িয়ে ধরল। তিন-চারটি ছেলে বসা মানুষদের হাঁটু ঠেলে এগিয়ে আসছে। হাঁটু গুটিয়ে লোকগুলি সন্ত্রস্ত হয়ে ওদের জায়গা করে দিল।
‘না, না, এ কী করছেন আপনারা…’
‘বার করে আন বার করে আন, লাশ বানিয়ে ছাড়ব।’
বনানীর মুঠোয়, একজন হাতের চেটো দিয়ে কুড়ুলের মতো আঘাত করতেই মুঠো আলগা হয়ে গেল। ওরা হিঁচড়ে টেনে নিল হিরুকে। আঙুল বেঁকিয়ে বেঁকিয়ে হিরু একজনের গাল খামচে ধরেছে। সম্ভবত এক মিনিটের জন্য বনানীর চোখের আড়াল হল হিরু। কামরার মুখোমুখি দরজার মাঝখানের জায়গাটুকুতে হিরু উবু হয়ে এবং তাকে ঘিরে ওরা। কয়েকজন ঝুঁকে। কয়েকটা মুঠো উপর থেকে হাতুড়ির মতো নামল। কয়েকজন লাথি কষাল। বালিশে চাপড় মারার মতো ভোঁতা, নিরীহ, অনুত্তেজক শব্দগুলোর সঙ্গে ‘ওক ওক’ আর একটা শব্দ। অনেকগুলো কণ্ঠ থেকে ক্রুদ্ধ গজরানির আওয়াজ।
