বনানী বাহুতে টান দিয়ে হিরুকে একটু ঝুঁকে মাথাটা কাছে আনতে ইশারা করল।
‘কী?’
‘কোথাকার টিকিট কেটেছ?’
বনানী ফিসফিস করে বলল। ওদের ঘেঁষে দাঁড়ানো মাঝবয়সি লোকটি আড়চোখে তাকিয়েই উদাসীন হয়ে গেল।
‘কাল টাইমটেবল দেখছিলাম, আচ্ছা চম্পাহাটি নামটা কেমন বলো তো? খুব মিষ্টি নয়? পিয়ালী? তালদি? আর একটা লাইনে খুব ফানি একটা নাম পেলাম-গোচরণ কিংবা গোচারণ। কোনটে ঠিক মনে হয়? আমার তো মনে হয় চরণটাই অ্যাপ্ট। চব্বিশ পরগনায় বেশ মজার মজার নামের স্টেশন ধপধপি। তারপর বহরু নামেও একটা জায়গা পেলাম। তারপরই…বলো তো কী?’
‘কী জানি। আমি এদিকের কিছুই জানি না। এই দ্বিতীয়বার ট্রেনে উঠলাম। ছোটোবেলায় একবার তারকেশ্বর গেছলাম, মাসতুতো দিদির বিয়েতে, আর এই। কী আছে তারপর?’
‘মোয়া।’
‘মানে?’
‘জয়নগর-মজিলপুর। যাবে?’
‘হ্যাঁ।’
ওরা আবোল-তাবোল কথা বলতে বলতে গড়িয়ায় পৌঁছল। কামরা থেকে কয়েকজন নেমে এল।
‘দাদা, একটু সরে বসুন।’
হিরু সিটে-বসা দুটি লোকের মাঝখানে আধ-হাত ফাঁক আছে দেখে বলল।
‘কোথায় বসবেন, জায়গা কই!’
‘আমার নয়, এক মহিলার জন্য বলছি। সবাই একটু সরে সরে বসুন, হয়ে যাবে।’
সিটের লোকেদের ব্যাজার মুখ দেখে বনানীর বসার ইচ্ছা লোপ পেল।
‘না না, আমি বেশ আছি।’
‘আরে বোসো।’
হিরু ওকে ঠেলে দিল। লোকদুটি নড়াচড়া করে ইঞ্চি কয়েক জায়গা বার করে দিল। বনানী বসল।
‘সোনারপুরে অনেকে নামবে, তখন বসার জায়গা পাবেন।’
বক্তার মুখের দিকে তাকিয়ে হিরু ভ্রূ কোঁচকাল। যেন খুবই জানা কথাটা আবার শুনল। ট্রেনের গতি কমছে। সিট থেকে দু-জন উঠে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বনানীর পাশে সে বসল।
‘জানালার কাছে বসতে না পারলে কোনো লাভ নেই।’
বনানী মাথা নেড়ে সায় দিল।
‘কথা বলার সুবিধে হয়। ট্রেনে জানালা না পেলে একদমই ভালো লাগে না।’
একদিকের জানালায় মুখোমুখি বসে দুই বড়োবুড়ি। বুড়ির চুল রুপোর মতো সাদা, সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর। চওড়া কালো পাড় শাড়ির ঘোমটায় মাথার অর্ধেক ঢাকা।
‘কী সুন্দর দেখতে, না?’
‘হ্যাঁ। বয়স কত হল বলো তো?’
‘ষাট-পঁয়ষট্টি হবে।’
ট্রেন সোনারপুর স্টেশনে ঢুকেছে। বুড়ির পাশের লোকটি এবার উঠল। বনানী ইতস্তত করে উঠে খালি জায়গাটায় বসল। জানালার কাছাকাছি তো হল।
‘বিল্টু এটায় আয়, অনেক খালি রয়েছে।’
প্ল্যাটফর্ম থেকে জানলা দিয়ে কামরায় উঁকি দিল দুটি মুখ।
‘ডাক ডাক ওদের ডাক…অ্যাই বিপ্লব, অ্যাই অ্যাই, শালারা শুনতে পায় না নাকি…অ্যাই গৌতম এদিকে, এটায় আয় খালি আছে। ডেকে আন না।’
লম্বা চুল, কাঁধে ব্যাগ, গেঞ্জি-শার্ট পরা গাঁট্টাগোট্টা ছেলেটি হাত নেড়ে তার সঙ্গীদের ডাকতে লাগল। অন্য ছেলেটি, প্রায় একই পোশাক, তবে একটু লম্বা, কোমরের বেল্টটাও বেশি চওড়া, ব্যস্ত হয়ে ট্রেনের সামনের দিকে এগিয়ে গেল।
একটু পরেই চে�চিয়ে কথা বলতে বলতে জনাদশেক ছেলে এই কামরায় উঠল। ওদের বয়স ষোলো এবং বাইশের মধ্যে। চেহারার মধ্যে বিশেষ তারতম্য নেই। ছিপছিপে কষওলা শরীর। পেশিগুলো খুব বড়ো নয় কিন্তু শক্ত, হাতের শিরা ওঠা, অধিকাংশের গাল বসা, বুক চাপা। দেখে বোঝা যায়, খাটতে পারে। কথাবার্তা চেঁচিয়ে, ধৈর্য কম। প্রত্যেকের বগলেই ব্যাগ। বুঝতে অসুবিধা হল না কোথাও ফুটবল ম্যাচ খেলতে যাচ্ছে। বনানী তিনটে লোকের পর, কথা বলা যাচ্ছে না। হিরু রেগে উঠতে লাগল এই নিরুপায়তার জন্য।
‘কতদূর যাবে?’
বুড়ি কৌতূহলে প্রশ্ন করেছে। বনানী ফাঁপরে পড়ল। হিরু কতকগুলো স্টেশনের নাম করেছিল।
‘গোচরণ, আপনি?’
‘বারুইপুর, বড়ো নাতির পইতে। কী পড় তুমি?’
‘বি এ।’
বলে ফেলে বনানীর নিজেকে খারাপ লাগল। এত সুন্দর দেখতে, মিষ্টি কণ্ঠস্বরের মানুষকে মিথ্যা বলতে ভালো লাগে না। কিন্তু সত্যি কথা বললে আরও কৌতূহলী হবে। আসলে হিরুর সঙ্গে এখন কথা বলতে ইচ্ছে করছে। বেচারা মুখ বুজে বসে।
‘গোচরণে বাড়ি?’
‘না, বাগবাজারের দিকে। পিসিমার বাড়ি যাচ্ছি।’
‘সঙ্গে কে, দাদা?’
বনানীর হাসি পেল। হিরুকে দাদা বানিয়ে নিজেকে মজা দেবার লোভ সামলাতে পারল না।
‘হ্যাঁ।’
হিরুর দিকে তাকিয়ে সে হাসল। জিজ্ঞাসু চোখে হিরু পালটা তাকাল। ব্যাপারটা ওকে পরে বলা যাবে।
বুড়ি এবার উঠে দাঁড়াল। বারুইপুর আসছে।
‘ওরে ওরে, একটা সিট হয়েছে, সাধন বসে পড়।…আর একটা সিট, আমি বসব।’
তিন-চারটি ছেলে অপেক্ষা করে, বুড়োবুড়ি সিট থেকে উঠে বেরিয়ে আসছে, ওই সময়টুকুর মধ্যেই হিরু উঠে গিয়ে বুড়োর জায়গাটায় বসে পড়ল। বনানী সরে গেল জানলার পাশে।
‘যাঃ বাব্বা, ভাবলুম জানলায় বসব!’
‘কেন রে সাধন, তোর অত জানলার দরকার হল কেন? মুখোমুখি হবার যাদের দরকার তারাই বসেছে।’
বনানী লক্ষ করল হিরুর কানদুটো যেন লাল হয়ে উঠল। চোখে রাগের আভাস।
‘ফুটবলাররা…এত অসভ্য হয়!’
বনানী পা দিয়ে হিরুর পায়ে চাপ দিল।
‘কতদূর যাচ্ছি আমরা?’
‘জয়নগর পর্যন্ত।’
দু-জনে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে।
‘ফিরতে কি সন্ধে হবে?’
‘তোমার তো আজ তাড়া নেই, পড়াতে যাচ্ছ না তো?’
‘না।’
হিরুর কনুই আর হাত জানলায় রাখা। বনানী ঝুঁকে জানালায় মুখ নিয়ে গেল। ওর আঙুলে চিবুক ঠেকল।
‘দেখেছ কী সবুজ!’
