‘মাকে এসব কিছু বলিসনি।’
‘কেন? ভেবেছিস কিছু বুঝি জানে না?’
‘না, জানে না।’
‘তুই কি ভেবেছিস বাবা যে রাত্রে চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়েছিল, সেটা মা লক্ষ করেনি? আজও কি বাবার মুখ দেখে বুঝতে পারেনি, সোজা কোর্ট থেকে আসছে না? কিছু না বলে মা শুধু দেখে যাচ্ছে। দেখবি একদিন কিছু একটা করে বসবে।’
‘কী করবে, আত্মহত্যা?’
‘তাও পারে। এ বাড়িতে সবকিছু হতে পারে।’
বনানীর মাথার মধ্যে ঝিমঝিম করে উঠল।
‘ওকে তাড়ানো দরকার। মা না পারলে আমিই তাড়াব।’
বাসু মিটমিট করে তাকাল। ধীরে ধীরে ঠোঁটদুটো মুচড়ে গেল। মুখটা বিকৃত করে নিঃশব্দে হাসতে শুরু করল।
‘তা হলেই সব বুঝি মিটে যাবে। ও যেখানে যাবে আমিও সেখানে যাব, বাবাও যাবে।’
হাতে চাপড় মেরে বাসু চিৎকার করল। বনানী ওকে থামাবার জন্য হাত তুলে দেখাল দরজায় মা দাঁড়িয়ে, সহ্যের শেষপ্রান্তে পৌঁছানো মুখ।
‘বাসু, এবার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়।’
‘যখন ইচ্ছে হবে যাব।’
‘এখুনি যা।’
বাবা নীচ থেকে উঠে এসেছে। ঘরের সামনে না এসে বারান্দা থেকে বলল, ‘চেল্লাচেল্লি বন্ধ করো।’
‘কী এমন মানী লোক যে চেঁচাব না?’
‘কথাবার্তা ঠিক করে বল।’
‘যা বলছি ঠিকই বলছি।’
‘তা হলে বাইরে গিয়ে বল।’
‘এখনও আমি এই বাড়ির ছেলে, বাইরে যাব কেন?’
‘তা হলে ভদ্রভাবে আচরণ করতে হবে।’
‘কার করতে হবে, আমার না তোমার? তুমি কি ভদ্রলোকের মতো কাজ করেছ? বস্তিতে গিয়ে বাড়ির রাঁধুনির সঙ্গে শোওয়াটা কি ভদ্রলোকের কাজ?’
‘আমি তোকে বলছি…’
‘যা খুশি বলো, আমি কেয়ার করি না।’
বাবা মুখ ফিরিয়ে মাকে বলল, ‘ঘরে যাও তুমি।’
মা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘরে যাওয়ার বদলে আবার তার চেয়ারে গিয়ে বসল। রেডিয়ো বন্ধ হয়ে গেছে। চালের থালাটা টেনে নিল।
‘ওখানে গিয়ে বসলেই কি কথা কানে যাবে না?’
‘তোর মাকে বাদ দিয়ে কথা বল।’
বাবা শক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাসু অনেকদূরে চলে গেছে। বাবার শাসানি সেখানে পৌঁছল না।
‘তুমি আর কথা বোলো না। এমন ঘেন্নার ব্যাপার যে করে, অন্য লোক সম্পর্কে তার কথা বলার অধিকার থাকে না।’
‘তোকে সাবধান করছি…’
বাবা এক পা এগোল হাত মুঠো করে।
‘ওরে বাব্বাঃ, মারবে নাকি! ভুলে যাচ্ছ কেন গায়ের জোরটা আমারই বেশি।’
খাওয়ার জায়গা থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে এল। মা বলছে ‘ওর যা বলার আছে বলতে দাও। ঠিকই বলছে ও, তুমি-আমি দু-জনেই সমান ঘেন্নার পাত্র…’
বনানীর কাছে যাবতীয় কথাবার্তা অর্থহীন নির্বুদ্ধিতা মনে হচ্ছে।
‘এবার যে যার ঘরে যাও।’
নিজের ঘরে ঢোকার আগে, বাবা ভারিক্কি গলায় মেকি মর্যাদা এনে বলল, ‘কাল দেখব কী করা যায়।’
‘বেশ দেখা যাবে।’ কষ্ট হয় শুধু মায়ের জন্য, এমন একটা লোকের সঙ্গে এত বছর নরকবাস করলে শরীরে কী থাকবে? বাসুও তার ঘরে ঢুকে শব্দ করে দরজা বন্ধ করল। বনানী মায়ের কাছে এসে দাঁড়াল। হাতটা অনড় হয়ে চালের ওপর। গাল বেয়ে টপটপ করে জল ঝরছে।
‘ওর কোনো দোষ নেই।’
বিড়বিড় করে মা বলল, অবশ্যই বাসু সম্পর্কে। মা ঠিক কী বোঝাতে চাইল? বাসু উচ্ছন্নে গেছে এটা ওর দোষ নয়? বাবাকে যদি মারত, তা হলে ওর দোষে সেটা ঘটত না? বাধুনির প্রেমে পড়েছে তাতেও ওর কোনো দোষ নেই?
শোবার ঘরটা অন্ধকার, বাবা আলো জ্বালেনি।
‘বনা এবার শুয়ে পড়।’
মুহূর্তের জন্য বনানীর মনে হল, মা একটা মানুষ। ঘরে এসে বনানী আলো নিবিয়ে শুয়ে রইল। সহজে ঘুম আসবে না। উপরের ঘরের মেঝেয় নড়াচড়ার শব্দ হল। নাটকীয় ব্যাপার যখন শুরু হয়, কিরণ চুপিসারে উপরে উঠে গেছে। এখন ও কী ভাবছে?
৫
ট্রেন ছাড়ার কয়েক মুহূর্ত আগে ওরা ছুটে এসে কামরাটায় উঠল। হাঁপাতে হাঁপাতে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল সাফল্যের বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে।
‘তোমার জন্যই।’
‘মোটেই না, ঠিক সময়ে ঠিক জায়গাতেই আমি দাঁড়িয়েছিলাম। তোমাকে পাইনি।’
‘দু-মিনিটের জন্য শুধু চা খেতে গেছলাম।’
হিরু টলে পড়ছিল। ট্রেনটা বাঁক নিচ্ছে, চাকায় খটখট শব্দে বোঝা যাচ্ছে লাইন বদলাচ্ছে।
‘আমি তো ভাবলাম বোধ হয় ট্রেন ফেল করলাম।’
‘এক ঘণ্টা পরে আর একটা আছে। বোর্ডে সব পড়ে নিয়েছি, তারপর দুটো বাইশে।’
হিরু কামরার মধ্যে চোখ বোলাল। টকটকে লালরঙের গেঞ্জি পরেছে। বুকে ইংরেজিতে লেখা সুজুকি। কথাটা নিশ্চয় জাপানি, কিন্তু কী যে অর্থ বুঝল না। আঁটো জামাটায় হিরুকে আরও লম্বা, আরও শীর্ণ দেখাচ্ছে। কিন্তু সুন্দর ও আকর্ষণীয়। অনেকেই তাকাচ্ছে।
কামরায় বসার জায়গা ভরতি। দাঁড়াতেও হয়েছে ঠাসাঠাসি। দরজার পাশে মেঝেয় বসে আছে কয়েকটি স্ত্রীলোক। সঙ্গে খালি ঝুড়ি, বস্তা। হাত তুলে বনানী আন্দাজ করল, সে হাতল ধরতে পারবে না। ট্রেনটা দুলছে। বনানীকে মাঝে মাঝে হিরুর বাহু চেপে ধরতে হচ্ছে।
‘তুমি কি ভাত খেয়ে এসেছ?’
‘না, এইসময় খাওয়ার অভ্যেস নেই, তুমি?’
‘আমারও। শুধু একটা অমলেট…দ্যাখো দ্যাখো, আহ চলে গেল, জানলায় একটা চমৎকার বাচ্চচা।’
বনানী ঘাড় ফিরিয়ে তবু তাকায়। রেললাইনের ধার ঘেঁষে কয়েকটি বাড়ি। সরকারি হাউজিং এস্টেট হবে বোধ হয়। এ সবই কলকাতার অন্তর্গত। গ্রামট্রাম আসতে এখনও হয়তো আধঘণ্টা।
‘নেমে নিশ্চয় মিষ্টির দোকান পাব। আমার বন্ধু দিলীপ বলেছে, সব স্টেশনেই খাবার দোকান পাওয়া যাবে। ওদের বাড়ি এই দিকেই-বারুইপুরে।’
