বন্ধুকে সে পায়নি, তার দিদি অবশ্য ছিল। বনানীকে নিরাশ হতে হল। ইতিমধ্যেই নাকি অন্য একজন বই চেয়ে রেখেছে।
ফেরার সময় বাস থেকে শ্যামবাজারে নেমেই সে স্থির করল আজ টাইপ স্কুলে যাবে না, তবে টিউশনি কামাই করবে না। হাতিবাগানে ঘেঁষাঘেঁষি কয়েকটা সিনেমা হল। একটায় সে টিকিট পেয়ে গেল। ভালোবাসার গল্প। কাল্পনিক নানান বাধাবিপত্তি জয় করে, বলা বাহুল্য, অবশেষে নায়ক-নায়িকার মিলন ঘটল। হল থেকে বেরোবার সময় তার জানতে ইচ্ছে করল, এই জিনিসের জন্যই কি কয়েকশো লোক এতক্ষণ অন্ধকারে বসে ছিল?
টিউশনি থেকে ফেরার সময় বনানী প্রায় গজ পঞ্চাশেক দূর থেকে দেখল তাদের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে বাবার সঙ্গে কিরণ কথা বলছে। বাবার হাতে ব্যাগ, কোর্ট থেকে ফিরছে।
তাকে দেখতে পেয়েছে কি না বনানী বুঝতে পারল না, তবে কিরণ দ্রুত বাড়ির মধ্যে চলে গেল। বাবা ইতস্তত করে, বোধ হয় সময় নেবার জন্যই, ওষুধের দোকানের কার সঙ্গে কথা বলা শুরু করল।
‘এত দেরি হল ফিরতে?’
কোনোদিন প্রশ্ন করে না। হয়তো মানসিক ভারসাম্য টাল খেয়েছে।
‘কলা কিনতে ভুলে গেছলাম, আবার গিয়ে বাজার থেকে কিনে আনলাম।’
বেচারা! ওজর দেওয়ার জন্য নিজেকে এই বয়সে ছেলেমানুষের পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হচ্ছে! জবাব দিয়ে বনানী তার বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল। দোতলায় উঠে দেখল মা তার নিজের চেয়ারটিতে বসে মাথা নীচু করে এক থালা চাল থেকে কাঁকর বাছছে। বনানী তার নিজের চেয়ারটিতে এসে বসল। কিরণ রান্নাঘরে।
‘চা হয়ে গেছে?’
‘না, কিরণ তো এইমাত্র ফিরল।’
‘মাসির বাড়ি? কখন বেরিয়েছিল?’
‘বিকেল নাগাদ।’
নিশ্চয় দু-জনে একসঙ্গে ছিল, বাবা আর কিরণ। বাসু যা বলেছে তা হয়তো ঠিক, বনানী নিজের ঘরে এসে একটা উপন্যাস চোখের সামনে ধরে কাত হয়ে শুয়ে রইল।
রাতে খাওয়ার টেবলে সে বাবার মুখের দিকে বারবার তাকাল। চোখে কেমন যেন বদমাইশিভরা মিটমিটানি, বনানী যা আগে কখনো ওর চোখে দেখেনি। মনে হচ্ছে, রাশভারীত্বটাও যেন কমে গেছে।
বাসু তাকাচ্ছে বাবার দিকে। চোখে তীব্রতা। নিজেকে সামলাবার চেষ্টাতেই হয়তো গোগ্রাসে খাচ্ছে।
‘বড্ড গরম পড়েছে, বৃষ্টি হবে বোধ হয়।’
বাবার কথাটায় কেউ সাড়া দিল না। কেউ প্রতিধ্বনিও তুলল না। মা বিশ্রী চাহনিতে বাবার দিকে তাকাল মাত্র। একমাত্র বাবাই তা লক্ষ করল না। ওর চোখদুটো চকচক করছে বোধ হয় ভেতরের স্ফূর্তিতেই। অন্যদিনের থেকে আজ বেশিই খাচ্ছে। কেউ কথা না বলায় চুপ করেই রইল কিন্তু চনমনে ভাবটা কমেনি।
মা চুপ করে আছে। বনানী বুঝতে পারছে, চুপ থাকলেও নিজের সঙ্গে মনে মনে কথা বলে চলেছে। কয়েকবার মুখে ফুটে উঠল বাঁকা হাসি।
জল খাওয়া শেষ করেই বাবা উঠে দাঁড়াল। অন্যদিনের মতো ‘কাজ আছে’ না বলেই নীচের সিঁড়ির দিকে এগোল।
বাসু চেয়ার ছেড়ে উঠছে বাবার পিছু নেবার জন্যই। বনানী চোখ দিয়ে যতটা সম্ভব, ওকে নিষেধ করল। সিঁড়ির মুখে পৌঁছে বাসু আর এগোল না। বনানী উঠতেই মা মুখ তুলে তাকাল।
‘দাদা, মাথা গরম করিসনি।’
বাসুর কাছে এসে গলা নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল।
‘শুয়োরের বাচ্চচাকে শেষ করে দেব।’
বনানী আহত হল না। বাসুর মতো একই সিদ্ধান্তে সেও পৌঁছেছে, অন্তত এই মুহূর্তের জন্য।
‘ঘরে এসে কথা বল।’
বনানী হাত ধোবার জন্য কলঘরে গেল। সেখান থেকে মাকে সে দেখতে পাচ্ছে। অনুমানের চেষ্টা করল তার ছোটোবেলায় মাকে কেমন দেখতে ছিল। প্রায়ই অসুখী, বিষণ্ণ, মনমরা দেখাত। একদিন বনানী জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘মা তুমি কাঁদছ?’ জবাবে মা বলেছিল, ‘তোকে অত কথা বলতে হবে না। বড়োরা অনেক ব্যাপারে কষ্ট পায় যা ছোটোরা বুঝবে না।’
এখন দেখে মনে হচ্ছে মা বোধ হয় কাঁদছে। অন্তত সেরকমই মনে হচ্ছে। বনানী ভাবল, এখনও কি বুঝতে পারবে না বড়োদের কষ্ট?
‘আজ কিরণকে ফলো করেছিলাম।’
বনানীর খাটে বাসু উপুড় হয়ে কপালের নীচে দু-হাত রেখে শুয়ে।
‘বস্তির মালিক, বাবার ওই মক্কেলটা, ওর যে মাটকোঠা বাড়ি তার দোতলার দুটো ঘরের একটায় কিরণ ঢুকল। অবাকই লাগল, বুড়ি মাসিটা তো বস্তির ভেতর দিকে একটা ঘরে থাকে, তা হলে এখানে ও এল কেন? বারান্দার পেছনেই ঘর। রাস্তার অনেক দূর থেকে ঘরের দরজাটা দেখা যায়। আমি একটা বাড়ির রকে বসে রইলাম। কিরণ ঢোকামাত্র একটা লোক বেরিয়ে এল ঘর থেকে। বাড়িওলারই লোক, বোধ হয় কর্মচারী। লোকটা নীচে নেমে গেল। তারপর ভেতর থেকে একজন দরজাটা বন্ধ করল। কে করল জানিস?’
বাসু ঝটকা দিয়ে উঠে বসল। চোখে আগুন। বনানী চুপ রইল। সে জানে, কে দরজা বন্ধ করল।
‘শুয়োরের বাচ্চচাটা।’
‘তোর বাবা হয়।’
‘রাখ তোর বাবা! সেইজন্যই কি ছেলের…’
বনানী নিজের কথার অর্থহীনতা হৃদয়ংগম করল বাসুর অসম্পূর্ণ উক্তির মধ্য দিয়ে।
‘এখনও কিরণ সম্পর্কে তোর মোহ আছে? এরপর ও কী ধরনের মেয়েমানুষ এবার বুঝতে পারছিস তো!’
‘যে ধরনেরই হোক, বাবা কেন হাত বাড়াবে?’
বাসুকে নির্মম মারমুখো দেখাচ্ছে। ঘরে পায়চারি শুরু করল দাপিয়ে দাপিয়ে। নীচের ঘরে বাবা নিশ্চয় শুনতে পাচ্ছে। মা তার চেয়ারে আবার চালের থালাটা নিয়ে বসেছে। বাসু গলা চড়িয়ে কথা বলছে, নিশ্চয় মা শুনতে পাচ্ছে। রান্নাঘরে ঝাঁটার শব্দ হচ্ছে। কিরণও শুনছে, কিন্তু তাতে ওর কিছু এসে যায় না। হয়তো মুখে এখন হাসিটা লেগে আছে, হয়তো আর একটু বেশি দুলছে ওর পাছা, মাকে দেখাবার জন্য।
