তারক থেমে পড়ল একটা ওষুধের দোকান দেখে। ইঞ্জেকসান নিতে হবে, এই কথাটা মনে পড়ায় দোকানটার দিকে এগিয়ে এসেও ইতস্তত করল। ভেবে দেখল, এখন নিলে বারো ঘণ্টা পর কাল ভোরেই পরেরটা নিতে হবে। ভোরবেলা কোথায় ইঞ্জেকসান নিতে যাব? বরং আটটা-নটার সময় নিলে সকাল-রাত্রি দু-বেলাতেই সুবিধা হবে।
চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনু ধরে তারক উত্তরমুখো চলতে শুরু করল। এই সময়টা রোজই তার একা লাগে। সকালটা খবরের কাগজ পড়ে আর অফিস বেরোবার তোড়জোড়েই কেটে যায়। অফিসই সবথেকে তার ভালো লাগে। সেখানে করার মতো নানান কিছুতে ব্যস্ত থাকা যায়। ছুটির পর লিফটে নামার সময় তার মনে হয় পাতালে চলেছে। তখন সে বন্ধুদের কথা ভাবে। আড্ডা দেবার মতো এখন একজনও নেই। বয়স বাড়লে কি সবাই এইরকমই একা হয়ে যায়? তার মতো সবাই কি চাকরি আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত? আত্মীয়দের বাড়িতে যেতেও তার ভালো লাগে না। সেই সব মামুলি কথাই শুনতে হয় আর বলতে হয়। বাড়ি ফিরে রেণুর সঙ্গে নতুন কিছু বলার মতো কথাও থাকে না। অমু এন্তার কৌতূহলে বহু প্রশ্ন করে, দু-চার মিনিট ভালো লাগার পর বিরক্তি এসে যায়। মনটাকে চনমনে করার মতো একটা ঘটনাও ঘটে না। একঘেঁয়ে, ভীষণ একঘেঁয়ে।
তারক রাস্তা থেকে চোখটাকে উপড়ে উপরে তুলে উদ্ধত ভঙ্গিতে কিছু পথ হাঁটল।
‘শুধু আপনি নন, লক্ষ লক্ষ লোক আজ আপনার মতো-‘ আমার মতো? তারকের মাথাটা ঝট করে গরম হয়ে উঠল। ফুটপাথ জুড়ে একটা ভিড় গোল হয়ে কী যেন দেখছে। রাস্তায় নেমে ভিড়টা কাটিয়ে যেতে গিয়ে তারক গোবর মাড়িয়ে ফেলল। একটা লোককে সে জিজ্ঞাসা করল, ভিড় করে ওরা কী দেখছে? লোকটা বলল, কিছুক্ষণ আগে তিনতলা থেকে একটা বাচ্চচা ছেলে পড়ে গেছল। ওরা রক্ত দেখছে। ছেলেটা তখুনি মরে যায়।
তাড়াতাড়ি ভিড়ের মধ্যে তারক ঢুকে পড়ল। এখনও জমাট বাঁধেনি, তাজাই রয়েছে। টকটকে লাল নয়, মেটে সিঁদুরের মতো। পরিমাণটা যা আশা করেছিল ততটা নয়। তবে বাচ্চচা ছেলে তো! দেহে কতই বা আর রক্ত থাকবে। রোমহর্ষণ হবে এমন কিছু দৃশ্য সে এর মধ্যে খুঁজে পেল না। কিঞ্চিৎ হতাশ হয়েই সে বেরিয়ে এল।
তারপর দাঁড়িয়ে ভাবল, অনেকদিন নারানদের বাড়িটা দেখিনি, একটুখানি ঘুরে গেলে কেমন হয়!
পাশ দিয়ে দুটি লোক বলাবলি করে গেল, ‘বাপ-মাকে ধরে জেলে পোরা উচিত। এত অসাবধান কেন?’
দোতলার বারান্দার কার্নিশ পর্যন্ত ছিল বাউন্ডারি। তার উপর লাগলেই ওভার বাউন্ডারি। ওদিকে কাঁঠালিচাঁপা গাছটা। বাঁদিকে গোপালের কাকাদের গ্যারেজের দেওয়াল। বল দিচ্ছিল গোপাল। হাঁটতে হাঁটতে তারক মনে করতে চেষ্টা করল, বলটা যদি না লাফাত তাহলে সে ওইভাবে হুক করত কিনা। ডান পা-টা আপনা থেকে সরে গেল, ব্যাটটা আপনা থেকেই ধাঁ করে ঘুরে গেল। তখন নিজেকে আর সামলানো চলে না। অসম্ভব। না হলে গৌরী যে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে সেটা তো আগেই দেখছিলুম। তবু সামলাতে পারলুম না।
বলটা সোজা ওর তলপেটে গিয়ে লাগল। সেটা স্পষ্টই দেখতে পেয়েছিলুম, ও কুঁজো হয়ে বসে পড়ল। বলটা ক্যাম্বিসের হলেও আঘাতটা যথেষ্টই হয়েছে। সবাই ভ্যাবাচাকা খেয়ে ভেবে পাচ্ছিল না কী করবে। হঠাৎ কেমন যেন সাহস এসে গেল। কোথা থেকে কীভাবে যে এল কে জানে, গৌরীকে পাঁজাকোলা করে, তুলে নিয়ে ভিতরের রকে শুইয়ে দিলাম। প্রায় অজ্ঞান। শুধু বুকের ওঠানামা আমরা সবাই দেখলাম। নন্দটা তখন লালুর সঙ্গে ইশারায় চোখাচোখি করে হাসল। একটু পরেই গৌরী ধড়মড় করে উঠে ভিতরে চলে গেল। তখন লালু বলল, ‘তারকটা এমন অসাবধানে মারে।’ তারপর গলা নামিয়ে নন্দকে বলে, ‘শাললা জোড়া ক্যাম্বিস বল! ও দুটো নিয়ে খেলা যায় নারে?’ নন্দ বলল, ‘চুপ কর, গোপলা শুনতে পাবে।’ এরপর বেশ কিছুদিন আমার ভয়ে ভয়ে কেটেছিল। তারপর হঠাৎ একদিন গৌরী হাসল। তারপর একদিন সন্ধ্যায়, অন্ধকার সিঁড়িতে হাতে একটা চিঠি গুঁজে দিয়ে ছুটে উপরে উঠে গেল।
নারানদের বাড়ির কাছাকাছি এসে পড়েছে তারক। ডানদিকের গলিটায় ঢুকে আধমিনিট হাঁটলেই লম্বা পাঁচিলটার শুরু। এই গলিটা ছাড়িয়ে পরের গলিটাতেই তারকদের বাড়ি। ইতস্তত করল সে। বাড়ির কাছেই তবু প্রায় বছর দশেক এই গলি দিয়ে সে হাঁটেনি। গৌরীর বিয়েতে নেমন্তন্ন খেয়ে গেছি, তারক হিসেব করল, প্রায় বারো বছর আগে। তারপরও বারকয়েক এসেছি। গোপাল বিলেত চলে যাবার পর একদমই এ গলি মাড়াইনি। অফিস যাতায়াতের জন্য এই রাস্তাটার দরকার হয় না।
অবশেষে তারক কৌতূহল সামলাতে পারল না। ডানদিকের গলিতে গুটি গুটি ঢুকল। মোড়ের গ্যাসপোস্ট তুলে দিয়েছে। ডাস্টবিনটা যেখানে থাকত, একটা মুদি দোকান হওয়ায়, সেটা আর নেই। রাস্তার বাড়িগুলোকে তার খুবই দরিদ্রের মতো ঠেকল। নারানদের পাঁচিলের খানিকটা ভেঙে টিনের দরজা বসানো। তাতে সাদা রঙে ইংরিজিতে ওরিয়েন্টাল কার্ডবোর্ড বক্স ফ্যাক্টরি লেখা। খেলার জায়গাটায় এখন টিনের চালা। স্তূপ করা রয়েছে কার্ডবোর্ডের বাক্স। মেসিন চলার শব্দ হচ্ছে। চাকা বসানো শিকওলা গেটের ধারে একট টিউটোরিয়ালের সাইনবোর্ড। দোতলার গাড়ি বারান্দায় আগের মতোই আলো ঝুলছে।
আর, পামগাছটা সত্যিই বুড়ো হয়ে মরতে বসেছে বলে তারকের মনে হল। একটা পাতাও নেই! বাড়ি ঢোকার আগে গোপাল সিগারেটটা ওর ছাই ছাই রঙা গায়ে ঘসে নেভাতে নেভাতে বলেছিল, ‘গৌরীকে বিয়ে করবি?’ হতভম্বের মতো ওর দিকে তাকিয়েছিলুম নিশ্চয়। নয়তো গোপাল হঠাৎ রেগে উঠে বলল কেন, ‘প্রেম করতে পারিস আর এই কথাটার মানে বুঝতে এত সময় লাগে কেন?’ মানে ঠিকই বুঝেছিলাম কিন্তু অতবড়ো বনেদি কায়স্থ পরিবারের মেয়ের সঙ্গে সোনার বেনে বঙ্কুবিহারী সিংহের ছেলের যে বিয়ে হতে পারে, সেটা বোঝার মতো বুদ্ধি বা সাহস আমার ছিল না। তাই নিয়ে ভাবিওনি। ঠাট্টা ভেবেই বলেছিলুম, ‘কেন করব না, দিলেই করব।’ বুড়ো আঙুলটা মুখের কাছে নেড়ে গোপাল বলেছিল, ‘দিলেই করব, মানে? তুই কি ভেবেছিস আমাদের বাড়ি থেকে প্রস্তাব দেওয়া হবে তোকে জামাই করার জন্য? বা তুই যদি প্রস্তাব দিস, তাহলে রাজি হবে? ইডিয়ট।’ বলেছিলুম, ‘তাহলে বিয়ের কথা বলছিস কেন?’ ও বলল, ‘তাহলে প্রেম কচ্ছিস কেন?’ প্রেম করা মানেই যে বিয়ে করতে হবে, এটা ভাবিনি। বিয়ে হলে তো খুবই ভালো হয়, কিন্তু আমি বা গৌরী দু-জনেই মনে মনে জানতুম বিয়ে-ফিয়ে হবে না। তাই এই নিয়ে পরে আমরা কোনো কথাও ভুলিনি! শুধু চিঠিতে প্রথম দিকে গৌরী একবার কোত্থেকে যেন টুকে লিখেছিল-নির্জন নদী তীরে দু-জনে ঘর বাঁধব। আর সারাদিন কী কী করব, দু-পাতা ভরতি তারই বিবরণ ছিল। ‘গাটস থাকে যদি গৌরীকে নিয়ে যা। ও তো সাবালিকা, আইনে আটকাবে না।’
