কিরণ এবার এঁটো কুড়োনো, রান্নাঘরে বসে খাওয়া, ধোয়া ইত্যাদি শুরু করবে, বাবা হয়তো তাই দেখার জন্য বসে আছে। মা স্থির চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে। একটু আগেই মা মাথার যন্ত্রণার কথা বলছিল।
কিছুক্ষণ পরেই বনানী বুঝল বাবা সম্পর্কে ভুল ধারণা করেছে। রেডিয়োয় ‘সিরাজদৌল্লা’ নাটক হচ্ছে। গভীর মনোযোগ দিয়ে বাবা শুনছে। চুরুটটা নিবে রয়েছে আঙুলের ফাঁকে। অন্যমনস্কের মতো টান দিয়ে, হাতটা আবার টেবলে রাখল। দেশলাই পকেটেই আছে, কিন্তু ধরাতে গিয়ে পাছে একটা সংলাপও ফসকায় তাই হয়তো দেশলাইটা জ্বালল না। দেখে বনানীর মনে হল, বাবা যেন বহু বহু বছর পিছিয়ে গেছে-যৌবনে বা কৈশোরে। চোখদুটো চিকচিক করছে বাষ্পে, ঢোঁক গিলল কয়েকবার। একসময় বাবার নাকি অভিনয়ের শখ ছিল।
আজ বনানী তাড়াতাড়িই শুতে গেল এবং শোওয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়ল। একসময় ঘুম ভাঙে পায়ের শব্দে। বাসু ফিরল। ওর ঘরের সামনে শব্দটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে থেকে তিনতলার সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল।
ডানদিকের ঘরে ওরাও নিশ্চয় শুনতে পাচ্ছে। বাবা-মায়ের ঘুম খুবই পাতলা, বনানী অপেক্ষা করে রইল, বাবা ঘর থেকে বেরোয় কি না বোঝার জন্য। উপরের ঘরে পায়ের শব্দ, মেঝেয় বসার শব্দ এবং বাসুর রাগতস্বর বনানী শুনতে পাচ্ছে। বাবা আজ ঘর থেকে বেরোল না।
মিনিট পনেরো কোনো শব্দ নেই, সারা বাড়ি নিঝুম। কে যেন কলঘরে গেল, মেঝেয় জল ঢালার শব্দ বনানী শুনতে পাচ্ছে। বাসুই কি? এটা কি ওর এক ধরনের চ্যালেঞ্জ-বিদ্রোহ ঘোষণা? রাখাঢাকার ব্যাপারটাকে পরোয়া করার দরকারই বোধ করছে না। কিন্তু ও তো বহু আগেই বিদ্রোহ করেছে, তা হলে এটা কি যুদ্ধঘোষণা?
পরদিন সকালে বাসু তার ঘরে এল।
‘কাল দুপুরে কিরণ ওর মাসির কাছে গেছল জানিস কি?’
বনানী মাথা নাড়ল। বাসুর চোখদুটো ফোলা, ঈষৎ লাল। মুখে ক্লান্তি এবং তিক্ত মনোভাবের প্রকাশ।
‘হাঁ গেছল। আমার বন্ধু সুভাষ, ও পাড়ারই ছেলে, দেখেছে। কাকে দেখেছে জানিস…’
‘বাবাকে?’
বাসু চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থেকে ঠোঁট মোচড়াল। হঠাৎ বাবার কথা কেন যে মনে এল বনানী তা জানে না।
‘যাক, তোর তা হলে বুদ্ধিসুদ্ধি এখনও টিকে আছে। বাবাকে কাল দুপুরে বস্তি থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছে সুভাষ। আমি অবশ্য ওকে বলেছি, একটা মামলার ব্যাপারে বাবা গেছল। কিন্তু শুয়োরের বাচ্চচাটা কেন গেছল আমি আন্দাজ করছি।’
‘কী আন্দাজ করছিস?’
‘পরে বলব।’
‘হয়তো সত্যিই মামলার কাজে গেছল, বস্তির মালিক তো বাবার মক্কেল।’
বাসু কটমটিয়ে তাকাল।
‘তুইও তা হলে ওইদিকে?’
‘আমি কোনোদিকেই নেই, তোর দিকেও নয়। তুই কি ভেবেছিস যা করে যাচ্ছিস সেটা খুব ভালো কাজ?’
‘এ বাড়িতে আবার ভালোমন্দ কী? আমি বাঁচতে চাই, বাঁচার জন্য যা করব সেটাই ভালো। তুই কি ভেবেছিস আমি বেঁচে আছি? আমরা যেভাবে ওরা যেভাবে এ বাড়িতে রয়েছে সেটাকে বাঁচা বলে?’
‘বলে কি না বলে তা অত জানি না, তবে জেনে রাখ, যা শুরু করেছিস সেটা ভালো নয়। তুই একটা ভদ্র বনেদি ঘরের ছেলে আর ও একটা ঝি, রাঁধুনি!’
‘কে ভদ্র, কে বনেদি? ওই কুত্তাটা? জিব বার করে রাঁধুনির পেছনে যে ছুটছে হ্যা হ্যা করে?’
বনানী বুঝতে পারছে না কেন তার বুকে একটা ব্যথা খোঁচা দিল, বাসুর কথাগুলো চেপে চেপে বসছে আর ঘৃণার বদলে বাবার জন্য করুণা উঠে আসছে।
তবু সে বুঝতে পারছে কেন বাসুর ক্ষিপ্ততা। বনানী নিজেও তো এই বাড়ির জীবনধারার বিরুদ্ধে ক্ষেপে ওঠে। কারণটা কী? গোলমালটা কোথায়? বাবা-মা কি কখনো পরস্পরকে ভালোবাসেনি, ওরা কি যথাযথ স্বামী-স্ত্রী কখনো হতে পারেনি, নাকি এসবই তাদের জন্মের পর শুরু হয়েছে?
‘আজ যদি বাবা মারা যায়, কী করবি? এই সংসার তোকেই তো চালাতে হবে, পারবি?’
‘বয়ে গেছে চালাতে। নিজের পথ নিজেকেই দেখতে হবে। হাজারখানেক টাকা জোগাড় করে ব্যবসায় নেমে পড়ব। বর্ডার থেকে ফরেন কাপড় আনব আর বেচব।’
বাসু সিগারেট বার করে ধরাল। নিজের ঘরে ও খায় সেটা বনানী বা মা জানে, কিন্তু এ বাড়িতে প্রকাশ্যে কখনো খায়নি। এই প্রথম। ধোঁয়া ছাড়ার মধ্যে তাচ্ছিল্য দেখাবার চেষ্টা রয়েছে। প্রেমে মগ্ন মানুষের হিংস্র চাহনি ওর চোখে, দুনিয়াকে পরোয়া না করার জন্য তৈরি।
‘এবার বাড়িতে মদের বোতল নিয়ে ঢুকব। দেখি কোন শালা কী বলে।’
বাসু বেরিয়ে গেল। বনানী দরজার কাছে এসে উঁকি দিল। মা দাঁড়িয়ে নেই, কিন্তু সে জানে, মা ঠিকই শুনেছে বাসুর কথাবার্তা। দেওয়াল ভেদ করে শোনার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে মায়ের। জলভরা বালতি নিয়ে কিরণ রান্নাঘরে যাচ্ছে, মুখ ফিরিয়ে তাকাল মাত্র। বাবা এবার স্নান করতে যাবে, এখন নীচে সেরেস্তায়। রান্নাঘর থেকে একটা-দুটো শব্দ ছাড়া সারাবাড়ি নিঝুম, এই সকালেই। অথচ বাইরে এখন প্রচণ্ড কোলাহল, আনাগোনা, ব্যস্ততা। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের ব্যক্তিগত পৃথিবীর জন্য ভাবছে এবং কিছু করছে। অথচ আমার কোনো পৃথিবী নেই, করারও কিছু নেই, বনানী ভাবল এবং ক্লান্তবোধ করল।
বিছানায় শোওয়ামাত্র তার ঘুম এসে গেল।
দুপুরে বনানী দমদমে তার কলেজের এক বন্ধুর বাড়ি গেল। বন্ধুর দিদি এই বছরই বি এ ফাইনাল দিয়েছে, তার বইগুলো যদি পাওয়া যায় নতুন করে পড়াশুনো শুরু করবে, এই চিন্তাটা ঘুম ভাঙার পর থেকেই তাকে ব্যস্ত করেছে। কোয়ালিফিকেশন বাড়ালে কাজ পাওয়ার হয়তো সুবিধা হবে।
