‘তোর বাবা কি একা রয়েছে?’
একথা জিজ্ঞাসা করা কেন? মা যখন যাই বলুক, বিনা উদ্দেশ্যে কখনো কথা বলে না। উদ্দেশ্যটা কখনো কখনো এত ভালোভাবে লুকোনো থাকে যে আবিষ্কার করতে কিছু সময় লাগে। উপরে ওঠার আগে বনানী একবার তাকিয়েছিল সেরেস্তায়।
‘হ্যাঁ, একাই।’
একদৃষ্টে মা নীচের দিকে তাকিয়ে, চোখ থেকে বনানী বুঝল প্রত্যাশিত কিছু ঘটেনি।
‘বাইরে বেশি খেয়ো না।’
বনানী জবাব দিল না। রীতিমতো ভালো লেগেছে তার বাইরের মুখরোচক বস্তুগুলো। আবার সে যাবে। বাসুও মাঝে মাঝে রাতে খায় না, বন্ধুরা খাওয়ায়। একমাত্র বাবারই বাইরে খাওয়ার কোনো ব্যাপার নেই। প্রতিদিন এই টেবলে আসতেই হয়। দু-বেলা তার ওই চেয়ারে বসে মায়ের মুখোমুখি হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই, তবে কাজের ভান করে সেরেস্তায় নিজেকে আটকে রাখার মধ্যে দিয়ে কিছুটা উশুল করে নেয়।
প্রত্যেকেই চায় মাকে এড়িয়ে চলতে। প্রত্যেকেরই এই বাড়ির বাইরে কাটাবার জন্য অন্য এক জীবন আছে, আর এক আমোদ আছে, নানা কাজ আছে। মায়ের কিছুই নেই।
মায়ের ঘরে মাসিমা এবং তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দাদামশাই-দিদিমার একটা ছবি টাঙানো আছে। মাসিদের কেউ-না-কেউ মাঝে মাঝে বেড়াতে আসত। এখন আসে শুধু অবিবাহিত ছোটোমাসি। বনানী তার মাসতুতো ভাইবোনদের প্রায় চেনেই না। চোখেই দেখেনি কোচবিহারে যারা আছে।
চা খেতে খেতে সে একদৃষ্টে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ভেবে যাচ্ছিল এবং কী বিষয়ে ভাবছে তা বুঝতে না পেরে অনিশ্চিত অবস্থাতেই ভাবনাটা শেষ করে উঠে দাঁড়াল।
‘কোথায় যাচ্ছিস?’
‘চান করব, কী ভ্যাপসা গরম।’
‘আর একটু বোস, চা খেয়েই ঠান্ডা লাগায় না।’
‘কিছু হবে না।’
‘কেন আমার কাছে কি খারাপ লাগে? আমি কি এতই কুচ্ছিত?’
‘কে বলল?’
বনানী অবাক হয়ে যাচ্ছে, মা-র এই ভাবপ্রবণ কথাবার্তায়। কখনো ওকে এমন ব্যথিত অভিমানী দেখেছে মনে পড়ে না।
‘মেয়েমানুষকে তার রূপযৌবন ধরে রাখতে হয় অনেকদিন। স্বামীর জন্য ততটা নয়, যতটা ছেলেমেয়ের জন্য। মাকে বুড়ি দেখার মতো কুচ্ছিত জিনিস আর হয় না। ছেলেমেয়েরা এড়িয়ে যায়, ঘেন্নাও করে।’
‘তুমি বুড়ি হওনি।’
‘কথাটা মনে রাখিস, সুখী হতে পারবি। বেশিরভাগ মেয়েই বিয়ের পর আর নিজের যত্ন নেয় না। বোকামি। তিরিশ হতে-না-হতেই মনে হয় পঞ্চাশে পৌঁছে গেছে। ছেলেমেয়েরা এইসব মা সম্পর্কে কী যে ভাবে!’
‘কিছুই ভাবে না। মা সম্পর্কে অন্য কিছু কি ভাবা সম্ভব?’
কথাটা যে বিশ্বাস করল না, বনানী মুখ দেখেই বুঝল। আর কী সে বলতে পারে! এত করুণ আর কখনো মা-কে মনে হয়নি বা হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই মনে হয় যেন আগের থেকে বেশি।
মনে পড়ল মায়েরই বান্ধবী হিরুর মা-কে। সমবয়সি কিন্তু স্থাস্থ্যে-লাবণ্যে, পারিপাট্যে বয়সোচিত। কমও না, বেশি বয়সিও দেখায় না। শুধু ভালো থাকা বা খাওয়াতেই এটা সম্ভব নয়। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কও নিশ্চয় স্বাভাবিক। অথচ পরিশ্রম কম করে না।
‘তোদের আর একদমই দেখাশোনা করতে পারি না। অথচ যখন তোরা বাচ্চচা, আমিই স্কুলে দিয়ে আসতাম, নিয়ে আসতাম। কাচাকাচি করতাম, রাঁধতাম, ঘর মুছতাম-কাজের লোক রাখার মতো অবস্থা তখন ছিল না। তোর বাবা কোর্টে যেত আর আসত, দিনে দশ-কুড়ি টাকার বেশি রোজগার ছিল না। আমার কোনো চিকিৎসাই হয়নি।’
বনানী চাইল, মা এবার কথা বন্ধ করুক। তার নিজের নয় এমন স্মৃতি কেউ তাকে দেবার চেষ্টা করলে সেটা অসহ্য লাগে।
‘আমার কোনোই দোষ নেই। মনে ইচ্ছে ছিল বিয়ের পর প্রাইভেটে স্কুল ফাইনাল দেব।’
মা কি বুঝতে পারছে না, এভাবে তার কথা বলা উচিত নয়?
‘বনা, অনেক জিনিস আছে যেগুলো পরে বুঝতে পারবি, যখন বিয়ে হবে, যখন সন্তানের মা হবি।’
মায়ের সঙ্গে কথা বলতে হাঁফ ধরে। প্রত্যেকটা কথার নিজস্ব মানে ছাড়াও আরও অনেক ইঙ্গিত তার মধ্যে থেকে যায়। যে দু-তিনটে স্তর আছে, একটা থেকে আরেকটায় এত সূক্ষ্মভাবে যাতায়াত করে যে মানে বোঝা শক্ত হয়ে পড়ে।
‘চান করতে যাচ্ছি।’
বনানী তার ঘরের দিকে এগোল গামছা আনার জন্য। শান্তিতে থাকার অধিকার সবার মতো তারও আছে। হিরু যেমন স্বাধীনতা চায়, অনেকটা সেরকম। অন্যে তাদের স্মৃতির বোঝা খুলে তার জীবনটাকে জটিল করে দেবে না এটা সে নিশ্চয় আশা করতে পারে।
‘চুল যেন ভেজাসনি।’
কথাটা যে শুনতে পেয়েছে, এমন কোনো ভঙ্গি বনানীর মধ্যে প্রকাশ হল না। সে নিঃশব্দে কলঘরের দরজা বন্ধ করল। চারপাশে যা কিছু ঘটে তার গুরুত্ব আমাদের জীবনে আছে। কিন্তু কদাচিৎ কেউ সত্যি কথাটা বলে। অন্ধকারে নিজেকে নগ্ন করতে করতে বনানী ভাবল, সবাই কেমন সব গল্প তৈরি করে, নয়তো খুঁজে বার করে, যেগুলো তাদের কোলেই ঝোল টানায় সাহায্য করে।
‘শোনো মা, তোমার ওইসব কথার কোনো মানে আমার কাছে নেই। কিছুক্ষণ আগেই আমি যে দুটো ঘণ্টা কাটিয়েছি হয়তো আমার জীবনে তা সেরা হিসাবে প্রমাণিত হতে পারে। এই মুহূর্তে তা নষ্ট করতে চাই না। যে সমস্যা আমার নয় সেগুলোর সামনে জোর করে আমায় দাঁড় করিয়ো না।’
বনানী পাগলের মতো জল ঢালতে শুরু করল মাথা ভিজিয়ে। রাতে খাওয়ার টেবলে বাসু অনুপস্থিত রইল। কিন্তু বনানীকে বিস্মিত করে বাবা নীচে সেরেস্তায় না গিয়ে রেডিয়ো খুলে শুনতে লাগল।
