‘একা যখন এখানে দাঁড়াই, সময়ের কথা ভুলে যাই। জাহাজগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে বেশ লাগে।’
‘জাহাজে কেমন লাগে কে জানে। কীসের এগুলো?’
‘নিশ্চয় কার্গো, মালের জাহাজ। এক জাহাজ কোম্পানির মালিকের সঙ্গে বাবার আলাপ আছে। খুব বড়োলোক।’
‘বড়োলোক হতে ইচ্ছে করে তোমার?’
হিরু কিছুক্ষণ যেন ভাবল। ‘না। সত্যি বলতে কী, খুব বেশি টাকার কথা ভাবলে ভয় ভয় করে। তার মানে, আমি গরিবও হতে চাই না, যদিও…’
‘শুনি।’
‘বুঝিয়ে ঠিক বলা মুশকিল। মাঝে মাঝে আমার এমন একটা ইচ্ছে হয়, যেন আমার নিজের বলতে কিছুই নেই-না বাড়ি, টাকা, স্কুটার, বই এমনকী জুতোজামাও, না কোনো দায়দায়িত্ব, কোনো কিছুতেই চাহিদা নেই…।’
‘কীরকম যেন দার্শনিকের মতো কথা বলছ।’
‘হবে। তোমার বাবাকে কি ধনী বলবে?’
‘একদমই নয়। মধ্যবিত্ত, বরং নিম্নমধ্যবিত্তই বলা যায়।’
‘মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্যে আমি থাকতে চাই তবে আরামের চাকর হয়ে কিছুতেই নয়। আমার কাছে সবথেকে বড়ো কথা হল স্বাধীনতা। এই এখন যেমন আমার ইচ্ছেমতো এখানে দাঁড়িয়ে কিংবা আর একটু এগিয়েও দাঁড়াতে পারি, এজন্য কাউকেই জবাবদিহি করতে হবে না।’
‘স্বাধীনতা তোমার নেই?’
‘এক ছেলে হওয়ার অসুবিধাটা তুমি বুঝবে না। বড়ো বেশি করে সবকিছু পাই, স্নেহ-মমতা-আদর, নানান জিনিস, বাড়াবাড়ি রকমের যত্ন, সাবধানতা। হাঁফিয়ে যাই, ইচ্ছে করে ফেটে বেরিয়ে পড়ি, লণ্ডভণ্ড করে দিই। জানো, আমাদের ফ্যামিলিতে কেউ জোরে কথা বলে না, চললে শব্দ হয় না। জীবনে আমি কখনো মারামারি করিনি। ভাবতে পার? একটা ছেলে…’
হিরুর বিস্মিত চোখে অপূর্ণ বাল্যের এবং কৈশোরের বেদনা প্রতিবিম্বিত। কোমর-সমান উঁচু পাঁচিল ধরে ও গঙ্গার দিকে ঝুঁকে। মুঠোদুটোর উপরের হাড় খোঁচা হয়ে উঠেছে। পিছনে ওদের ঘেঁষে মানুষের যাতায়াত চলছে।
‘অদ্ভুত ছেলে তুমি।’
‘কীরকম?’
‘সব রকমে। কখনো কখনো মনে হয় তোমার বয়স তিরিশ, আবার অন্য সময় মনে হয় যেন ছোটো ভাই, অবশ্য ছোটোভাই আমার নেই। তোমার মতো কেউ থাকলে বেশ হত।’
‘খুব মজা পেতে?’
‘না, না। রেগে উঠো না আবার। কেউ থাকলে তাকে তা হলে বিশ্বাস করতে পারতাম।’
‘আমি কারোর ভাই হতে চাই না।’
‘আমি কারোর দিদি হতে চাই না।’
বহুক্ষণ পর যখন পরস্পরের দিকে তাকাল তখন ওদের চোখ মৃদু শান্ত।
‘আমি যা হতে চাই, আমি সেরকমই নই…তাগড়াই ধরনের একটা কিছু।’
‘বুলওয়ার্কার তো কিনেছ।’
হিরু হেসে ফেলল।
‘ঠাট্টা কোরো না, তিন সপ্তাহ পর আমায় দেখে চিনতেই পারবে না আর। ভেলপুরি খাবে? আমার ইচ্ছে করছে খেতে।’
বনানীর উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে বাহু ধরে তাকে টেনে নিয়ে চলল রাস্তার দিকে।
ফেরার সময় এসপ্ল্যানেডের ট্রাফিক এড়াবার জন্য হিরু আকাশবাণী বাড়ির পাশ দিয়ে ডালহৌসি স্কোয়ারের পথ নিল। রাস্তা নির্জন, বিরাট অফিস বাড়িগুলোর জানালা বন্ধ। চারপাশ থমথমে। কিছু খাবারের, পানের দোকান শুধু খোলা। স্কুটারটা ধীরে চলছে।
‘কী ভাবছ?’
‘তোমাকে বোঝার চেষ্টা করছি। নতুন নতুন আবিষ্কার করছি।’
‘যেমন?’
‘বলা বড়ো শক্ত। আর একটু তোমায় জানি, তখন বলব।’
হিরু চুপ করে রইল। গর্তে পড়ে স্কুটার লাফাচ্ছে।
আধা ঠাট্টা, আরও গম্ভীর স্বরে বনানী বলল, ‘বাড়ি ফিরে বলবে তো আজকের কথা, আমার কথা?’
‘বলতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। তুমি বলবে?’
না জিজ্ঞেস করলে বলি না, তবে আমাদের বাড়িতে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করে না।’
‘আবার কবে যাব তোমার টাইপ স্কুলে?’
‘যেকোনো দিন। তবে টিউশনি আছে মনে রেখো।’
‘তা হলে সেখানেই যাব। বুধবার, ক-টায়?’
‘সাড়ে ছ-টা, না সাতটায় বরং সেদিন যেখানে নেমে গেছলাম।’ বাড়ির দরজায় বনানী নামল। হিরু এঞ্জিন বন্ধ করেনি। স্কুটার ঘুরিয়ে রওনা হওয়ার আগে আর একবার বলল, ‘তা হলে বুধবার, কেমন?’
৪
দোতলায় মা নিজের চেয়ারটিতে বসে। টেবলে ট্রানজিস্টার, হাতে সেলাই। কিরণ রান্নাঘরে চা তৈরি করছে। বনানী চেয়ারে বসল, অবশ্যই তার চেয়ারটিতে। মা একবার তাকাল।
‘বনাদি চা দোব?’
‘দাও। রাতে আমি খাব না, খেয়ে এসেছি।’
মা আর একবার তাকাল।
‘কোথায়?’
বনানীর মনে হল বলে, ছাত্রীর বাড়িতে। কিন্তু হঠাৎ একটা চাপা রাগ তাকে খুঁচিয়ে তুলল নিষ্ঠুর হবার জন্য।
‘হিরু খাইয়েছে। আমরা গঙ্গার ধারে গেছলাম।’
তীক্ষ্নচোখে সে তাকিয়ে রইল প্রতিক্রিয়াটা লক্ষ করার জন্য। কোনো ভাবান্তর পেল না।
‘সেদিন বাসু কী বলছিল?’
আলগা প্রশ্ন ধীর স্বরে। বনানী জানত একসময় প্রশ্নটা আসবেই।
‘কবে?’
‘গত মঙ্গলবার, দুপুরে।’
‘কিছু না, কয়েকটা টাকা চাইছিল।’
মা বুঝেছে, মিথ্যা বলল বনানী। কিন্তু সেটা গ্রাহ্যে না এনে, অসুখী, রুগণ চোখে তার দিকে মা তাকাল। সেইসময় তাজা স্ফূর্তি শরীরে মাখিয়ে কিরণ দু-কাপ চা হাতে মায়ের পাশে এসে দাঁড়াল। দুটি স্ত্রীলোকের মধ্যেকার বৈপরীত্যটা বিষণ্ণ করল বনানীকে।
আর এক কাপ চা নিয়ে কিরণ নীচে যাচ্ছে বাবাকে দেবার জন্য। বনানী তাকিয়ে রইল মায়ের চোখের দিকে।
ঠিক ওইখানে, ওই চেয়ারটায় মা কেন বসে তা সে জানে। ওইখান থেকে দোতলা-একতলার প্রত্যেকটি ঘরের দরজা এবং ভিতরের কিছু অংশও দেখা যায়। বারান্দার রেলিংয়ের মধ্য দিয়ে মায়ের চোখ সেরেস্তার দরজায় নিবদ্ধ। কিরণ চা দিতে গেছে।
