‘এতে ওর বা আমার কারোরই দোষ নেই। এখন অলকা সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে বরং বলব আমার পক্ষে ও একটু বেশি জটিল, হাঁফ ধরানো মনে হয়। আমার দুঃখ হয় ওর স্বামীর জন্য।’
‘শুধুই স্বামীর জন্য?’
‘ওদের সকলের জন্য। বাড়িটাই যেন কেমন, গোরস্থানের মতো ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে, চুপচাপ। ওদের রাঁধুনি মেয়েটাকেই যা জ্যান্ত মনে হল।’
‘বনাকে?’
‘ওর সঙ্গে তোর কি দেখা হয়েছে?’
‘হ্যাঁ, স্কুটারে একদিন ছোট্ট একটা লিফট দিয়েছিলাম। খুব ভিতু।’
‘মনে তো হয় না মেয়েটা জীবনে কিছু করতে পারবে। মায়ের মতোই হবে।’
মায়ের মতো! এই একটি জিনিসই তো বরাবর সে ভয় করে এসেছে ছোটোবেলা থেকে।
‘বনা, তুমি আমার কথা কিছু শুনছ না, কী ভাবছ?’
‘কই ভাবিনি তো। বুলওয়ার্কার কী জিনিস তাই জানি না, কী কথা বলব।’
‘আমি অন্য বিষয়ে কথা বলছিলাম, আচ্ছা ওঠা যাক এবার।’
‘তুমি রেগে গেছ হিরু। তুমি বড্ড রাগি।’
‘আমি রাগিনি।’
‘তোমার চোখ দেখেই বুঝতে পারি। আগের দিনও বুঝতে পেরেছিলাম। সত্যিই আমি অন্যমনস্ক হয়ে গেছলাম।’
হিরুর চোখ আবার শান্ত হয়ে এল। লাজুকভাব ফুটে উঠল মাথাটা হেলিয়ে রাখার মধ্যে।
‘সত্যিই রাগি আমি। মাঝে মাঝে ভীষণ ক্ষেপে যাই।’
‘কার ওপর?’
নিজের ওপর।’
‘প্রায়ই হয় নাকি এরকম?’
‘তুমি কি নিজের ওপর ক্ষ্যাপো না?’
‘কখনো-সখনো, বিশেষত যখন অন্যের মনে আঘাত দিই।’
বনানী বলতে যাচ্ছিল-যখন নিজের মনে আঘাত দিই, যেটা করা উচিত নয়, সেটাই তখন করে ফেলি। তারপর যখন দুঃখ পাই তখন রেগে উঠি।
‘এবার ওঠা যাক। কিন্তু কথা রইল, একদিন আমরা ট্রেনে কোথাও গিয়ে নামব।’
বিল এনে দিতেই বনানী তার ছোট্ট ব্যাগটা খুলতে যাচ্ছিল।
‘আমার চোখের দিকে তাকাও, কী দেখছ?’
হিরু মিটমিট হাসছে।
‘রাগের পূর্বাভাস।’
‘সুতরাং ব্যাগের থেকে হাত ওঠাও।’
বনানী প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে আরও হেসে ফেলল। বিলটার দিকে তাকিয়ে স্বস্তিবোধ করল। তার কাছে যা টাকা আছে প্রায় সবটাই দিতে হত।
‘আজ তো টিউশনি হবে না। চলো, গঙ্গার ধার থেকে এক চক্কর দিয়ে আসি।’
প্রতিবাদ জানাতে বনানীর ইচ্ছা হল না।
এসপ্ল্যানেডের মুখ থেকেই ভিড়, গাড়ি এবং মানুষের। রানি রাসমণি রোড ধরে রেড রোডের মোড়ে পৌঁছে স্কুটার থামিয়ে অপেক্ষা করতে হল ফুটবল খেলা ভাঙার ভিড়ের মধ্যে পড়ে। হাজারে হাজারে মানুষ রাস্তা পার হচ্ছে।
‘কার খেলা ছিল, মোহনবাগানের?’
‘জানি না, ওসব খবর রাখি না। ফুটবল বিশ্রী লাগে আমার। যারা খেলে, যারা খেলা নিয়ে মাতামাতি করে, এইসব লোক…কী কুৎসিত, কী নির্বোধ, দেখো মুখগুলো।’
‘তুমি খেলোনি কখনো?’
‘স্কুলে বহু বছর আগে, আমার হাইট দেখে গোলে নামিয়েছিল। গোটা ছয়েক গোল খাবার পর মাঠ থেকে বেরিয়ে আসি। আর কখনো যাইনি।’
বনানীর চোখে পড়ল, বহু লোক তাদের দিকে তাকিয়ে যাচ্ছে। নিশ্চয় হিরুও তা লক্ষ করছে। রাগছে হয়তো। সবাই ওর চেহারার দিকে তাকাবেই, এই একটা ধারণা ওকে পেয়ে বসেছে।
মোটরগুলো ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। কতগুলো ছেলে একটা মোটরের গায়ে চাপড়ে দিল। ড্রাম পেটানোর মতো শব্দ হল। হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গোটানো, খালি গা, হাতে চটি, লিকলিকে একটি ছেলে মোটরের চালে উঠে কোমর দুলিয়ে নাচছে। কেউ দেখছে, কেউ দেখছে না। দশ-পনেরোটি ছেলে বাসের চালে, পিছনের বাম্পারে দাঁড়িয়ে, জনা পাঁচেক, দরজায় ঝুলছে। রোদে-পোড়া শুকনো মুখ, অবসন্ন শরীর, কিন্তু অধিকাংশেরই চোখ জ্বলজ্বলে। এমন চোখ, বনানী ভাবল, তাদের বাড়িতে কারোরই নেই, শুধু কিরণের ছাড়া।
‘ফুটবল ব্যাপারটাই বিশ্রী, মানুষগুলোকে কী করে দেয় দেখেছ? জানোয়ারের মতো বিহেভ করে।’
‘আমাদের পাড়াতেও হয়, তবে এভাবে নয়।’
থামতে থামতে স্কুটারটা এগিয়ে চলেছে। ক্রিকেট স্টেডিয়াম ছাড়িয়ে আউট্রাম ঘাটের দিকে যত এগোচ্ছে ভিড়টা তত পাতলা হয়ে আসছে। বাঁদিকে ঘুরে কিছুটা এগিয়ে হিরু স্কুটার থামাল। চমৎকার সময়। সূর্য স্তিমিত, ঘোর কমলাবর্ণ। সূর্যের দিকে এখন নির্নিমেষে তাকিয়ে থাকা যায়। শান্ত মৃদু ধূসরতা গঙ্গার ওপর ছড়ানো। নদী-সম্পর্কিত পদ্যে যেমন বর্ণনা থাকে, প্রায় সেইরকমই। পাখিরা গাছে ফিরে এসে কিচিরমিচির করছে, নৌকো বাঁধা রয়েছে কূলে, তীরে ছলাৎ ছলাৎ জোয়ারের আঘাত। এমনকী বিশ্রামে ব্যস্ত জাহাজগুলো বা ওপারের চিমনির ধোঁয়াও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে গেছে। ডাইনে হাওড়া সেতুটা না থাকলে পুরো ছবিটাই বাজে হয়ে যেত।
‘এখানে কি প্রায় আসো।’
‘খুব বেশি নয়, সল্টলেক থেকে বড্ড দূর। তবে কলেজ ছুটির পর তিন-চারবার এসেছি।’
‘আমাদের বাড়ির কাছে গঙ্গাকে এরকম সুন্দর লাগে না।’
বনানীর ভালো লাগে কলকাতার ভোরের রাস্তা, যখন চায়ের আর খাবারের দোকানগুলো খোলার তোড়জোড় চলে। স্কুলে যাওয়ার সময় ইচ্ছে করেই সে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ দিয়ে যেত, ঘুরপথ হলেও।
দু-জনে মন্থরগতিতে হাঁটছে। বেঞ্চগুলোর একটাতেও বসার জায়গা নেই। ঢালু পাড়ে জোড়া নারী ও পুরুষ বসে। অন্ধকার নামলে ওরা নিশ্চয় আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে আসবে।
‘বাবু, নৌকো?’
হাঁটুর কাছে তোলা কাপড়, গেঞ্জি-পরা মাঝি উঠে এসে দাঁড়িয়ে আছে।
‘ঘণ্টা বিশ টাকা।’
ওরা অগ্রাহ্য করে কয়েক পা এগিয়ে, পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ছুটির দিনের মানুষের মতো অলসভাবে আবার হাঁটতে লাগল। মাঝে যেন পূর্বনির্ধারিত শর্ত অনুযায়ীই ওরা দাঁড়িয়ে পড়েছিল গঙ্গার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকাবার জন্য।
