পাশের টেবলে মালাই দিয়ে গেছে। তারা আড়চোখে দেখছে, চামচে ভেঙে বড়ো টুকরোটা মুখে দিয়েই বউটি, মুখ থেকে প্লেটে ফেলে মুখ বিকৃত করল।
‘বোধহয় দাঁতে গণ্ডগোল আছে।’
‘খুব যন্ত্রণা হয়। একবার আমার হয়েছিল। ঠান্ডা জল খেতে গেলে মনে হত সারা মুখ যেন গুঁড়িয়ে দিচ্ছে কেউ।’
দু-প্লেট ফুচকা, প্রতি প্লেটে চারটি আর বাটিতে তেঁতুলের জল, ওদের সামনে রেখে গেল। সঙ্গে লঙ্কা গুঁড়ো, নুন আর গোলমরিচ।
আজ বিকেলে হিরু স্কুটার নিয়ে টাইপ স্কুলের সামনে অপেক্ষা করছিল। তাকে দেখামাত্র আঙুল দিয়ে পিছনের সিটটা দেখিয়ে স্টার্ট দেওয়ায় ব্যস্ত হয়। ও যেন ধরেই রেখেছিল, বনানী না বলবে না।
সে বলেওনি। হিরুর জন্য সে অপেক্ষা করে গেছে। প্রতিদিনই স্কুল থেকে বেরিয়ে দু-ধারে তাকিয়ে খুঁজত এবং বিষণ্ণ হত।
‘কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? আমাকে কিন্তু পড়াতে যেতে হবে।’
‘আমাকেও পড়তে যেতে হবে, সামনেই পরীক্ষা। কিন্তু দুটো কাজই আজ বন্ধ থাকবে।’
কণ্ঠস্বরে হালকা গোঁয়ারতুমি ছিল। বনানীর মনে হয়, হিরু বয়স্ক পুরুষ সাজার চেষ্টা করছে।
‘আগে কখনো এখানে খেয়েছ?’
‘না। শুনেছি এদের মালাই নাকি ভালো।’
‘কেমন লাগছে?’
‘এই ফুচকা?’
‘না, ওই গানটা?’
রেকর্ডে পুরুষকণ্ঠে গান বাজছে। হিরু মাথা হেলিয়ে কিছুক্ষণ শুনে বলল, ‘কিশোরকুমার? না না, মান্না দে…ভালোমন্দ লাগাটা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে, আমার ভালো লাগে সেতার। তোমার?’
‘ওটাও নির্ভর করে।’
গরম বিকেল। ছুটির পর নারী-পুরুষ অফিস থেকে বেরিয়ে বাস ধরার জন্য তিক্ত ব্যস্ত মুখে অপেক্ষা করে যাচ্ছে। ফুটবল মাঠের ভিড় এইবার যুক্ত হবে ওদের সঙ্গে।
‘কী ভাবছ এখন?’
‘কিছু না। তুমি?’
‘কিছুই না।’
পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ওরা যেভাবে হাসল, এমনভাবে হাসতে দেখেছে বনানী নতুন প্রেমিকদের। এই হাসির মানে হয় না।
‘তুমি কি পড়াশুনো ছেড়েই দিলে? কলেজে ভরতি হও না।’
‘ভাবছি প্রাইভেটে পড়ব।’
বনানী এই মুহূর্তের আগে পর্যন্তও পড়া নিয়ে ভাবেনি। হঠাৎই বলে ফেলল।
‘ভাবছি কোচিংয়ে ভরতি হব, কলেজে পড়তে ভালো লাগে না। যারা কেরিয়ার তৈরি করতে চায়, তারা রেগুলার হয়ে পড়ুক।’
‘কী করবে ঠিক করেছ?’
‘কিছুই না। টাইপ শিখছি, যদি কোথাও চাকরি পাই। পড়াশুনো করে আমার কিছু হবে না, আমার থেকেও বিদ্যে নিয়ে লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিজের চলার মতো একটা কিছু পেলেই আমি খুশি।…না, বিয়েটিয়ের কথা ভাবছি না।’
‘মালাই খাবে?’
‘না।’
‘লস্যি খেতে আমার খুব ভালো লাগে।’
রাজি হবার জন্য ওর মুখে অনুনয়। বনানী মাথা হেলাল।
‘অ্যাই, দুটো লস্যি দাও।’
‘স্পেশ্যাল?’
‘হ্যাঁ।’
‘হিরু, তোমার কোনো বন্ধু নেই?’
‘ওই দু-একজন…’
‘তা বলছি না, এমন কেউ যার কাছে সব কথা বলতে পারো।’
‘না।’
‘বাবা-মা?’
‘সব কথা নয়। তোমার?’
‘না। টাইপ স্কুলের ওরা অনেক কথা গলগল করে বলে কিন্তু আমার তো তেমন কোনো কথা নেই।’
‘কী কথা বলে?’
বনানী অস্বস্তিতে পড়ল। হিরুকে ওসব কথা বলা যায় না, উচিতও নয়।
‘কে কাকে ভালোবাসল, কোথায় বেড়াতে গেল, কী বলল এইসব। প্রথম তুমি যেদিন স্কুটার নিয়ে গেছলে, সেদিনই একটি মেয়ে গল্প করল, সে আর তার বয়ফ্রেন্ড আগের দিন সারা দুপুর ট্রেনে গল্প করে কাটিয়েছে।’
‘দারুণ তো। ট্রেন আমার খুব ভালো লাগে। যাবে একদিন কোথাও? যেকোনো ট্রেনে, ঘণ্টাখানেক-দেড়েকের জার্নি, একটা স্টেশনে নেমে একটু ঘুরেই আবার ফিরে আসব। যাবে?’
‘বেশ।’
একটুও চিন্তা না করে সে রাজি হয়ে গেল। হিরুর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ তার মনে পড়ল, এর দিদিমা আত্মহত্যা করেছিল…বা খুন হয়েছিল।
দু-গ্লাস লস্যি টেবলে রেখে গেছে। দইয়ের ফেনার মধ্যে স্ট্র।
‘চুমুক দিয়ে কেউ খায় না?’
‘অনেকেই খায়, তবে স্ট্র-এ আলাদা একটা মজা আছে।’
দু-জনেই একসঙ্গে মুখ নামিয়ে লস্যি টানতে টানতে চোখ তুলে তাকাল। একই সঙ্গে ওদের চোখ হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এইগুলোই কী মূহূর্ত!
‘বেশিক্ষণ বাড়ির বাইরে থাকলে কেউ কিছু বলে না?’
‘মা বলে।’
বনানীর মনে হল সত্যি কথাটা বললেই হত, কেউই কিছু বলে না, কেউ কারোর খোঁজই রাখে না। শুধুই লক্ষ করে যায়।
‘আমাদের বাড়ি একটু গোঁড়া, সেকেলে ধরনের। তোমাকে কিছু বলে না?’
‘না মা-ও কিছু বলে না।’
‘তোমার মা আমাদের সম্পর্কে কিছু বলেন না?’
হিরুর চোখে বিব্রত ছায়া পড়েই মিলিয়ে গেল। বনানী বুঝল, আলোচনা হয়েছে এবং সেটা তাদের অনুকূলে নয়।
‘দু-একবার হয়েছে, এমন কিছু নয়। জান বনা, একটা বুলওয়ার্কার কিনব ভাবছি। দিনে দশ মিনিট, তিন সপ্তাহেই মাসল তৈরি করে দেবে! আমার তো বিশ্বাস হয় না, সম্ভব কি?’
প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাবার জন্যই হিরু হঠাৎ বুলওয়ার্কের কথা তুলল। ওর বাবা অথবা মা কী আলোচনা করতে পারে তাদের সম্পর্কে?
‘মেয়েটার নাম যেন কী?…বনা, বনানী, অনেকটা মায়ের চেহারাই পেয়েছে। ছোটোবেলায় অলকা ওর মতোই দেখতে ছিল।’
‘তোমাদের পাশের বাড়িতেই থাকত?’
‘হ্যাঁ, ওরা অনেকগুলো বোন। সবাই খুব ঝগড়ুটে তবে অলকা একটু অন্য ধরনের ছিল। পড়াশুনোয় তেমন মাথা ছিল না, কিন্তু খাটত। ওর মেয়েও তো খুব খাটে-দুটো টিউশনি, টাইপ শেখা।’
‘ওর মা কীরকম নির্জীব ধরনের, আমার তো মনে হয় না নতুন করে তুমি বন্ধুত্ব শুরু করতে চাও।’
