দুপুরে বনানী ছোট্ট একটা ঘুম দেয়। চোখ সদ্য জড়িয়ে এসেছে, তখন বাসু তাকে ধাক্কা দিয়ে তুলল।
‘কী বলবি বলছিলিস?’
‘বোস।’
খাটে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে আধ-বসা বনানী অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল বাসুর মুখের দিকে। নিশ্চয় বুঝতে পেরেছে কিরণকে নিয়েই কথা হবে, তাই ওকে অস্বাচ্ছন্দ্যে, আবছা কৌতূহলী দেখাচ্ছে। বনানীর মনে পড়ল, আজ সকালে কিরণ যখন চা দিল তখন বাসু যেরকম নরম মিষ্টি হেসেছিল তার দিকে তাকিয়ে বনানী সেটা আশা করেনি। বাবা-মা যখন থাকে না তখনই বাসু আসল অনুভবগুলো দেখাতে পারে।
এটা কয়েকদিনের ব্যাপার, নিছকই শরীরের খিদেমাত্র, বনানী এইরকম একটা কিছু ভেবেছিল। কিন্তু সকালের ওই চাহনিটা তাকে অন্য কিছু বুঝিয়ে দিয়েছে।
‘কী ব্যাপার?’ বাসু অধৈর্য হয়ে বলল।
বনানী শব্দগুলোকে সাবধানে বেছে নিল। ওর ভয়, বাসু হয়তো রাগে চিৎকার শুরু করবে। কে জানে দরজার পাশে মা এসে দাঁড়িয়ে আছে কি না। নিঃশব্দে মা চলাফেরা করে।
‘তোর সাবধান হওয়া উচিত।’
লাল হয়ে উঠল বাসুর মুখ। বেপরোয়া স্বরে বলল, ‘কীসের জন্য সাবধান?’
‘কাল রাতে একটা ব্যাপার হয়েছে যখন তুই ওপরে…’
‘মা?’
‘না…বাবা…’
‘বাবা কী করেছে?’
‘তুই ওপরে ওঠার কিছু পরেই বাবা ঘর থেকে চুপি চুপি বেরিয়ে ওপরে গেছল।’
‘কীজন্য? আড়ি পেতে শুনতে? দরজা ফাঁক করে দেখতে?’
‘মনে হয় না দরজা পর্যন্ত গেছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল সিঁড়ির মাঝবরাবর। বোধ হয় মনে আঘাত পেয়েছে।’
‘তার মানে?’
বনানী সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারল না। বাসু হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠল।
‘তুই কি বলতে চাস যে বাবাও… তা হলে বাবাও… তা হলে…।’
কথাটা শেষ করার ক্ষমতা পাচ্ছে না।
‘হাঁ।’
‘ওহ, আর এ বাড়িতে বাস করা যাবে না। একেই তো অসহ্য এক মা, তার ওপর…’
‘চুপ, আস্তে।’
খাঁচার বাঘের মতো বাসু পায়চারি শুরু করল। নিজেকে বশে রাখার চেষ্টা করছে।
‘কিরণের সঙ্গে যদি কিছু করিই, তাতে ওর কী? আমার বয়সে এই লোকটা কী করত? ঘোড়ার ঘাস কাটত? তা করে থাকলে অবশ্য আশ্চর্য হবার কিছু নেই…একটা হেক্কোড়বাজ…হেক্কোড়বাজ…’
মনে হল শব্দটা উচ্চচারণে অনিচ্ছা, কিন্তু তা সত্ত্বেও মুখ থেকে বেরিয়ে এল:
‘একটা হেক্কোড়বাজ হিজড়ে।’
‘দাদা চুপ কর।’
বাবার প্রকৃত ব্যক্তিত্বটা যে কী, সে সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা বনানীর পক্ষে আজও সম্ভব হয়নি। কখনো কখনো বাবাকে তার মনে হয়েছে, বাজে লোকদের মতো নিজেকে খুব উঁচু পর্যায়ের লোক হিসাবে জাহির করার আপ্রাণ চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নেই। মাঝে মাঝে দুঃখও বোধ করে কারোর জন্য। যদি প্রথম থেকেই মুখ বুজে মাথা নুইয়ে থাকার বদলে কড়া শাসনে বাসুকে রাখত, তা হলে আজ ও অন্যরকম হত না?
‘আমাকে এই বলার জন্যই ডেকেছিলি?’
‘সাবধান করার জন্য ডেকেছি।’
‘তোর কি মনে হয় না, বাবা একটা কেঁচো টাইপের লোক?’
বনানী চুপ রইল। বাবা সম্পর্কে অস্বস্তি আর অসুখী হওয়া ছাড়া আর কিছু সে বোধ করছে না। যথেষ্ট লম্বাচওড়া মানুষ কিন্তু কেমন যেন একটা ওজনের অভাব রয়ে গেছে।
তার বয়সি অন্য মেয়েরা এভাবে তাদের বাবা-মায়ের সমালোচনা করে কি? বনানী জানে, এ বাড়িতে তারা সবাই একে অপরের উপর নজর রাখে। কিছুই তাদের চোখ এড়ায় না, না কোনো ভঙ্গি, কোনো কথা, না কারোর চোখের পলায়মান ঝিলিক।
দরজার পাশে মায়ের শাড়ির পাড় দেখতে পেল বনানী পূর্ব অনুমান মতোই। ঠোঁটে আঙুল রেখে সে বাসুকে চুপ থাকতে ইশারা করল।
‘তাতে কী হয়েছে, যা বলার আমি সামনেই বলব। বেশ করেছি…আরও করব।’
বাসু ঘর থেকে বেরিয়ে এক পলক তাকাল ডানদিকে। ওখানেই মা দাঁড়িয়ে, তারপর বাঁদিকে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল অত্যন্ত শব্দে।
ঘরে মায়ের প্রবেশ অবশ্যম্ভাবীই এবং তাই ঘটল। বনানী অদ্ভুত রকমের একা বোধ করল এই মুহূর্তে মায়ের দিকে তাকিয়ে। করুণা ছাড়া আর কিছু মনের মধ্যে খুঁজে না পেয়ে নিজেকে ধিক্কার দিল।
রাতে বাবা যখন ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বহুক্ষণ তিনতলার সিঁড়িতে দাঁড়িয়েছিল তখন মা কি জেগে ছিল?
৩
‘কী খাবে?’
‘তোমার কী ইচ্ছে?’
বনানী কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করল। লস্যি আর মালাই ছাড়া আর যা তার কাছে লোভনীয়, পাশের টেবলে এক অবাঙালি দম্পতি তাই খাচ্ছে-ফুচকা। সেইদিকে তাকিয়ে বনানী হাসল। এবং সে যা আশা করেছিল, হিরুর চোখে মজা পাওয়ার চকচকানিতে দেখতে পেল। অবশ্য, মিনিট পনেরো আগে যখন তাদের দেখা হয়, তখন থেকেই ঝকমক করে যাচ্ছে ওর চোখ। বনানীর মনে হচ্ছে, তার নিজের চোখেও ওইরকম কিছু একটা হচ্ছে।
বয় অর্থাৎ ঝাড়ন কাঁধে এক যুবক অধৈর্য ভঙ্গিতে টেবলের পাশে জিজ্ঞাসু চোখে দাঁড়িয়ে।
‘ফুচকা, দুটো।’
বয় যেন জানতই এমন ভাব দেখিয়ে চলে গেল।
‘তোমার ভালো লাগে?’
‘নিশ্চয়ই, টক আর ঝাল আমি দারুণ খাই।’
‘আমিও।’
আজেবাজে কথা, কিন্তু কোনোদিন হয়তো এগুলোই গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে। কে বলতে পারে। জীবনে এমন মুহূর্তও আসে যা মনে হয় খুবই সাধারণ, যাকে একদমই কেউ লক্ষ করে না, তারপর বহু বছর পর, হয়তো বুড়ো বয়সে, তখন টের পায় বাকি জীবনটা ওই মুহূর্ত থেকে ঘুরে গেছে।
জুক-বক্সে হিন্দি ফিল্মের গান বাজছে। বনানীর সামনের দেওয়ালে সাঁটা লম্বা আয়না। তাই দিয়ে সে ফুটপাথের চলমান মানুষদের দেখতে পাচ্ছে। রাস্তাটা বাঁদিকে গজ কুড়ি-পঁচিশ গিয়ে পড়েছে চৌরঙ্গিতে। রাস্তাটায় বনানী আগে কখনো আসেনি, নামও জানে না। জীবনে কয়েকবার মাত্র এই অঞ্চলে সে পা দিয়েছে। কিন্তু রাস্তার নাম নিয়ে কী আসে যায়! কিছুই যায় না, কিছুই আসে না, একমাত্র তাদের চোখের ঔজ্জ্বল্যটুকু ছাড়া, এই হালকা মনের মজার অভিব্যক্তি ছাড়া যেন তারা নিজেদের নিয়েই হাসাহাসি করছে অথবা যেন তারা আপনা থেকেই জেনে গেছে আসল সময়ের বাইরের মুহূর্তগুলোর মধ্যে ডুবে আছে।
