‘আলাপ-টালাপ করে নাকি?’
‘অল্পদিন, মাস তিনেকের। প্রথম দর্শনেই প্রেম।’
তপন আমুদে প্রকৃতির, রসিকতা করার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করে না।
‘তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব’খন।’
‘আমার কথা তাকে বলেছ।’
‘পাগল! বলে কখনো! তোমার খবর কী? আমার ধারণা ছিল এতদিন তোমার বিয়ে হয়ে গেছে।’
‘নাহ, আপাতত আমার ওতে ইচ্ছে নেই।’
‘তা হলে করবে কী, বছর দশেকের মধ্যেই তো বুড়ি হয়ে যাবে।’ তপন আন্তরিক ও সরলভাবেই বলেছে। আঘাত দেবার বা বিদ্রূপের ইচ্ছা কণ্ঠস্বরে নেই। বনানী হালকা স্বরে বলল, ‘আমার এক মাসি বিয়ে না করে, একা দিব্যিই আছে। এখন বয়স প্রায় চল্লিশ। তা ছাড়া সন্ন্যাসিনী হয়েও তো কত মেয়ে জীবন কাটাচ্ছে।’
‘তা হলে একজন ঈশ্বরজাতীয় পুরুষ তোমার দরকার। এই বাসটা ধরতেই হবে, চলি।’
তপন ছুটল বাসের দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে বনানীর মনে হল, কী যে অদ্ভুতভাবে জীবন চলেছে, তাদের বাড়ির নাটকীয় পরিবেশের বাইরে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষ কতরকমভাবে যে জীবন কাটাচ্ছে। রাস্তায় যখনই কারোর সঙ্গে দেখা হয়, তখনই তার মনে হয় ওরা সবাই যে যার নিজের জগতের কেন্দ্রে রয়েছে। ওদের চারপাশে যাই ঘটে চলুক তার থেকেও বেশি ব্যস্ত নিজের ঘটনা নিয়ে।
বনানী নিজেকে অন্য পাঁচজনের মতোই হিসেব করে। বাবা, মা, বাসু এদের নিয়েই তার চিন্তা। কখনো কখনো সে নিজের কথাও ভাবে। ছোটোমাসির মতো একটা ঘরে, অফিসের সময়টুকু বাদ দিয়ে, সারাক্ষণ সকাল-সন্ধ্যা কাটাচ্ছে-এমন একটা ছবি কল্পনা করতে তার ভালোই লাগে। একাকিত্বটা বিশ্রী লাগবে, তা তার মনে হয় না, বরং স্বস্তিই পাবে।
রোদটা চড়া লাগছে। বনানী পথে ঘুরে বেড়াবার ইচ্ছা ত্যাগ করে বাড়িমুখো হল। এই মুহূর্তে বাড়িতে রয়েছে দুটিমাত্র মেয়েছেলে, যারা পরস্পরকে দু-চক্ষে দেখতে পারে না। হয়তো হুবহু তা নয়, তবে সন্দেহ নেই মা অন্তর থেকে ঘৃণা করে কিরণবালাকে। ও একইসঙ্গে স্বামী এবং ছেলেকে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। কিন্তু কিরণ? সারাদিনই টিভি দেখছে, কখনো একতলায় নামছে কখনো তিনতলায় উঠছে তরতরিয়ে। মাঝে মাঝে গুনগুন করে যাত্রার অথবা হিন্দি ফিল্মের গান। ওর গলায় সুর আছে। কোনো মানুষের দিকে তাকালে সেই মানুষের মুখে আপনা থেকেই হাসি ফুটে ওঠে। অধিকাংশেরই এমন হয়। কিরণের ক্ষেত্রেও তাই আশা করা যায়। কিন্তু বনানী বহুবার জানান না দিয়ে, কিরণ টের পাবার আগেই মুখোমুখি হয়ে দেখেছে, সেই একই তৃপ্ত হাসি মুখে লেগে আছে।
দু-তিনদিন অন্তর মাসির কাছে যায়। হয়তো ওখানে ওর প্রেমিক আছে, বাসুর মতোই কেউ।
এইভাবে চিন্তা করায় বনানী অভ্যস্ত নয়, কিন্তু চিন্তাটা এসে পড়লে থামানোও যায় না। একটা মেয়ে একাধিক পুরুষের সঙ্গে প্রেম করতে পারে কী করে! তার নিজের কি এমন ইচ্ছে হয়? এ ব্যাপারে তার মাথাটা পরিষ্কার। নিজেকে দেখতে ভালো নয়, এটা সে জানে। তপনের সঙ্গে ব্যাপারটা এমনিতেই বেশিদূর গড়াত না। পুরুষকে টানতে পারি, নিজের কাছে এমন একটা প্রমাণ সব মেয়েই দাখিল করতে চায়। এটাও তাই। তপন পরিচ্ছন্ন ব্যবহার করে গেছে।
কিন্তু সে কুশ্রী কিনা, তাই নিয়ে এখন বনানী আর ভাবে না। সে যেমনই হোক না কেন, জানে সত্যিই সে কুশ্রী নয়, শরীরের দিক থেকেও সম্ভবত যথেষ্টই আকর্ষণীয়। মুখটা তার মিষ্টি নয়, সাজগোজটাও পরিপাটি হয় না কিন্তু শরীরের গড়ন ভালো, বিশেষ করে বুকের। রাস্তায় বেরোলে, পুরুষদের চোখ তার শরীরের কোথায় পড়ে এটা সে জানে। মাথায় সে খাটো সেজন্যই কমবয়সি দেখায়।
হিরু তাকে ওর থেকেই ছোটোই ভেবে নিয়েছে। দু-এক বছরের এধার-ওধার, এটা এমন কিছু নয়। ও নিশ্চয় আকর্ষণ বোধ করছে আর সেটাই অদ্ভুত লাগছে বনানীর। কিরণের প্রতি বাসুর যে টান, সেরকম নয়। মেয়ে না হয়ে ছেলে হলেও বোধ হয় হিরু একই ব্যবহার করত তার সঙ্গে। বোধ হয় ও সমব্যথী সহমর্মী কাউকে চায়, যে বাইরের জগতের কাছে কুঁকড়ে আছে কোনো একটা ঘাটতির জন্য। ওর দেহ-কাঠামোর স্বাভাবিকত্বের ঘাটতির পরিপূরক খুঁজে পেয়েছে বনানীর সৌন্দর্যের ঘাটতির মধ্যে। কিন্তু বিপরীত মেরু তো পরস্পরকে আকর্ষণ করে না!
হয়তো তা হলে অন্য কোনো অভাব আছে ওর মধ্যে। হয়তো স্নেহ, মনোযোগ, সহানুভূতি যথেষ্ট পায়নি। বাবা-মা যথেষ্ট ভদ্র-মার্জিত এবং শিক্ষিত তো বটেই কিন্তু দু-জনেই ব্যস্ত থেকেছে নিজেদের কাজে। হিরু হয়তো খেলার সঙ্গী পায়নি, অভিমান করার লোক পায়নি। তা হলে এখন কি সে বনানীর মধ্যে আকাঙ্ক্ষা পূরণের উপাদান পেয়েছে? নিজের এই দিকটা নিয়ে সে কখনো ভাবেনি। স্নেহপরায়ণা মায়ের মতো কোনো ব্যাপার কি তার মধ্যে থেকে উছলে পড়ে অজান্তেই?
স্নেহ-ভালোবাসা-মনোযোগ বনানী নিজেও তো পায়নি। জন্ম থেকেই অসুস্থ রুগণ মা আর উদাসীন বাবার সান্নিধ্যে রয়েছে এবং এখনও। বছর দশেক বয়স পর্যন্ত বাসুই তার সঙ্গী ছিল। কিন্তু বাসুরও তো নিজস্ব চাহিদা আছে, সে কারোর কাছ থেকেই তা মেটাতে পারেনি।
বাসুর সঙ্গে কিরণের ব্যাপার নিয়ে কথা বলার ব্যাপারটা তার মনে পড়ল। বনানী দ্রুত পা চালিয়ে যখন বাড়ি পৌঁছল তখন সে অনেক ভালোবাসা ও সহানুভূতিতে ভরে উঠেছে এবং বিশেষ কোনো লোকের উদ্দেশে নয়।
