বনানী ভেবেছিল, এরপর বাবা-মার মধ্যে কথা হওয়ার শব্দ পাবে, কিন্তু ঘরটা আগের মতোই নীরব রয়ে গেল। নিশ্চয় হাতড়ে হাতড়ে বাবা খাটে উঠেছে আর যদি জেগে থাকে তা হলে মা নিশ্চয় ঘুমের ভান করে আছে।
ক-টা বাজে আন্দাজ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল বনানী। মাথার মধ্যে ঘূর্ণি চলেছে, মানসিক অবস্থা ঘোলাটে। ভোররাতে তার ঘুম এল।
সকালে তার পড়ানোর কাজ আছে। কিন্ডারগার্টেনের সাত বছরের ফুটফুটে ছেলেটি। বনানীর ওকে ভালো লাগে, তাই কোনোক্রমেই গরহাজির হয় না।
দেরি হয়েছে ঘুম থেকে উঠতে। তাড়াতাড়ি কলঘরের দিকে এগোল। নীচে ঝি বাসন মাজছে।
‘কোনো বাড়িতে রোজ রোজ পোড়া বেরোয় না। শুধু তোমাদের বাড়িতেই। আজ দু-হপ্তা ধরে…।’
কিরণকে দু-চক্ষে দেখতে পারে না নাড়ুর মা। মা-র সঙ্গে মাঝে মাঝে এ বাড়ি-ও বাড়ির গল্প করে। বিনিময়ে চা এবং বাসি রুটি খায়। টুকটাক জিনিস নাড়ুর মাকে দিয়ে মা কিনিয়ে আনে।
কলঘরের দরজা বন্ধ।
‘বাসুদা গেছে।’
রান্নাঘর থেকে কিরণ বলল। বনানী দরজায় টোকা দিল।
‘কে?’
‘আমি বনা, তাড়াতাড়ি কর।’
‘এখুনি বেরোবে, অনেকক্ষণ গেছে।’
কিরণ চায়ের কাপ হাতে বেরিয়ে এল।
‘ততক্ষণ খেয়ে নাও।’
বনানীর মনে হল কিরণকে বেশ তাজা প্রফুল্ল দেখাচ্ছে। বাবা নিজে বাজার করে। বাজার করা সেরে এখন সেরেস্তায়। মা এখনও শুয়ে। বাসু কি ওদের মুখোমুখি হয়েছে? হলে ওরা চোখ সরিয়ে স্বাভাবিক দেখাবার চেষ্টা করবে হয়তো, তিনজনেই।
‘মুখ ধুইনি, দাঁত মাজিনি, এখনই চা দিলে কেন? রোজ রোজ বলতে হবে নাকি?’
বনানী বিরক্তি লুকোল না, মুখের রুক্ষতাও।
‘রোজ রোজ আর কোথায়! দেরি করে উঠলে, এদিকে চা হয়ে জুড়িয়ে যাচ্ছে তাই…।’
কিরণ মার্জনা চাওয়ার ভঙ্গিতে চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে গেল। ওর নিতম্বে হাঁটাচলার সময় ভাঁজ পড়ে। বোধহয় ইচ্ছে করে দোলানোর জন্যই। বাবাও কি এটা লক্ষ করে? মা নিশ্চয়ই করেছে। বনানীর নিজেকে বিস্বাদ লাগছে। গতরাত্রের ব্যাপারটা মনে পড়ছে বারবার।
কলঘর থেকে বেরিয়ে বাসু নিজের ঘরে যেতে যেতে থেমে রান্নাঘরের দিকে তাকাল। কিরণও তাকিয়ে।
‘চা দাও।’
‘দাদা, তোর সঙ্গে একটা কথা আছে।’
বাসু ভ্রূ তুলল।
‘বল।’
‘এখন নয়, টিউশনি থেকে আসি।’
বাসু বা রান্নাঘরে না তাকিয়ে বনানী কলঘরের দিকে এগোল। ‘জরুরি কিছু? এখন বল।’
‘না, পরে বললেও চলে।’
বাড়ি থেকে বেরোবার সময় বনানী দেখল সেরেস্তায় দুটি লোক বাবার সামনে বসে। ওদের একজনকে সে কয়েকবার দেখেছে তার ছাত্রের বাড়ির কাছে, বাড়িটার কাছে প্রায় সকালে দাঁড়িয়ে থাকে। বস্তিতে ঢোকার মুখে টালির চালের দোতলা বাড়ির বারান্দায় ও লোকটাকে সে দেখেছে। একতলায় গুদাম আর দোকান। দোতলায় বোধহয় ব্যবসার গদি। লোকটাই বস্তির মালিক, বোধহয় অবাঙালি। গলায় সোনার চেন, আঙুলে বড়ো বড়ো পাথর বসানো গোটা চারেক আংটি আর থলথলে শরীর সহজেই চোখে পড়ে। ভাড়াটে তোলার কী ভাড়াটেকে পিটিয়ে ফৌজদারি মামলা ফাঁদার জন্য প্রায়ই আসে। চোরাই মাল বিক্রির কারবার আছে। বাবাকে খুব খাতির করে। ওই বস্তিরই বাসিন্দা এক ঝি কিরণকে এই বাড়িতে দিয়েছে! কিরণের নাকি মাসি হয়। কিরণ মাঝে মাঝে দুপুরে মাসির বাড়ি যায়।
বনানীকে ফিরে আসতে হল ছাত্রের বাড়ি থেকে। ছেলেটির মামার বিয়ে, তাই আজ সকালেই বর্ধমান রওনা হয়েছে মায়ের সঙ্গে। সাতদিন পর ফিরবে।
হাতে যথেষ্ট সময়। বনানী ঠিক করল আর যেখানেই সে যাক, এখন বাড়িতে নয়। কিরণ এবং মা ছাড়া সারাদিনই কেউ থাকে না। মায়ের সঙ্গে কথা বলার মতো কথা তাকে উদ্ভাবন করতে হবে। সেটা ক্লান্তিকর, বিরক্তিকর ব্যাপার। কিরণকে সে এড়াতেই চায়।
কোনো বন্ধুর বাড়ি এখন সে যেতে পারে। কিন্তু কার কাছে? স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে গেছে। কলেজের কাউকেই সে বন্ধু করেনি। ফেল করার পর একরকম আত্মগোপনই করে ছিল কয়েক মাস। প্রায় চুপিসারে কম্পার্টমেন্টাল দিয়ে তার পাশ করার খবরটাও, বাড়ির তিনজন ছাড়া কেউ জানে না। বাসু জানে কী জানে না, সে বিষয়ে বনানী নিশ্চিত নয়।
এ-গলি সে-গলি দিয়ে বনানী কিছুক্ষণ হাঁটল। এইসময় তার হিরুকে মনে পড়ছিল। হয়তো ওর ভালো লাগত কলকাতার অলিগলি দিয়ে হাঁটতে। হিরু কলকাতার ভিতরের কিছুই দেখেনি।
‘খুব হাঁটতে, বাংলার গ্রাম দেখতে, খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু আমার চেহারাটার দিকে সবাই যেভাবে তাকায়!’
বনানী গ্রে স্ট্রিট ধরে হাতিবাগানে এসে শ্যামবাজারের দিকে যাবার জন্য মোড় ফিরিয়েই দেখল ঠিক তার সামনেই হেঁটে চলেছে তপন। অফিস যাবার জন্য বাসস্টপের দিকে যাচ্ছে। হাতে ভিআইপি ব্রিফকেস। চলার মধ্যে ভারিক্কিপনা রয়েছে।
‘তপুদা, এই তপুদা!’
তপন ঘুরে দাঁড়াল। বিস্মিত চোখে মৃদু হাসি ফুটল। বছর চারেক আগে স্কুলের বন্ধু প্রীতির বাড়ির ছাদে এই তপন তার হাত ধরে গাঢ়স্বরে দু-চার কথা বলেছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। ব্যাপারটা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয় তপনের একটা চিঠি বাসুর হাতে পড়ার পর। বনানী ভয়ে সিঁটিয়ে ছিল প্রায় এক মাস। বাসু কিন্তু কিছুই বলেনি।
‘আরে বনা, খবর কী?’
‘তোমার খবর কী?’
‘দারুণ খবর আছে।’
‘বিয়ের?’
‘এগজ্যাক্টলি।’
‘কাকে?’
‘চিনবে না। হস্টেলে থাকে, বেথুনে পড়ে থার্ড ইয়ারে।’
