বনানীর ধারণা, মায়ের কাছ থেকেই সে তীক্ষ্ন শ্রবণক্ষমতাটা পেয়েছে। বাড়িটার বয়স নাকি নব্বুই। এখানে যাবতীয় শব্দ যেন ঢাকের মতো প্রতিধ্বনিত হয়। একতলার কল থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ার শব্দ সে শুনতে পায়, গঙ্গার ওপারে মালগাড়ি সান্টিংয়ের শব্দও। বড়ো রাস্তা থেকে দ্রুতগামী মোটরগাড়ির শব্দ পেয়ে এক এক সময় তার মনে হয়েছে, অন্যান্য মানুষই সত্যিকারের বাঁচা বাঁচছে, সে নয়। গাড়িগুলো কোথাও যাচ্ছে, কোথাও থেকে আসছে। রাতের এই সময়ও সিনেমা থেকে, বিয়েবাড়ি থেকে মানুষ ফেরে, গল্প করতে করতে, হাসতে হাসতে। এ বাড়িতে হাসে কিরণ, তার চারপাশের পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন। কিরণকে সে ঈর্ষা করে কি না, সেটা বনানী ঠিক বুঝে উঠতে এখনও পারেনি। ওর চোখা নাকচোখ, ছিপছিপে গড়নে শরীরের শক্ত বাঁধুনির থেকে চঞ্চল খলবলে স্বভাবটাই প্রথমে অস্বস্তিকর ঠেকে তারপর চুম্বকের মতো সুট করে টেনে নেয়। স্বাস্থ্য এবং জীবনীশক্তিতে ও ভরা এবং অচেতনভাবেই ওর শরীর থেকে তা উপচে পড়ে। আর কুড়িয়ে নেবার জন্য….। বনানী যা আসা করেছিল এখন তাই ঘটছে।
বাসুর ঘরে শব্দ হল সামান্য। খাট থেকে নেমে এসে বনানী দরজা সামান্য ফাঁক করল। বাবা, মা কি ঘুমিয়ে পড়েছে? বাসুর ঘর থেকে জমাট একটা অন্ধকার বেরিয়ে পা টিপে তিনতলার সিঁড়ির দিকে চলে গেল। কিরণ অপেক্ষা করছিল নিশ্চয়, কেননা সিঁড়িতেই ফিসফিস শোনা গেল।
ঘর থেকে বেরিয়ে বনানী সিঁড়ির কাছে এল। এই নিয়ে সাত-আটবার এমনটি ঘটল। গত কুড়ি দিন ধরে এটা চলছে। বাসু আর কিরণকে রেখে সকলের হিরুদের ফ্ল্যাটে নিমন্ত্রণ রাখতে যাওয়ার দিনই বোধ হয় শুরু হয়েছে ব্যাপারটা।
ওরা দু-জনে এখন সিঁড়িতে। সিঁড়িটা একটা পাক দিয়ে তিনতলায় উঠেছে। বনানী কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু তার মনে হচ্ছে দু-জনে দু-জনকে জড়িয়ে আছে। চুম্বনের মতো শব্দও যেন শুনতে পেল।
কিরণের ঘরের মেঝেয় কিছু একটা চাপড়ানোর শব্দ উঠল। বোধ হয় বালিশ। মা ও কি শব্দটা শুনল? শুনে থাকলে কী মনে করছে? বাসুর বয়স বাইশ মাত্র। এই বয়সে এইরকম কিছু ঘটলে সেটা অস্বাভাবিক নয়।
তবু মা-র পক্ষে এমন ব্যাপার মেনে নেওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। তার নিজের বাড়িতে, নিজের এলাকায় এটা হচ্ছে, তাও আবার রাঁধুনির সঙ্গে। এই মানসিক যাতনা কতদিন সহ্য করবে? বাসুকে কেউ কিছু বলে না। বললেও এখন আর শুনবে না।
গত পনেরো দিন ধরে মা রূঢ় ব্যবহার করে যাচ্ছে কিরণের সঙ্গে। কিন্তু ও যেন তা গ্রাহ্যই করছে না। এ বাড়িতে চার-পাঁচ মাসের বেশি কাজের লোক টেঁকে না মা-র জন্যই। কিরণের আগে দু-মাস কোনো লোকই ছিল না, বনানীকেই সব কাজ করতে হয়েছে। সে চায় না কিরণ কাজ ছেড়ে চলে যাক। কিন্তু কিরণকে ধরে রাখার জন্য কি এইসবকে প্রশ্রয় দিয়ে চোখ বুজে থাকতে হবে?
বনানী নিঃসাড়ে নিজের ঘরে ফিরে এল। ওরা দু-জন নিশ্চয়ই এখন মেঝেয় কিরণের ছেঁড়া শতরঞ্চিতে শুয়ে। একটাই বালিশ। কে মাথায় দিয়েছে? আর ঠিক মাথার উপর, এই কথাটাও এখন ওদের মনে নেই। কিংবা আছে, তবে পরোয়া করে না। ওদের নড়াচড়ার শব্দ বড়ো জোরে নয়। বনানী একইসঙ্গে ছাদের শব্দ ও বাবা-মা-র ঘরের নৈঃশব্দ্য শুনতে লাগল।
জেগে থাকলে ওরাও নিশ্চয় শুনছে উপরের শব্দ।
হঠাৎ দরজা খোলার মৃদু শব্দ। পাশের ঘরের দরজা। আবার সেটা বন্ধ হল। বনানী দরজার ফাঁকে চোখ রাখল। খালি পায়ে কে সিঁড়ির দিকে গেল তার প্রায় মুখ ঘেঁষে। ভারী নিশ্বাস এবং চুরুটের গন্ধ থেকে বনানী বুঝে গেল লোকটি কে। অনেক সময় নিয়ে বাবা সিঁড়ির কাছে পৌঁছল। নিথর দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর তিনতলায় উঠতে লাগল।
কীজন্য উঠছে? আজ এই মুহূর্তেই কি বাবা আবিষ্কার করল ছেলে রাঁধুনির ঘরে গেছে, নাকি আগেই জেনে এখন হাতেনাতে ধরার জন্য উঠছে?
অপূর্বচন্দ্র দত্ত, বি এ এল এল বি, বয়স চুয়ান্ন, সর্বদাই যাকে দেখে মনে হয় দায়িত্বের বোঝা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সে এখন অন্ধকারে খালি-গায়ে, লুঙ্গি পরে শুনছে ছেলে এবং রাঁধুনির জড়ামড়ির শব্দ। বনানীর আগেই সন্দেহ হয়েছিল, কিন্তু বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হত না-বাবা প্রেমে পড়েছে এবং কিরণেরই প্রেমে। তা না হলে এই সময় বিছানা থেকে উঠত না। ওই বিছানায় তার স্ত্রী হয়তো জেগে রয়েছে বা যেকোনো মুহূর্তে জাগতে পারে। নিঃসাড়ে বিছানা ছেড়ে কী দেখতে বেরিয়েছে? যা জানার তা তো এখন জানল, আর কোনো প্রমাণই দরকার হবে না।
এবার কী করবে? নিজেকে নীচুস্তরে নামিয়ে আনতে, হুট করে দরজা খুলে দিয়ে প্রেমিক যুগলকে কি চমকে দেবে?
বনানীর চোখের সামনে অন্ধকার। বাবা নিজেকে যন্ত্রণায় দগ্ধ করা ছাড়া এই মুহূর্তে আর কী করছে! ওর বুকে কোনো রাগ আছে কি না বনানী তা জানে না। তবে দেখেছে, কিছু একটা ঘটলেই অজান্তে ডান হাতটা বুকে রাখে। এখন কি বুকে হাত রেখেছে? এরকম পরিস্থিতিতে তার বাবার মনে কী হতে পারে, তা সে আগে কখনো কল্পনা করেনি। মায়ের চেহারাটা একবার তার মনে ভেসে উঠল। একটু পরেই বাবা নেমে এল। যাওয়ার মতোই নিঃসাড়ে। কলঘরের দিকে গেল। বোধ হয় ঘর থেকে বেরোনোর জন্য নিজেকেই একটা অজুহাত দিতে।
