‘ছেলেটা নাকি পড়াশুনোয় ভালো, একটু চঞ্চল মনে হল, তবে বদমাইশ নয়।’
মা খাটের একধারে বসেছে। বনানী ভাবল, কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে কি মা এসেছে? বন্ধুর ছেলের সম্পর্কেই শুধু ভাবছে না, অন্য কোনো বিষয় এখন ওর মনে?
‘ওর মা আর আমি খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলাম। পাশাপাশি বাড়ি, কতদিন আমাদের বাড়িতে রাতে থেকেছে, একই বিছানায় শুতাম। বাবা হোমিয়োপ্যাথি ডাক্তার, টানাটানির সংসার। তবে লেখাপড়ায় সুধা, ওর তিনভাই খুব ভালো ছিল। ছোটোভাই বিলেতে না আমেরিকায় কোথায় যেন আছে বলল।’
বনানী অস্বস্তি বোধ করল। এইসব স্মৃতি নিয়ে নাড়াচাড়া কেন? যেসব জিনিস তার নিজের এলাকায় নয় বলে সে মনে করে, সেইগুলি চিন্তা করাতে বাধ্য করানোটা সে অপছন্দ করে। এইসবের মধ্যে মানসিক শান্তি নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। নিজেকে নিয়ে মায়ের এই কথা বলার ইচ্ছাটা এক ধরনের দুর্বলতাই ফাঁস করে দিচ্ছে।
টাইপ কলেজের মেয়েরা যা নিয়ে বকবক করে তাতে কিছুই আসে যায় না। কেননা ওরা তাৎপর্যহীন ব্যক্তিগত কথাবার্তাই বলে। বাইরের পৃথিবীর ছিটেফোঁটা প্রতিবিম্ব যে ধরনের ছবি সকলে অজান্তে শুষে নেয় রাস্তা থেকে, অথবা খবরের কাগজের খবর থেকে, সেইগুলোই ওরা বয়ে নিয়ে আসে।
কিন্তু মা-র ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যরকম। কেন, বনানী তা জানে না। মন থেকে ভার লাঘব করা নয়, কোনো গোপন কথা বলাও নয়। মা-র কথাগুলো অসংবদ্ধ মনে হলেও ওর মনের মধ্যে যে ভাবনা চলেছে তার পটভূমিকা কিছু কিছু কথার মধ্যে দিয়ে বনানীর কাছে ধরা পড়ল।
‘সুধার মা বিষ খেয়ে মারা যায়। নিজেই খেয়েছিল না কেউ খাইয়ে দিয়েছিল, নাকি ভুল করে খেয়ে ফেলেছিল-সেটা আর শেষ পর্যন্ত জানা যায়নি। অনেকে অনেক রকম গল্প বলল। তবে সুধার দূর সম্পর্কের এক মাসির সঙ্গে ওর বাবাকে জড়িয়ে কিছু কথা কেউ কেউ বলেছিল, আমরা তখন ছোটো, ওসব কথা উঠলে আমাদের সরিয়ে দেওয়া হত।’
বনানী বুঝতে পারছে না, যেসব লোককে সে চেনে না, জানে না, তাদের নিয়ে কেন মা কথা বলতে শুরু করল। অতীত থেকে হঠাৎ অকারণে উঠে আসার মতো গল্প এটা নয়।
‘সংসারের সবকিছু ওই বয়সে সুধা ঘাড়ে নেয়। বাইরের কথাবার্তা ওর কানেও যেত, বাড়ি থেকে বিশেষ আর বেরোত না, স্কুলে যাওয়া ছাড়া। আমার সঙ্গেও কথা বলত কম। আত্মহত্যা করলে তো চিঠিমিটি লিখে রেখে যায়!’
চুপ করে থেকে মা দেওয়ালে তাকিয়ে রইল। বনানী তার মায়ের মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। হঠাৎ ঘরে এল কেন? এইসব কথাবার্তাই বা কেন! কে কবে আত্মহত্যা না খুন হয়েছে তা শুনে কী লাভ!
ঘরের ছাদে ভারী কিছু একটা সরানোর শব্দ হল। ঠিক ওপরেই কিরণের ঘর। পুরোনো ভাঙা আসবাব আছে। কিরণ এখনও তা হলে ঘুমোয়নি।
মা মুখ তুলে কড়িকাঠে তাকিয়ে।
‘তোকে বিরক্ত করছি বোধহয়।’
‘না না।’
‘সুধার মায়ের মুখের আদল পেয়েছে ছেলেটা।’
‘হিরু!’
‘হ্যাঁ।’
যেন কিছু গোপন তাৎপর্য আছে, বুকে ভার চাপানো এমন এক নীরবতা ঘরে বিরাজ করে উঠল।
‘ছেলেটাকে দেখে প্রথমেই ওর দিদিমার কথা মনে পড়েছিল। কেন যে মারা গেল! অথচ সুধার বাবা কী শান্ত, ভদ্র মানুষই না ছিলেন। বিয়ে করতে পারতেন, বোধ হয় ছেলেমেয়েদের মুখ চেয়েই করেননি। জীবনে অনেক কষ্ট করে সুধা এখন সুখী।’
মায়ের মুখে বিষাদের ছায়া। একঘেয়ে স্বরে কথাগুলো বলে উঠে দাঁড়াল। এখন যা ভাবছে তার সঙ্গে কথার সম্পর্ক যেন বহু দূরের।
‘চলি।’
এ পাশের ঘরটা বাবা-মায়ের। বনানীর ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দার রেলিংয়ে ঝুঁকে, মা নীচের সেরেস্তার দিকে তাকাল একবার, তারপর নিজের ঘরে ঢুকল।
যতক্ষণ না মা শুচ্ছে ততক্ষণ সেইজন্যই কি বাবা নীচে অপেক্ষা করে থাকে? মুখে চুরুট দিয়ে, একটা বই চোখের সামনে রেখে বোধ হয় কাজের ভান করে যায়। অতক্ষণ সেরেস্তার কাজ করার মতো পসারওলা উকিল নয়। টেনেটুনে সংসার চালাবার মতো আয় করে। বাবার ব্যাঙ্কের পাসবইটা বনানী একদিন দেখে ফেলেছিল। ঠিক পাঁচশো টাকা জমা আছে। দু-জনের শোবার ঘরে যাওয়ার মধ্যে সাধারণত মিনিট পনেরোর তফাত থাকে, যেন ওরা সামান্যতম ঘনিষ্ঠতাও এড়াতে চায়, অথচ ওরা একই বিছানায় শোয়।
মিনিট দশেক পর সিঁড়ির আলো নিবিয়ে বাবা দোতলায় উঠে এল। একমাত্র বনানীর ঘরের খোলা দরজা দিয়ে একফালি আলো বারান্দায় এসে দোতলার অন্ধকারকে বিভক্ত করেছে। বাবা ঘরে ঢুকে গেলে সে অন্ধকার জুড়ে দেয়।
বনানী অপেক্ষা করছে।
‘টাইপ কেমন শেখা হচ্ছে?’
দরজায় বাবা দাঁড়িয়ে।
‘হচ্ছে।’
‘বাসু শুয়েছে?’
‘হ্যাঁ।’
যথারীতি বাবার গলা মৃদু ভারী কিন্তু একটু চাপা।
‘এবার শুয়ে পড়ো।’
‘আর একটুখানি…’
বাবা পাশের ঘরে চলে গেল। সুইচের শব্দ হল কিন্তু কথাবার্তার নয়। এরকমই হয় প্রতি রাত্রে। বাঁদিকে বাসুর ঘরটা নিঃশব্দ। ঘরের সিলিংয়েও আর শব্দ নেই।
বই চোখের সামনে রেখে বনানীর বারবার হিরুর, তার মা এবং দিদিমা-র কথা মনে পড়ল। বই রেখে আলো নিবিয়ে সে শুয়ে পড়ল। ঘুম সহজে তার আসে না। জীবনের নানান সময়ের ভাবনা আর ছবি সার দিয়ে এইসময় তার মনের মধ্যে চলতে শুরু করে। একসময় ঘুম আসে, কিন্তু ঘণ্টা দুয়েক পরেই ভেঙে যায়। আবার ঘুমিয়ে পড়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
