‘পাইকপাড়ায়, জামাইবাবু আজ বছর চারেক হল বাড়ি করেছেন। পারচেজিং অফিসারের কাজ করেন তো।’ নারান চতুর চতুর মুখভঙ্গি করে বোঝাতে চাইল বাড়ি করার রহস্যটা। তাই দেখে তারক মনে মনে বলল, জানি জানি, বাড়িটাও একবার দেখে এসেছি লুকিয়ে। চুরির পয়সায় মন্দ বাড়ি হাঁকায়নি! বউকে সুখেই রেখেছে বলে মনে হয়। তোমার দিদির ভাগ্য ভালোই।
‘ওকে ধরেও তো কোথাও ঢুকে পড়তে পার।’
‘লজ্জা করে। কুটুমের কাছে এসব ব্যাপার নিয়ে বলতে যাওয়া কী ঠিক হবে।’
‘তা বটে।’
তারক খুশি হল। নারানকে এখন তার খুব আপনজন লাগছে। হিরণ্ময়কে দিয়ে যেভাবে হোক ওর ইন্টারভিউয়ের একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। তারপর ভাগ্যে থাকলে হবে।
নারান চলে যাবার পর তারক কাজে মন বসাতে গিয়ে পামগাছটাকে বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠতে দেখল। ‘সবাই দুড়দুড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে পালাল। কিন্তু আমি রয়ে গেলুম।’ কথাটা কি পুরো সত্যি? তারকের মনে হল, এই শুনে নারান নিশ্চয় তাকে খুব সাহসী ভাবল।
তখন নারান জন্মায়নি। দোতলার বৈঠকখানায় দেয়াল জোড়া মস্ত আয়নায় ঘরের আধখানা, দরজার কাছ থেকে দেখা যাচ্ছিল। গৌরীর পিঠটাই শুধু দেখেছিলুম। টেবলে ঝুঁকে কী যেন লিখছে। ‘কী চাই’ শুনে চট করে মুখ ফিরিয়ে গৌরী দরজার দিকে তাকাল। কিছু দেখতে না পেয়ে তখন আয়নার মধ্যে দিয়ে দরজার বাইরে আমাকে দেখেই অবাক হয়ে গেল। দূর থেকে ওকে অনেকবার দেখেছি, যখন স্কুলে যেত বা জানালায় কী ছাদে এসে দাঁড়াত। এই প্রথম এত কাছ থেকে দেখলুম, খই-এর মতো গায়ের রং, কুচকুচে ভ্রু, টান করে চুল বাঁধা, ফ্রকের রংটা ছিল হালকা গোলাপি। চোখটা আপনা থেকেই ওর বুকের উপর রাখলুম। তখন অসভ্য ব্যাপারগুলো সবে শিখেছি। গৌরী আমার থেকে বছর দুয়েকের ছোটো। মনে মনে বহুবার ওকে চুমু খেয়েছি বা উত্তেজনা তৈরির কাজে ওকে ব্যবহার করেছি।
সেই গৌরী যখন আমার দিকে তাকিয়েছিল, খুব লজ্জা করল, ঘরের কোনের দিকে তাকিয়ে কী যেন সে বলল। আয়নার ওইদিকটা দেখতে পাচ্ছিলুম না। কী একটা জবাব পেল। তখন উঠে দরজার দিকে আসতে লাগল। আয়নায় দেখছি ও এগোচ্ছে। তখন মনে হল এবার পালিয়ে যাই। হঠাৎ আয়নার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল যেন। একদম সামনে, হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। ঘাড়টাকে বাঁদিকে হেলিয়ে (কানের রিংটার সঙ্গে লাগানো ঝুমকোগুলো তখন কেঁপে উঠেছিল) হাসল, গালের উপর দিয়ে আলতো করে যেন জল সরে যাচ্ছিল, হেসে বলল-
‘সিনহা, এটা ভাই একটু মিলিয়ে দেখে দাও তো।’
পাশের টেবল থেকে লাইনবন্দি অঙ্কে ভরা একটা পাতা এগিয়ে এল। তারক একটানা পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করে গেল।
তিন
বাসটা আসছে। ডান দিকে হেলে পড়েছে। রাইটার্স বিল্ডিংসের ফুটপাথ ঘেঁষে মোড় ঘুরল। টায়ারের সঙ্গে মাডগার্ড ঘষার কিচকিচ শব্দে আউরে উঠল তারক। বাসের জানালাগুলো দিয়ে জমাট বাঁধা একসার বিষণ্ণ মুখের মানুষকে সে চলে যেতে দেখল। তারক ভাবল, এইভাবে আমি দক্ষিণেশ্বরে যাব কী করে।
দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। চেনা কাউকে পেলে গল্প করবে। এধার-ওধার তাকাল। একজনকে দেখে মনে হল বোধ হয় সকালের সেই স্ত্রীলোকটি যাকে সে ট্রাম থেকে পড়ে যেতে দেয়নি। চুলে একটা গন্ধ পেয়েছিল। বুকের কাছে মাথাটা ঠেকে ছিল আলতো। নিশ্বাস চেপে কেঁপে উঠেছিল একবার।
তারক ফুটপাথে দাঁড়িয়ে মনে করতে চেষ্টা করল। হাতটা রেখেছিল পিঠ আর বাহুর জোড়ে। ওর দেহের কিছু কিছু অংশ তার দেহের সঙ্গে ছুঁয়ে ছিল। একটা গন্ধ পাচ্ছিল চুল থেকে। মাথাটা বুকে আলতো ভাবে ঠেকছিল। গৌরী অবশ্য এর থেকে আর একটু জোরেই চেপে ধরেছিল তার মাথা। ওর চুলের গন্ধও এইরকমই ছিল। বোধ হয় সব মেয়ের চুলের গন্ধই এক। অন্ধকার সিঁড়িতে, চওড়া খিলেনের নীচে, বেলে পাথরের ধাপে দাঁড়িয়ে গৌরীর চুলের সঙ্গে দেড়শো বছরের পুরোনো বাড়ির গন্ধ মিলে, একটা প্রবল বন্য ইচ্ছা তৈরি করে দিয়েছিল। তখন সে বলেছিল, ‘আমায় বিয়ে করবে?’ গৌরী মাথা নেড়ে অস্ফুটে ‘হ্যাঁ’ বলেছিল আর গলাজড়ানো দু-হাতে মুখটা টেনে নামিয়ে ধরে উঁচু হয়ে চুমু খেয়েছিল পরপর তিন-চারটে। তারক মনে করতে চেষ্টা করল, গৌরী হঠাৎ ছুটে উপরে চলে গেল কেন! যাবার আগে ব্লাউজের বোতামগুলো কি ঠিক ঠিক লাগিয়ে নিয়েছিল? এর সপ্তাহখানেক পরই, গোপাল বলেছিল, ‘গৌরীকে বিয়ে করবি?’ কী প্রসঙ্গে ও বলেছিল?
তারক মন্থরভাবে হাঁটতে শুরু করল। সূর্যটা জি.পি.ও-র গম্বুজের আড়ালে পড়ে গেছে। সার বেঁধে লোক চলেছে বউবাজার স্ট্রিট দিয়ে শেয়ালদার ট্রেন ধরতে। কাতর চোখে মেয়েরা বাসস্টপে অপেক্ষা করছে। বাসে জানলার ধারে বসা একটি বৃদ্ধ মুখ তুলে আকাশে কী যেন দেখছে। দুটি ইউরোপীয় পুরুষ ও নারী কথা বলতে বলতে মোটরে উঠছে।
পুরুষটি প্রৌঢ়, কিন্তু তার খাড়া শরীর আর চলনের সতেজ ভঙ্গি ভালো লাগল তারকের। সেই তুলনায় নারীটিকে নেহাতই ভেতোভেতো ঠেকছে। অনেকটা রেণুর মতো। দু-জনকে যতক্ষণ দেখা যায় দেখার পর, সিদ্ধান্তে এল পুরুষরা মেয়েদের থেকে বেশি আকর্ষণীয়। তারক ঠিক করে ফেলল, ফোন করে জানিয়ে দেব আজ যেতে পারলুম না রোববার সকালে গিয়ে নিয়ে আসব। তিন মাস থাকতে পারলে আর তিনটে দিন কি পারবে না? লিখেছে নতুন বাচ্চচাটা নাকি হুবহু আমার মতো দেখতে হয়েছে। অমুটা রাত্রে ‘বাবা-বাবা’ বলে ফুঁপিয়ে উঠেছিল একদিন। ওকে ইংরিজি স্কুলে ভরতি করাব সামনের বছর।
