বনানীর এক এক সময় মনে হয়, বাবা কি ছবিতেও বুঝতে পারেনি ভাবী-স্ত্রীর রূপ কেমন! নাকি নিছকই এক সাব-জজের চতুর্থ জামাই হবার গর্বলাভেচ্ছু সদ্য-পাশ উকিলের তরল মানসিকতার শিকার হয়েছিল। বনানীর তিন মামা, চার মাসি। বোধ হয় বাবার ধারণা ছিল, শ্বশুর তাকে পসার জমাতে সাহায্য করবে। কিন্তু বছরখানেকের মধ্যেই তিনি হৃদরোগে মারা যান। তিন মেয়ের বিয়ে দিয়ে সাব-জজ দাদামশাই কোনোক্রমে চতুর্থটিকে পার করেন। ছোটোমাসির আর বিয়ে হয়নি, বরং বলা ভালো, বিয়ে করেনি।
বাবার তরুণ বয়সের কথা বনানী কিছুই জানে না, জানবার আগ্রহও নেই। তার ধারণা, ওদের বিচার করার অধিকার তার নেই, যদিও অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে মাঝে মাঝে করে। এমন এক বাড়িতে তার বাস, সেখানে প্রত্যেকে পরস্পরকে লক্ষ করে যায় এবং আলাদা আলাদা জীবনযাপন করে।
একমাত্র ব্যতিক্রম কিরণ। হিরুদের নিমন্ত্রণ করার তিন সপ্তাহ আগে সে এই পরিবারে রান্না, ঘরমোছা, কাপড়কাচা ইত্যাদির কাজে লাগে। হাওড়া জেলার গ্রাম থেকে এসে আগে দুটি বাড়িতে কাজ করেছে। একমাত্র ওর আচরণ হাবভাব থেকে মনে হয় এখানে তার চারপাশের সবকিছুই স্বাভাবিক। বাসনমাজার ঝিয়ের সঙ্গে ও ঝগড়া করে, রান্নার সময় গুনগুন করে হিন্দি গানও গায়। বনানীর আন্দাজ, তার থেকে কিরণ বছর চারেকের বড়ো।
রাতের খাওয়া শেষে বাবা একটি কলা খাবে। বনানী ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছে, একবারের জন্যও অন্যথা হয়নি। কোর্ট থেকে ফেরার সময় ব্রিফকেসে ভরে আনে, কখনো কখনো পুরো একটি ছড়াই।
কিরণ কলা রেখে গেল। বাবা অতি সাবধানে টেনে টেনে খোসা ছাড়াচ্ছিল। সবকিছুই এত মনোযোগ দিয়ে, যা বনানীর হাঁপ ধরায়। নিজেকে টেনে রাখার কেনই বা এত দরকার? ধীর, রাশভারী চালটার মধ্যে কি কিছু মেকি ব্যাপার আছে?
সবার আগে টেবলে বসার মতোই, সবার আগে বাবাই টেবল থেকে ওঠে। হঠাৎ বাসু আজ আগে উঠে পড়ল। তিনজনে মুখ তুলে তাকাতেই সে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে, থুতনিতে উদ্ধত ভঙ্গি তুলে হাত ধোবার জন্য কলঘরে ঢুকল। বাসু ইদানীং নানাভাবে বাবাকে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করছে, এটাও তাই।
‘নীচে যাচ্ছি, কাজ আছে।’
রাতের খাবার পর এ কথাটা বলেই বাবা নীচে নেমে যায়। সদর দরজার ডাইনে, রাস্তার দিকে একখানিই ঘর। সেটি বাবার সেরেস্তা। বাঁদিকে ওষুধের দোকান। দোকানটি তোলার জন্য বছর দশেক আগে মামলা করে বাবা হেরে গেছল। পঁচিশ বছরে ভাড়া সতেরো টাকা বেড়ে এখন দুশো সাতাত্তর। সদরে একটা কাঠের ফলক আছে। খুব কাছে চোখ এনে ইংরেজি অস্পষ্ট অক্ষরগুলো কোনোক্রমে পড়া যায়: অর্পূবচন্দ্র দত্ত, বি এ এল এল বি, এবং নীচে লেখা: প্লিডার।
একতলায় সেরেস্তা আর কলঘর ছাড়া কিছু নেই। দোতলায় খাবার টেবলে যে চেয়ারে মা বসে, তার পাশেই রেলিং। সেখান থেকে নীচের উঠোন আর সেরেস্তার দরজাটা দেখা যায়। জীর্ণ একটা চামড়ামোড়া ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে হাতলে পা তুলে বাবা সত্যিই কিছু কাজ করে কিনা বনানীর তাতে সন্দেহ আছে। দোতলা থেকে দেখা যায় শুধু পা-দুটি।
কিরণ টেবল থেকে বাসন সরিয়ে নেবার পর মা আবার তার চেয়ারে এসে বসে, ট্রানজিস্টর রেডিয়ো এবং সেলাই নিয়ে। টিভি খুব একটা দেখে না। আজও বসেছে। সেলাই করার মতো কিছু-না-কিছু জিনিস তার থাকেই। চেয়ারগুলো প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি যেন, কঠোরভাবে সংরক্ষিত। ভুলেও কেউ অন্যের চেয়ারে বসে না। অন্তত বনানী কখনো বসেনি।
নিজের ঘরে উপুড় হয়ে বনানী গল্পের বইয়ে ডুবে গেছল।
‘তোর আজ ফিরতে অ্যাতো দেরি হল?’
মা ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে। বনানীর প্রথমেই মনে হল, বাসু কি কিছু বলেছে? গত দু-দিন সে মা-র সঙ্গে বাসুকে কথা বলতে দেখেনি। তা হলে হঠাৎ কেন এই প্রশ্ন!
‘রোজই তো ওই সময়ের মধ্যে ফিরি।’
রাত এগারোটা বেজে গেছে। কিরণের কাজও শেষ। তিনতলায় ছাদের ঘরে সে উঠে না যাওয়া পর্যন্ত মা চেয়ার থেকে ওঠে না। সিঁড়ির আলো জ্বলছে অর্থাৎ বাবা এখনও নীচে। বাসু এখন নিশ্চয় তার ঘরে এবং সেটি বনানীর ঘরের পাশেই।
‘পরশু হিরুর সঙ্গে দেখা হল। স্কুটারে যাচ্ছিল, আমাকে লিফট দিল।’
‘হিরু!… ওহ সুধার ছেলে।’
বনানী ঠিক করে ফেলেছে, ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে জানার চেষ্টা করার আগেই সে মা-র কৌতূহল মিটিয়ে দেবে। কখনো কখনো মায়ের জন্য তার দুঃখ হয়, সেইসঙ্গে নিজের উপরও রাগ হয় মাকে করুণা করার জন্য। কখনো কখনো বাবার জন্যও দুঃখ হয়। দু-জনের মধ্যে কে প্রথম দুঃখ পাওয়ার ব্যাপারটা শুরু করায়? একসময় আমরা দু-জনেই শিশু ছিলাম, আমি এবং দাদা, এখন ওর বাইশ আমার একুশ। বনানীর মনে পড়ল, হিরুকে সে এই ধারণা দিয়েছে যে তারা সমবয়সি অর্থাৎ তারও বয়স উনিশ। ধারণাটা ভেঙে দিতে হবে। তখন ওর আচরণ কি বদলে যাবে? হয়তো নয়।
কিন্তু অন্যান্য বাবা-মা যে আচরণ করে আমাদের বাবা-মাও কি তাই করেছে? আমাদের কোলে নিয়ে ওরা কি পরস্পরের দিকে তাকিয়ে কখনো হেসেছে, চুমু খেয়েছে?
কল্পনা করা যায় না। বনানীর যতদূর মনে পড়ে বাড়িটাকে সে হুবহু এইরকমই দেখে আসছে-নীরব, শান্ত, গোছানো। বাবা ধৈর্যপরায়ণ এবং সেটা যথেষ্ট কঠিন কাজ। অনেক রাত পর্যন্ত কেন যে নীচের ঘরে কাজের অছিলায় কাটায়, বনানী তা বোঝে। কিন্তু ধৈর্য ছাড়াও বাবার কাছ থেকে আরও বেশি মা নিশ্চয়ই আশা করতে পারে। এক এক সময় তার মনে হয়, ওরা দু-জনে চেঁচিয়ে বিশ্রী ঝগড়াঝাঁটি করে আবার যদি ভাব করে নেয় তাহলে কিছুটা সহনীয় হবে পরস্পরের কাছে। তারপরেই মনে হয়, বোঝাবুঝির ব্যাপারে সে ততটা পাকা নয়, দেখতেও সুশ্রী নয়। মায়ের মতোই সাদামাটা তবে আলগা একটা লাবণ্য আছে। হয়তো বয়সকালে আর থাকবে না।
