বাসু জেনে গেছে ও পিছিয়ে পড়েছে এবং যাচ্ছে। পরিচয় দেবার মতো কিছুই ওর নেই। এগিয়ে এসে আর সে সমান হতে পারবে না এটাও বোধহয় বুঝে গেছে। ওর পিছিয়ে যাওয়াটা বন্ধের জন্য কেউ কখনো চেষ্টা করেনি। কেন করেনি, হয়তো একদিন সে এই প্রশ্নটা তুলবে। রাগে একদিন ও ফেটে পড়বে কিংবা পড়ছে। কিরণবালার সঙ্গে ব্যাপারটা হয়তো সেটাই।
বাসু তাকে নিশ্চয় দেখেছে। মাকে কি বলে দেবে?
‘তোমার মেয়েকে তো দেখলুম এক ছোঁড়ার পিছনে বসে, গালে গাল ঠেকিয়ে।’
‘কে বনা!’
‘খুব তো বলো, মেয়ে কত ভালো, কত সংসারের জন্য চিন্তা করে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে বলে টাইপ শিখছে…’
ওরা হেদুয়া ছাড়িয়েছে। সামনে বিবেকানন্দ রোড।
‘হিরু থামাও, নামব।’
‘এখানে নাকি!’
‘বাকিটা হেঁটেই যাব।’
বনানী স্কুটার থেকে নেমে পড়ল।
‘এই তো সামনের গলিটা। তুমি এখন তো বাড়িই যাবে।’
‘দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিলে কি অসুবিধা হবে?’
‘না তা কেন।’
বনানী ওর চোখ থেকে চাহনি সরাতে গিয়ে আবার ফিরিয়ে আনল। হিরুর মুখটা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে, চোয়াল শক্ত, চোখে ঝোড়ো রং। ঠিক এইরকম বাসুরও হয় যখন রাগতে শুরু করে।
‘আচ্ছা পৌঁছে দাও।’
হিরু একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে। স্কুটারের ইঞ্জিন বন্ধ করেনি। চাহনিতে এবার ফুটে উঠল আহত অভিমান। মাথা নেড়ে সে ক্লাচ ছাড়ল। ঝাঁকুনি দিয়ে কয়েক গজ গিয়েই ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। হিরু মাথা নুইয়ে স্টার্ট করার জন্য লাথি ছুড়ছে। জ্যা-টানা ধনুকের মতো পিঠটা বেঁকে। কিছু একটা ওর মধ্যে থেকে থরথর করছে। সিটে হাত রাখল বনানী।
‘পৌঁছে দেবে না?’
স্টার্ট নিয়েছে। হিরু উঠে বসল এবং সামনে তাকিয়ে ঘাড় শক্ত করে স্কুটার চালিয়ে দিল। বনানী তাকিয়ে রয়েছে। হিরু বিবেকানন্দ রোডের মোড়ে পৌঁছে একটুও গতি কমাল না। ডানদিক থেকে আসা একটা দোতলা বাসের রেডিয়েটর ছুঁয়েই প্রায় গোঁয়ারের মতো স্কুটারটা সোজা বেরিয়ে গেল। এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ দেরি হলে… বনানী কয়েক সেকেন্ড ধরে বুকের মধ্যে কম্পনটা অনুভব করল। সেটা থিতিয়ে যাবার পর ধীরে ধীরে বিষণ্ণতা ছেয়ে এল।
মন্থর পায়ে ছাত্রী-বাড়ির দিকে যেতে যেতে তার মনে হল, যদি আজ কামাই করতাম। ছাত্রীর মা পরদিনই নিশ্চয়ই জানিয়ে দেবে। আগের দিদিমণি ফাঁকিবাজ ছিল, বড্ড কামাই করত, আর সেজন্যই তাকে ছাড়াতে হয়েছে।
দূরে একটা স্কুটার দেখে বনানী থমকে দাঁড়াল। লোকটা বেঁটে, মাথায় হেলমেট। হিরুর সঙ্গে তৃতীয়বার মাত্র আলাপ হল। হয়তো আবার আসবে, টাইপ কলেজের সামনে। কিন্তু অদ্ভুত লাগছে এই বিষণ্ণতাটা, এতে সে অভ্যস্ত নয়।
২
টেবলে খাওয়ার ব্যবস্থাটা এই পরিবারে নতুন। হিরুদের ফ্ল্যাটে ওরা প্রথমে একসঙ্গে বসে খেয়েছিল।
‘আমাদেরও তো একটা টেবল পড়ে আছে তিনতলার ঘরটায়, ঠিকঠাক করে নিলে হয়।’
ফেরার সময় ট্যাক্সিতে বলেছিল বনানীর বাবা। অলকা আড়চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘টেবলে খাওয়া! কোথায় টেবলটা পাতবে?’
‘কেন দোতলার বারান্দায়। রান্নাঘরের সামনে অতটা খোলা জায়গা, তিনদিকে দেওয়াল, শুধু ওপরে অ্যাসবেসটাস দিয়ে নিলেই প্রায় একটা ঘর।’
বনানী লক্ষ করেছিল, তার মা-র চোখে তক্ষুনি সন্দিগ্ধ ছায়া ভেসে ওঠে। সব কিছুতেই তার সন্দেহ। এখুনি যেন তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে এমন এক পৃথিবীতে তার মা বসবাস করে, এক ধরনের জানোয়ারের মতো, এক ধরনের শিকারি পাখির মতো, শীর্ণ গলা উঁচিয়ে চোখকান খুলে সর্বদা হুঁশিয়ার হয়ে।
রাত প্রায় সাড়ে দশটা। টেবলের দু-দিকে তারা চারজন। একদিকে বাবা এবং সে, অন্যদিকে মা এবং বাসু। কেউ কথা বলছে না। সাধারণত তাদের মধ্যে কথা হয় না, দরকার না পড়লে। অদৃশ্য এক দেওয়াল দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা খেয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি পড়ছে আর প্রত্যেকে আলাদাভাবে অ্যাসবেসটাসে বৃষ্টি পড়ার শব্দ শুনছে। হঠাৎ তারা চারজনই খাওয়া থামিয়ে পরস্পরের দিকে এক পলক তাকিয়েই আবার খেতে শুরু করল। বাবার ঘন ভ্রূদুটো কয়েক সেকেন্ডের জন্য জুড়ে গেল, মায়ের গলার পেশি শক্ত হয়ে উঠল, বাসু মুখ নামিয়ে রান্নাঘরের দিকে তাকাতে গিয়েও তাকাল না। বনানী তাকে লক্ষ করছে।
কিরণ রুটির থালা হাতে বাসুর পাশে দাঁড়িয়ে। পরিবারে বাসু ছাড়া কেউ রুটি খায় না।
‘দোব?’
‘হুঁ।’
‘তরকারি?’
বাসু মাথা হেলাল। কিরণ রান্নাঘরে ফিরে যাচ্ছে আর তাকে অনুসরণ করছে মায়ের চোখ। বনানী তাকিয়ে মায়ের চোখে। ছোট্ট ভ্রূ কুঞ্চনের পর থেকেই বাবার মুখে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
কিরণ আবার আসছে। বাসু মুখ তুলে তাকাল। বনানী নিশ্চিতভাবে বুঝে গেল একটা নীরব বার্তা কিরণের কাছে পৌঁছল। সে এটাও জানে, মাথা না ফিরিয়েই মা সেই বার্তাটি দেখতে পেয়েছে। মা সব কিছুই দেখে এবং শোনে, রা কাড়ে না কিন্তু মনে করে রাখে।
‘শরীর কেমন, মাথা ধরাটা ছেড়েছে?’
বাবা নিজেকে বাধ্য অনুভব করল কেন মা-র শরীরের খবর নিতে? মা বোকা নয়, এবং জানে কথার পিছনে কী প্রচ্ছন্ন থাকে। এত বছর ধরে এই কথাবার্তা হয়ে আসছে। বনানী ঠাওর করে উঠতে পারল না, দু-জনের মধ্যে কাকে সে বেশি করুণা করবে। মায়ের চুপ করে থাকার মধ্যে চাপা হিংস্রতা রয়েছে।
মোটমাট বাবা ও স্বামী আর এখন মাকে যেমন দেখতে এর থেকে ভালো কিছু বিয়ের সময় ছিল না। বনানী ওদের বিয়ের সময় তোলা ছবি দেখেছে। মায়ের কপাল তখনও এমনি উঁচু আর চওড়া ছিল, থুতনি যৎসামান্য। বড়ো হাঁ মুখ। বিয়ের আগে বাবা শুধু ছবি দেখেছিল মায়ের। হয়তো হাড়ের উপর চামড়াসর্বস্ব এখনকার দেহ মায়ের তখন ছিল না। বাসুর জন্মের পরই সুতিকায় আক্রান্ত হয়, এক বছর পরই বনানীর জন্ম। ভাঙা শরীর আর সারেনি, উপরন্তু হাঁপানি এবং মাথা ধরা কয়েক বছর ধরে তাকে অধিকাংশ সময় বিছানায় ফেলে রাখছে।
