‘হাঁ দেখেছিই তো তোমায় কিন্তু তুমি আগে আমায় দেখেছ, তবু সামনে দিয়ে স্কুটার চালিয়ে চলে গেলে।’
‘ডাকলে না কেন?’
‘কেন ডাকব?’
‘আমি তোমায় দেখেছি, জানলে কী করে?’
‘তা হলে স্কুটার নিয়ে ওপারে দাঁড়িয়েছিলে কেন?’
‘ক্লাচটা কেমন আটকে যাচ্ছিল, তাই-‘
একটা অমীমাংসিত ফুটবল ম্যাচের রিলে শুনে রেডিয়ো বন্ধ করে দেওয়ার মতো ও বলল, ‘এখন কোথায়, টিউশনিতে?’
‘হাঁ, কী করে জানলে?’
‘তোমাদের বাড়িতে, তোমার মা-ই বলেছেন।’
বনানী সতর্ক হল মা কী বলেছেন তার সম্পর্কে?
চিরুনিওলা নিস্পৃহ চোখে দু-জনকে দেখছিল। এবার মুখ ফিরিয়ে জনস্রোতের দিকে তাকিয়ে রইল।
‘লক্ষ করেছ, অনেক লোক আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, কেন বলো তো?’
বনানীও তা লক্ষ করেছে। ফুটপাথ ঘেঁষে স্কুটারে বসে একটি ছেলে কথা বলছে দাঁড়িয়ে-থাকা একটি মেয়ের সঙ্গে, এতে তো তাকাবেই।
বনানীর মনে পড়ল ওদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে হিরু এই কথাটা আবার তুলেছিল।
‘হাঁটলে আমাকে বকের মতো দেখায়।’
‘তুমি জানলে কী করে? নিজের হাঁটা কি কেউ দেখতে পায়?’
‘ক্লাসের ছেলেরা বলেছে, একজন তো আমায় লগা বলে ডাকে।’
‘তোমাকে মোটেই খারাপ দেখায় না।’
‘তুমি তো আমার হাঁটা দেখোনি, সুতরাং মিথ্যে কথা বললে।’
‘না দেখলেও বুঝে নিতে পারি।’
‘আচ্ছা, হেঁটে দেখাচ্ছি তোমায়।’
প্রায় আট হাত লম্বা বারান্দায় ও, এদিক থেকে ওদিকের রেলিং ছুঁয়ে, কখনো জোরে কখনো ধীরে পাঁচবার যাতায়াত করে থামল। ব্যাপারটায় বনানীর মজা লেগেছিল তাই হেসে ফেলে।
‘হাসলে। আমি অবশ্য জানতাম হাসবে। সবাই হাসে, আমার হাঁটা হাস্যকরই।’
ওর কণ্ঠস্বরে দুঃখ বা অভিমান নয়, এক ধরনের হতাশা, সেটা বনানীর কানে চাপা রাগের মতো ঠেকল। নিজের উচ্চচতা ও শীর্ণতাকে যেন সহ্য করতে পারছে না। ভারসাম্য বা সামঞ্জস্য শরীরে পেতে চায়। এটার অভাব সম্পর্কে ও খুবই সচেতন। হয়তো সারাক্ষণই ভাবে আর মনে করে সবাই তাকাচ্ছে আর হাসছে।
‘সব মানুষের হাঁটাতেই কিছু-না-কিছু হাস্যকর জিনিস আছে।’
‘বেশ তুমি হাঁটো তো, দেখি হাসি পায় কি না।’
ও হাত ধরে টেনে তাকে বারান্দার মাঝখানে দাঁড় করায়। তখন বনানীর মনে হয়, ঘর থেকে মা যেন এই দিকে তাকিয়ে, মুখে একই ব্যাজার ভাব। বাবা কিছু বলছে, যা হিরুর মা ও বাবা চোখে বিস্ময় নিয়ে শুনছে-হয়তো মামলার গল্প। সম্ভবত ডাকাতি বা খুনের।
বনানী হাঁটেনি।
‘চিরুনি পছন্দ হচ্ছে না।-আচ্ছা ওটাই দিন তো।’
চিরুনি পকেটে রেখে স্কুটারে স্টার্ট দিল।
‘ওঠো, পৌঁছে দিই।’
‘না না ট্রামেই যাব।’
‘ভয় হচ্ছে, উলটে পড়ব?’
জেদি ভঙ্গিতে বনানী পিছনের সিটে বসল। ভয় কিছুটা অবশ্যই আছে। কিন্তু কৌতূহলটা আরও বেশি। দোতলা বাসগুলো যখন গা ঘেঁসে যাবে বা সামনে থেকে মিনিবাস যখন আসবে তখন কেমন লাগবে!
‘তোমার স্কুটার আছে, জানতাম না তো?’
‘এটা কিনব ভাবছি। আমারই এক আত্মীয়ের, ট্রায়াল দিচ্ছি।’
‘চালানো শিখলে কোথায়, কবে?’
যেরকম ঝাঁকুনি দিয়ে স্কুটারটা চলতে শুরু করল এবং টলমল করে উঠল তাইতে বনানী অস্বস্তি পাচ্ছে। সামনে ট্রাম দাঁড়িয়ে, বাঁদিকে রাস্তার ওপর ভিড়। হিরু ডানদিকে ঝুঁকে দেখে নিয়ে ট্রামের গা ঘেঁসে এগোল। সামনে আর একটা ট্রাম দাঁড়িয়ে। বনানী চোখ বুজে হিরুর পিঠে মুখ চেপে ধরল।
‘যা ভয় করছিল।’
দুটো ট্রামের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে যাবার অনেক পরে বনানী চোখ মেলে। হিরুর পিঠ ও ঘাড়ের পেশিগুলো তখনও শক্ত হয়ে আছে।
‘স্কুটার তুমি চড়ো না।’
‘কেন?’
‘সব জিনিস সকলের জন্য নয়। কলকাতার ট্রাফিক মারাত্মক রকমের রেকলেশ।’
‘তাতে কী হয়েছে, আমিও রেকলেশ হব।’
‘কী লাভ! সব গাড়িই বিরাট বিরাট, ধাক্কা লাগলে তুমি উড়ে যাবে।’
গলি থেকে আচমকা একটা রিকশা বেরিয়ে এসেছে। হিরু ব্রেক কষল। বনানীর মুখ ওর পিঠে ঠেকল।
‘সত্যিই তুমি কী লম্বা। সামনের দিকে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।’
‘এটা কিনছি কেন জান! হাঁটাচলার বদলে বসে বসে গেলে কেউ আর দেখবে না।’
‘এটা কিন্তু তোমার বাতিক। লম্বা লোক কি…’
রূপবাণী সিনেমা হলের সামনে, রাস্তা পার হবার জন্য তিনটি যুবক দাঁড়িয়ে। তাদের সামনে দিয়ে স্কুটারটা যখন যাচ্ছে, বনানীর চোখ পড়ে মাঝের জনের উপর। বাসু, তার এক বছরের বড়ো ভাই। পিঠোপিঠি হলেও সে অবশ্য ‘দাদা’ বলে।
দেখতে পেয়েছে কি? স্কুটারে একটা ছেলের পিছনে যদি মেয়ে থাকে, চোখ আপনা থেকেই পড়বে। বনানী মুখ ফিরিয়ে পিছনে তাকাল। মনে হল, বাসুর সঙ্গে তার চাহনি যেন মিলল। মনে হল, বাসুর চোখে বিস্ময় দেখল।
বাসু চেনে না হিরুকে।
‘দাদা, কাল মা-র বন্ধুর বাড়িতে নেমন্তন্ন আমাদের, যাবি তো?’
‘মা-র বন্ধু আছে নাকি! কোত্থেকে জুটল আবার?’
‘স্কুলের বন্ধু। দারুণ ভাব ছিল। স্কুল ছাড়ার পর দু-জনের প্রথম দেখা পঁচিশ বছর বাদে বড়োমাসির নাতির ভাতে।’
‘এতদিন পর!’
‘ওরা বাইরে বাইরেই কাটিয়েছে, ভদ্রলোক ইকনমিকসের প্রফেসর, কানাডায়ও দু-বছর ছিলেন ডক্টরেট করার জন্য। এখন যাদবপুরে পড়াচ্ছেন, একটিই ছেলে, বি এ ফার্স্ট ইয়ার। ওরা সল্টলেকে ফ্ল্যাট কিনেছে। মা-র বন্ধুও এম এ পাশ।’
‘মা-র বন্ধু!’
বাসু অবাক হয়নি, শুধু ব্যঙ্গভরে ভ্রূ তুলে রাখে।
‘তোরা যা।’
হিরুরা যেদিন সন্ধ্যায় পালটা নিমন্ত্রণে আসে সেদিন বাসু দুপুরে বেরিয়ে রাত সাড়ে এগারোটায় ফিরেছিল। হিরুকে ও দেখেনি। বনানী বুঝতে পারে ভদ্র মার্জিত শিক্ষিত লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা, আলাপ বাসু এড়াতে চায়। ও যখন ক্লাস এইট থেকে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করল, বোমা পাইপগানে দক্ষতা অর্জন শুরু করল, রাতের পর রাত বাড়ির বাইরে কাটাতে লাগল তখন কোনো শাসন, কোনো নিষেধ সতেরো বছরের বাসুকে করা হয়নি। বাবা নির্বিকার ছিলেন এখনকার মতোই। মাকে তো কোনোদিনই গ্রাহ্যের মধ্যে আনেনি। ওকে নিয়ে বনানী ছাড়া আর কেউ মাথা ঘামায় না।
