বনানী অলস ভঙ্গিতে এগোল। ফুটপাথে হরেকরকমের সামগ্রী সাজিয়ে চারদিকে দোকান, বাড়িগুলোর দেওয়ালে দোকান, মাঝে চলার পথটাকে সরু করে দিয়েছে। জলের পাইপ বা টেলিফোন কি ইলেকট্রিক তার পাতার জন্য ফুটপাথটা কবে খোঁড়া হয়েছিল। ইটের টুকরো, কাদা আর গর্তে পথটা বিরক্তিকর হয়ে আছে। বনানীর ভিড় ভালো লাগে না। এখুনি সিনেমা ভাঙবে। পিলপিল করে মানুষ সিনেমাহলগুলো থেকে বেরিয়ে আসবে। কিছু মুখে সুখ, কিছু মুখে বিষণ্ণতা। ট্রামে-বাসে-রিকশায় বা হেঁটে এই জনতা সরে যাবে, এসে পৌঁছবে আর একদল। একই বেশ, একই গন্ধ, একই সাজ।
হিরু খুব মন দিয়ে চিরুনি দেখছে চোখের কাছে এনে। যেন প্লাসটিকের এই জিনিসগুলো ছাড়া পৃথিবীতে আপাতত গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই। বনানী সামনে তাকিয়ে চিরুনিওয়ালার পাশ দিয়ে যাবার সময় একটু মন্থর হল। সে আগ বাড়িয়ে কথা বলবে না। ওর যদি কথা বলার ইচ্ছে থাকে তা হলে দেখতে পেয়ে নিশ্চয় ডাকবে।
‘আরে বনা! ছুটি হল বুঝি?’
‘হিরু! এখানে যে?’
‘এই একটা চিরুনি কিনতে। সরু-দাড়ার তেমন পাচ্ছি না, চুলে বড্ড ময়লা জমে, কোনটা নিই বলো তো?’
‘চিরুনিতে ও ময়লা উঠবে না, শ্যাম্পু করা দরকার।’
‘শ্যাম্পু? বলছ? তা হলে তাই-ই, কিন্তু কোন শ্যাম্পু কিনব?’
‘ক্লিনিক প্লাস।’
চিরুনিওলাকে পার হয়ে বনানী শাড়ির দোকানের সামনে এসে থামল। ছাপা-শাড়ি সার দিয়ে ঝুলছে ভিতরে এবং বাইরে। মাঝবয়সি দুই গিন্নি মুখ তুলে শাড়ি দেখছে। সে তাদের সঙ্গে যোগ দিল। ও ডাকেনি। হয়তো দেখতে পায়নি কিংবা চিনতে পারেনি।
না পারার কোনো কারণ আছে কী! দু-বার তারা কথা বলেছে। বনানী বাবা-মার সঙ্গে ওদের ফ্ল্যাটে গেছল দু-মাস আগের এক সন্ধ্যায়। কয়েক সপ্তাহ পর হিরু তার বাবা-মার সঙ্গে এসেছিল তাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণে। কতদিন হবে। বড়ো জোর কুড়ি দিন। এর মধ্যে ভুলে যাওয়া সম্ভব কি?
তাকে উপেক্ষা করার মতো ছেলে ও নয়। যতটুকু আলাপ হয়েছে, বনানী ওর মধ্যে দেমাক তো পায়ইনি বরং একটু বেশি সরল, উচ্ছ্বাসপ্রবণ মনে হয়েছে।
‘মা বলেছিল, তুমি আমারই বয়সি। কিন্তু তোমাকে তো অনেক ছোটো দেখাচ্ছে…আমার উনিশ। কিন্তু এমন ঢ্যাঙা হওয়ার জন্য কত বড়ো মনে হয় বলো তো!’
‘পুরুষমানুষ লম্বাই তো ভালো।’
‘কিন্তু তাই বলে এমন সিড়েঙ্গি-মার্কা বকের মতো!’
প্রথম আলাপে ও নিজেকে নিয়েই কথা বলে যায়। বাবা-মা বসবার ঘরে। হিরুর মা-ই ওদের দু-জনকে হিরুর ঘরে গিয়ে গল্প করতে বলেন।
‘বড়োদের সঙ্গে বসে থাকবে কেন, হিরু তোমার ঘরে বনানীকে নিয়ে যাও।’
শোনামাত্র বনানীর মায়ের চোখে একটা কালো ছায়া পড়ে।
‘না, এখানেই থাক না।’
‘ওরা নিজেদের মধ্যে গল্প করুক, কী বড়োদের আজে-বাজে কথা শুনবে? যাও, তোমরা ও ঘরে।’
হিরুর মা মৃদু ধমকের সুরে বললেন। ধমকটা তার প্রাক্তন বান্ধবীকে। মা শুকনো হেসে মাথা হেলিয়ে বনানীকে অনুমতি দেন। বাবার ঠোঁটে পাতলা হাসি ফুটে উঠেছিল। কদাচিৎ কথা বলেন, কোনো কোনোদিন একটিও নয়।
‘আমার হাইট ছ-ফুট এক, আমার অন্তত পঁচাশি কেজি ওজন হলে তবেই মানাত। কিন্তু কত ওজন জান? বলো তো?’
বনানী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে।
‘তবু আন্দাজ করো।’
ভ্রূ কুঁচকে আন্দাজ করার ভান করতে করতে সে লক্ষ করে হিরুর চোখদুটো একটু কোটরে বসা, ভুরু ঘন, কপাল ছোটো, মাথার চুল ঘাড় ও কান ঢাকা, মুখের আকার চৌকো ধরনের, অসম্ভব ফর্সা রং এবং ঠোঁটজোড়া গোলাপি।
‘সত্তর কেজি।’
‘ধ্যাৎ, তোমার আন্দাজের কোনো ক্ষমতাই নেই। এই ডিগডিগে চেহারায় কী… স্রেফ ষাট কেজি। পরশু গ্লোবে আমরা সিনেমা দেখতে গেছলাম, তখন ওজন নিয়েছি। বাবার কত জান…বাহাত্তর, মায়ের আটান্ন! তোমার?’
উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই ও অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছল। ঘর থেকে বেরিয়ে একসময় তারা বারান্দায় দাঁড়ায়। চারজনের কথার টুকরো ভেসে আসছিল। টেলিফোন বেজে ওঠায় হিরুর ঘরের দরজার পর্দাটা যতবার ফুলে ভেসে উঠেছিল বনানী মায়ের মুখ দেখতে পাচ্ছিল বিরক্ত, সন্দিগ্ধ এবং অসুস্থ ভাব, যা সারাদিন রুগণ মুখটায় বিরাজ করে, তা আরও স্পষ্ট ফুটে রয়েছে। শৈশব থেকেই সে মায়ের এই মুখ দেখে আসছে।
‘দিদি ভেতরে এসে দেখুন না, আরও অনেক ডিজাইনের আছে।’ দোকানের কাউন্টার থেকে লোকটা ঝুঁকে রয়েছে। শাড়ি কেনার উদ্দেশ্যে পছন্দ করতে করতে যেসব ভাব মুখে ফুটে ওঠে নিশ্চয় সেইরকম হয়েছে। বনানী অপ্রতিভ হয়ে মাথা নাড়ল। মনের ভাব মুখে বুঝতে না দেওয়ার ব্যাপারে কখনো সে সফল হয়নি। এ ব্যাপারে তার মা কখনো ব্যর্থ হয় না।
‘নতুন টাঙ্গাইল এসেছে দিদি, ভেতরে আসুন।’
বনানী মুখ ফিরিয়ে নিল এবং চোখাচোখি হল। হিরু তার দিকেই তাকিয়ে। চোখমুখ কুঁচকে জিব বার করে ভ্যাংচাল। না হেসে উপায় রইল না বনানীর।
‘দেখেও যে দেখলে না।’
‘কই, দেখতে তো পাইনি, সত্যি বলছি।’
‘বারে, অত জোরে বনা বনা বলে দু-বার ডাকলাম। তুমি তাকালেও, তখন এই চিরুনিটা তুলে দেখালাম তোমায়।’
‘মোটেই দেখাওনি।’
‘দেখাইনি?’
‘না। চিরুনি চোখের সামনে তুলে ধরে নিজেই দেখছিলে, ওকে দেখানো বলে না।’
শুনতে শুনতে ওর চোখে দুষ্টুমির মজা ঝকমক করে উঠল। বনানী বিব্রত বোধ করল। বোকার মতো সে ধরা পড়ে গেছে।
