বাসন্তীর কানে মুখ ঠেকিয়ে ব্রতীন বলল, ‘ঘরে চলো।’
‘না।’ বাসন্তীর শরীর কঠিন হয়ে গেল।
অপ্রতিভ ব্রতীন ছেড়ে দিল বাসন্তীকে। সোজা হয়ে বসে বাসন্তী বলল, ‘এই পর্যন্তই থাক। আমাকে ভাবতে দাও, পরে তোমাকে জানাব। জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটা এত চট করে, না ভেবেচিন্তে নেওয়া যায় না। আমাকে কিছুদিন সময় দাও বতু।’
ব্রতীন যেন ভিড় রাস্তায় কলার খোসায় পা দিয়ে আছাড় খেয়েছে এমনভাবে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘তার মানে তুমি আমার কথায় রাজি নও, যেভাবে আছ সেইভাবেই থাকতে চাও?’
‘না চাই না। শুধু কয়েকটা দিন সময় চাই, ছেলের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তোমার মুম্বাইয়ের ঠিকানাটা দাও।’
ব্রতীন পার্স থেকে কার্ড বার করে বাসন্তীর হাতে দিয়ে বলল, ‘ফোন নাম্বারও রয়েছে, এসটিডি করতে পারো সন্ধের পর।’
‘আমি এবার যাব, তুমি কি বেরোবে?’ বাসন্তী উঠে দাঁড়াল।
ব্রতীন অবসাদ বোধ করল। উত্তেজনা আর প্রত্যাশা এতক্ষণ তাকে টানটান করে রেখেছিল এখন মিলিয়ে গেছে। সে মাথা নাড়ল, ‘আমি একটু ঘুমোব।’
ঘর থেকে বেরোবার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে বাসন্তী থামল, ফিরে এসে ঝুঁকে ব্রতীনের ঠোঁটে ছোট্ট চুমু খেয়ে বলল, ‘মানুষের মতো বাঁচতে পারব এমন একটা জীবন চাই আমি।’
ব্রতীন খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে বসে বাসন্তীর চটির শব্দ শোনার চেষ্টা করল। নিমির উঁচু হিলের শব্দ অনেকক্ষণ পেয়েছিল। বাসু বোধহয় লিফটে নামছে। ব্রতীন দ্রুত ঘরে ঢুকে ছোটো বারান্দাটায় গিয়ে দাঁড়াল। একটু পরেই দেখল বাসন্তী ফটক দিয়ে বেরিয়ে বড়ো রাস্তার দিকে গেল। হাত তুলে ট্যাক্সি থামিয়ে ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে দরজা খুলে ভিতরে উঠে বসল। ট্যাক্সিটা চলে গেল।
ঘরের মধ্যে এসে ব্রতীনের খেয়াল হল পাখাটা ঘুরছে। কী আশ্চর্য, পাঁচদিন ধরে এটা ঘুরে যাচ্ছে, সেদিন ভুলেই গেছলুম বন্ধ করতে।
বনানীদের বাড়ি
নর্থ এন্ড কমার্শিয়াল কলেজের দোতলা থেকে বনানী আরও তিনটি মেয়ের সঙ্গে নেমে ফুটপাথে পা দিয়েই রাস্তার ওপারে তাকাল।
পাঞ্জাবির দোকানে রুটি আর কষামাংস খাওয়ার প্রস্তাব উঠেছে কিন্তু বনানী রাজি নয়। তাকে টিউশনিতে যেতে হবে। আসলে সে ভীষণ একটা কৌতূহলের মধ্যে নেমে পড়েছে। টাইপ করার সময় সে দেখতে পেয়েছিল হিরু একটা স্কুটার চালিয়ে দু-বার আসা-যাওয়া করল। ওর স্কুটার আছে এটা তার জানা নেই। তবে চালক যে হিরুই প্রথমবার পিছনটুকু দেখেই সে বুঝতে পারে। এমন লম্বা, রোগা এবং ঝাঁকড়া চুল সংবলিত ছেলে হিরুর সঙ্গে আলাপ হওয়ার আগে পর্যন্ত সে দেখেনি। মিনিট দুয়েক পরেই ও যখন ফিরে আসছে, বনানী ওর মুখ তিন-চার সেকেন্ডের জন্য দেখতে পায়। মনে হল হিরু আড়চোখে একবার দোতলার দিকে তাকাল। লম্বা সাইনবোর্ডটা দোতলার জানালাগুলোর নীচেই।
ওর যাওয়া এবং আসার মন্থর ধরনটা দেখে বনানীর মনে হয়েছিল নিছকই সময় কাটাবার জন্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আরও মনে হয়, আসা-যাওয়াটা কয়েকবারই হয়েছে। কিন্তু কেন?
‘মীরা খাওয়াবে বলেছে, জীবনে এমন ব্যাপার আর কিন্তু ঘটবে না বনা।’
শুধু কৌতূহল মেটাবার জন্যই সে ওদের সঙ্গে গেল না। রাস্তার ওপারে হিরু গভীর মনোযোগে স্কুটারটা পরীক্ষা করছে উবু হয়ে। বোঝাই যাচ্ছে কারোর জন্য অপেক্ষা করছে।
দু-বার মাত্র আলাপ। বনানীর মনে পড়ল, প্রথম দিনেই ওকে বলেছিল, কোথায় টাইপ-শর্টহ্যান্ড শেখে এবং কোন সময়ে তার ক্লাস। বনানীর হঠাৎ মনে হল, তার জন্যই হিরু অপেক্ষা করছে।
‘না রে কাল যাইনি, আজ ও কী ভাববে, শুরুতেই কামাই।’
‘মীরার পেটে অনেক গপপো জমে আছে। কাল দু-জনে ট্রেনে সারা দুপুর বেড়িয়েছি, আয় না শুনবি। খেতে তোকে হবে না।’
ওরা কিন্তু খুব চাপ দিল না। ওদের সঙ্গে বনানীর বন্ধুত্ব হয়েছে এখানেই, টাইপ শিখতে এসে। তুমি থেকে তুই সাতদিনেই, কিন্তু মাখামাখির পর্যায়ে সে যেতে পারেনি। সম্পর্কটা আলগা সখ্যের বেশি করেনি। হিরু স্টার্ট দিচ্ছে স্কুটারে-এক হাতে হ্যান্ডেল, অন্য হাতে সিটটা ধরে মুখ নীচু করে। একবার যদি এদিকে তাকায় তা হলে চোখাচোখি হবে। বনানী ঠিক করল সে হাসবে।
কিন্তু হিরু তাকাল না।
স্কুটারে উঠে উত্তরে হাতিবাগানের দিকে কুড়ি-পঁচিশ মিটার এগিয়ে, রাস্তার এপারে এসে ফুটপাথ ঘেঁষে থামল। ঝুঁকে এক চিরুনিওলাকে কিছু বলতেই লোকটা টুল থেকে উঠে দু-তিনটি চিরুনি ওর হাতে দিল।
বনানী হাতঘড়ি দেখল। ঘড়িটা ওর মায়ের। স্কুল ফাইনাল পাশ করার পর মা একদিন দেরাজ থেকে বার করে।
‘বিয়ের পর অনেক কিছুই তো একে একে গেছে, এটা তুই রেখে দে।’
বনানীর বাবা অপূর্ব দত্ত ছোটোবেলায় বাবা-মাকে হারিয়ে বড়ো হয়েছে জ্যাঠার কাছে। ওকালতি পাশ করার পর জ্যাঠাই তার বিয়ে দিয়ে পাঁচিল তুলে বাড়ি ভাগ করে তাকে আলাদা করে দেন। তরুণ উকিল অপূর্বকে তখন কয়েকটা বছর কষ্টের মধ্যে কাটাতে হয়েছে। তিন ভাড়াটেদের মধ্যে রাস্তার উপর ওষুধের দোকানটা তার ভাগে পড়েছিল। প্রধানত ভাড়ার দুশো ষাট টাকাই সেদিন সম্বল ছিল আর অলকার গহনা।
সত্যিই তার দেরি হয়ে যাচ্ছে। বনানী পাঁচমাথার মোড়ের দিকে তাকাল। একটা দোতলা বাস আসছে কিন্তু ট্রামের টিকি দেখতে পেল না। বাস বড়ো ঝাঁকায়, ধাক্কাধাক্কি বেশি, অসভ্য লোকেরা সুযোগ নেয়। পারতপক্ষে সে বাসে ওঠে না। কিন্তু ও কি চিরুনি কিনতেই সল্টলেক থেকে শ্যামবাজার এসেছে?
