ব্রতীন হাসল, বাসন্তীর মুখ দেখে বুঝল ওর মন কুটিল হয়ে যাচ্ছে, সন্দেহ করছে বদমতলবে বোধহয় বতু তাকে এখানে এনেছে।
‘ভয়ের কিছু নেই, তোমাকে রেপ করা খুব সহজ ব্যাপার হবে না।’
বাসন্তী কী একটা বলতে যাচ্ছিল লিফট নেমে আসায় বলা হল না। বেরিয়ে এল থলি হাতে এক বৃদ্ধ। লিফটে ঢুকে বাসন্তী বলল, ‘ও কাজটা করতে হলে কলজের জোর চাই সুতরাং ভয় আমি পাচ্ছি না, তবে কাল যেসব কথা বললে তাতে ভয় পেয়েছি।’
ব্রতীন জবাব দিল না। ছ-তলায় লিফট থেকে বেরিয়ে ফ্ল্যাটটার দরজার দিকে এগোল। ফ্ল্যাটের তালাটা খুলে মুখ ফিরিয়ে দেখল বাসন্তী তখনও লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে।
‘কী ব্যাপার, এসো!’
‘কীরকম অন্ধকার-অন্ধকার, নির্জন, শব্দ-টব্দও নেই, ফিল্মে মার্ডার করার আইডিয়াল লোকেশান ঠিক এইরকমই হয়।’
‘রেপ করার মতো কলজের জোর নেই বলে ভেবো না ছুরি মারার মতো হাতের জোর নেই।’
দরজার পাল্লা খুলে ব্রতীন ভিতরে ঢুকে আলো জ্বেলে দিল। বাসন্তী দরজা পার হয়েই ভ্রু কুঁচকে ঘরটাকে তন্নতন্ন দেখতে লাগল।
‘আচ্ছা বতু, তুমি থাকো বোম্বে তোমার বন্ধু কানপুরে, এই ফ্ল্যাটের চাবি তোমার কাছে এল কী করে?’
ব্রতীন কয়েক সেকেন্ড সময় নিল উত্তর দেবার আগে। সে জানে বাসুর মাথাটা খুব পরিষ্কার কথাবার্তায় সামান্য বেচাল দেখলেই ধরে ফেলবে মিথ্যা বলছি। দরকার নেই, সত্যি বলাই ভালো। গুণোকে আনা যাবে কিন্তু মলির অংশটা একদম নয়।
‘গুণোকে তো তুমি দেখেছ?’
‘দেখব না আবার, অতি বদ, কিছুদিন আমার পেছনে লেগেছিল।’
ব্রতীন সাবধান হয়ে গেল। গুণোর গুণকীর্তন এখন একদমই চলবে না। ওকে বরং ভিলেন করে রাখাই ভালো। ব্রতীন বলল, ‘তুমি আগে বোসো। তুমি সন্দেহ করছ কোনো খারাপ মতলব নিয়ে তোমাকে এখানে এনেছি। এই ফ্ল্যাটটা গুণোর বন্ধুর, আমার নয়। চাবি ওর কাছ থেকেই চেয়ে এনেছি তোমার সঙ্গে দুটো কথা বলব বলে।’
বাসন্তী সোফায় বসল ঠিক যেখানে নিমি বসেছিল। একটু দূরত্ব রেখে ব্রতীনও বসল।
‘কলকাতায় নিরিবিলিতে বসে কথা বলার জায়গা নেই তাই তোমাকে এখানে এনেছি তবে এটা একটু বেশি নিরিবিলি। এমন জায়গায় অনাত্মীয় পুরুষের বিশেষ করে যে পুরুষ সম্পর্কে একসময় দুর্বল ছিলে, অন্তত তেমন কথাই সেদিন বললে। এই বলা থেকেই মনে হল এখনও তুমি মনে মনে দুর্বল রয়েছ।’
ব্রতীন চোখ সরায়নি বাসন্তীর চোখ থেকে। সে দেখল বাসুর চোখ স্তিমিত হয়ে এল, মুছে গেছে সন্দেহের কুটিলতা। তার কথার সমর্থন এবং অনুমোদন ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। সে হাত রাখল বাসন্তীর হাতের উপর যেভাবে নিমি হাত রেখেছিল তার আঙুলে।
‘বাসু আমি তিরিশ বছর আগে ফিরে গিয়ে জীবন শুরু করতে চাই তুমিও কি চাওনা?’ ব্রতীন উদগ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুঠোয় আঁকড়ে ধরল বাসন্তীর আঙুল।
‘আমিও চাই বতু। তোমাকে লেকচার দিয়ে আমাকে কিছু বোঝাতে হবে না। তোমার থেকে আমার মাথা কোনো অংশে ইনফিরিয়ার ছিল না, উমাপদবাবু সেটা রোজ তোমাকে বুঝিয়ে দিতেন। তুমি প্রচণ্ড খাটতে, তোমার আদ্ধেক খাটুনি খাটলে আমি পি আর এস, পি এইচ ডি পেতে পারতুম। একটা মালটি ন্যাশনাল কোম্পানিতে তুমি বিশাল টাকার, গরিব এই দেশের তুলনায় বিশাল টাকা মাইনের চাকরি করো, বয়স পঞ্চাশও হয়নি, দেখতে শুনতে ভালো এবং আইবুড়ো। আমি এখন স্রেফ বেকার, হার্টের রুগি, একটা জঘন্য স্বামী আছে যাকে আমি ভালোবাসি না। ব্রতীন রায়চৌধুরি এবার বলো আমার কাছ থেকে তুমি কী আশা করো?’
ব্রতীন আশা করেনি বাসন্তী নিরাসক্ত স্বরে ঠান্ডা মাথায় তাকে জমিতে নামিয়ে আনবে। তবু মরিয়া হয়ে সে চেষ্টা করল আর একবার আকাশে ওড়বার। ‘বাসু আমার কাছে গিয়ে তুমি থাকবে?’
বাসন্তীর ভ্রূ কুঁচকে উঠল। ক্ষীণ একটা হাসিতে মুচড়ে গেল ঠোঁট দুটি। ‘কীভাবে? আমি তো একজনের বৈধ পত্নী, তোমার বন্ধু বলার বউয়ের মতো একদিন চুপিসাড়ে পালিয়ে গিয়ে?’ বলতে বলতে বাসন্তী হেসে উঠল, হাতের উপর রাখা হাতটা ব্রতীন তুলে নিল। ‘তারপর একদিন বোম্বাইয়ের পুলিশ গিয়ে হাজির হবে কোর্টের পরোয়ানা নিয়ে, ভাঙা দাম্পত্য সম্পর্ক জোড়া লাগাবার জন্য সরকারহাটে ফিরে চলো। না বতু, হুট করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।’
বাসন্তী হাত রাখল ব্রতীনের হাঁটুর উপর। ওর মুখে শান্ত মৃদু হাসি। সে হাসিতে প্রশ্রয় না বিষাদ ব্রতীন বুঝে উঠতে পারল না।
‘বাসু তুমি তো ডিভোর্স করতে পার।’
‘তা পারি।’
‘তা হলে করো। মানসিক অত্যাচারের গ্রাউন্ডে তুমি মামলা করো, খরচ আমি দেব।’ বাসন্তী মুখ নামিয়ে রেখেছে, চোখে আনমনা চাহনি। ব্রতীন দু-হাতে ওর কাঁধ ধরে নাড়া দিল।
‘ভাবছ কী? জীবনের অর্ধেকেরও বেশি আমরা পার করে এসেছি বাসু, নিষ্ফলা অসুখী অর্ধেক। যে ক-টা বছর হাতে রয়েছে সেগুলো অন্তত ভরে উঠুক।’
‘আমাকে মুশকিলে ফেললে বতু। তোমার সঙ্গে এত বছর পর দেখা না হলেই ভালো হত। আসলে এমন একটা মানসিক বিপর্যয়ে এলোমেলো ছিলুম আর ঠিক সেই সময়েই তোমাকে সামনে পেয়ে গেলুম, মনের পুরনো আবেগ সেদিন তোমার ঘরে ভেসে উঠেছিল। পরে ভাবতে গিয়ে দেখলুম পুরনো হলেও কিন্তু মনের মধ্যে তুমি তাজা হয়েই রয়েছ।’
বাসন্তী মুখ তুলে তাকাল। তার দু-চোখে ব্রতীন কী যেন দেখতে পেল। হঠাৎ সে বাসন্তীকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নিয়ে ঠোঁটের উপর ঠোঁট চেপে ধরল। বাসন্তী বাধা দিল না। ব্রতীন অনুভব করল বাসুর শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে, ঠোঁট দুটি সাড়া দিচ্ছে, শরীর শিথিল হয়ে পড়ছে। তার মনে পড়ে গেল নিমির ফিসফিস করে বলা ‘ঘরে আসবেন?’
