‘কাল তোমার সময় হবে, দুপুরে? তা হলে কোথাও বসে কথা বলতুম।’
এবার ব্রতীন স্বস্তি পেল বাসন্তীর কথায়। ‘বতু লোকটা ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে যা বলার তাড়াতাড়ি বলো।’
‘তোমাকে ট্যাক্সি থেকে যেখানে নামিয়ে দিয়েছিলুম পনেরো বছর আগে মনে আছে?’
‘আছে।’
‘কাল ঠিক বারোটায় সেখানে দাঁড়িয়ে থেকো। আমি তোমায় তুলে নেব।’
‘নিয়ে কোথায় যাবে?’
‘জাহান্নামে।’
দেবী ঘরে ফিরে এসেছে, রিসিভার রেখে দিল ব্রতীন।
‘কাল কখন বেরোবি তোরা?’
‘আমি ন-টার মধ্যে রেডি হয়ে যাব, দেখি উনি কখন আসেন। বউদি পাতুরিটা দারুণ করেছিল তাই না বড়দা! ভাবছি শিখে নেব, বউদিরা আর তিন-চার দিন মাত্র তো থাকবে।’
‘তার মধ্যেই যদি শিখে নিতে চাস তো কাল চিড়িয়াখানা দেখার পর বাবাইকে পৌঁছে দিতে ওকে সঙ্গে নিয়ে তুই যাবি তো। রাতে তাহলে শিবুদের কাছেই থেকে যাবি, সকালে রান্নাটা প্রমিতার কাছে শিখে নিবি। দুপুরে নেমতন্ন করে আমাকে আর সলিলকে খাওয়াবি, সন্ধেবেলায় সলিল আজকের মতো গাড়ি করে পৌঁছে দিয়ে যাবে সঙ্গে অবশ্যই বাবাই থাকবে। রাতটা বাবাই মাসিমণির কাছে থাকার জন্য বায়না করবে, থাকবে। পরদিন ওকে নিতে সলিল-।’
‘বড়দা!’ চাপা গলায় দেবী ধমকে উঠল। ক্ষীরোদপ্রসাদ মুখ ঘুরিয়ে একবার তাকিয়ে নিয়ে টিভিতে চোখ রাখলেন। ব্রতীন দু-হাত তুলল আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে।
‘আমার বয়স কমে গেছে দেবী, ফাজিল হওয়ার জন্য মাপ চাইছি।’
পরদিন সকাল দশটায় সলিল হাজির হয়ে আধঘণ্টার মধ্যেই বাবাই আর দেবীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। কিছু রসিকতা ব্রতীনের মাথায় জমা হয়েছিল কিন্তু তার মনে হয় দেবী আর সলিলের ঘনিষ্ঠতা স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠাটাই ভালো, তাকে রসিকতার কিল মেরে দ্রুত পাকিয়ে দিলে ফলটা সুস্বাদু হবে না। সে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে বয়স্ক দুই নরনারী এই মুহূর্তে এখন কৈশোরে, যেখানে সে নিজে পৌঁছোতে চেয়েছিল। চব্বিশ ঘণ্টাটাও হয়নি ওদের দুজনের প্রথম সাক্ষাতের, প্রেমে যারা পড়ে তারা এইভাবেই পড়ে, অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে হুড়মুড় করে। এইভাবে সেও তো পড়তে পারত, বাসুও পড়তে পারত কিন্তু দুজনের কেউই পারল না! নিউটনের থার্ড ল, বাসু আর সে অপোজিট পোল হলে পরস্পরের দিকে আকর্ষিত হত।
ওরা মোটরে ওঠার সময় বারান্দায় এসে দাঁড়ায় ব্রতীন আর ক্ষীরোদপ্রসাদ, সলিল ড্রাইভারের আসনে বসার আগে মুখ তুলে ওদের দিকে তাকিয়ে হাসল। দেবী পিছনে দরজা খুলে বাবাইকে নিয়ে উঠে বসল। ব্রতীন নিশ্চিত পাড়া থেকে বেরিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে পড়ামাত্র সলিল গাড়ি থামিয়ে বলবে ‘বাবাই সামনে বসবি?’ বাবাই বলবে ‘হ্যাঁ অ্যা অ্যা। মাসিমণির কোলে বসে যাব।’ সলিল বলবে ‘তা হলে মাসিমণি সামনে আসুন।’ গাড়ি থেকে নামতে নামতে দেবী বলবে, ‘বাবারে বাবা, কী যে জেদি ছেলে।’
ব্রতীনের কল্পনার ঘোড়া এতক্ষণ চমৎকার ছুটছিল খোশমেজাজে, ট্যাক্সি ধর্মতলার মোড় পেরোতেই সে রাশ টানল। সামনেই সুরেন ব্যানার্জি রোড, বাসু দাঁড়িয়ে থাকবে মোড়টা পেরিয়ে একটা মিষ্টির দোকানের সামনে। সে জানলা দিয়ে মুখটা বার করল নিজেকে দেখাবার জন্য।
ওই তো বাসু! ব্রতীন হাত নেড়ে ডাকল। এখানে গাড়ি দাঁড় করানো বারণ, কাছাকাছি সার্জেন্ট রয়েছে। ট্যাক্সিওয়ালা বলল, ‘ওনাকে এগিয়ে আসতে বলুন।’ ব্রতীন হাত নেড়ে বাসুকে এগিয়ে যেতে ইশারা করে বলল, ‘সামনে এসো এখানে থামা বারণ।’ প্রায় পঞ্চাশ মিটার এগিয়ে ট্যাক্সি থামতে সে দরজা খুলে অপেক্ষায় রইল।
বাসু উঠে বসতেই ব্রতীন বলল, ‘কতক্ষণ অপেক্ষা করেছ?’
হাতের ঘড়ি দেখে বাসন্তী বলল, ‘মিনিট কুড়ি।’
‘এত আগে!’
‘বাসস্টপে দাঁড়িয়েছিলুম, চেনা এক ভদ্রলোক গাড়ি নিয়ে সামনে থামলেন যাচ্ছেন শ্যামবাজার, উঠে পড়লুম। এই কাছেই নামিয়ে দিলেন তাইতেই সময়টা বেঁচে গেল। তবে বেঁচে আর গেল কই সেই তো দাঁড়িয়ে থাকতেই হল। আমরা যাচ্ছি কোথায়?’
ট্যাক্সিওয়ালাকে বলে রেখেছিল ব্রতীন কোথায় যেতে হবে। সেইমতোই ট্যাক্সি দক্ষিণ দিকে চলছে। ব্রতীন জবাব না দিয়ে বাসন্তীর দিকে তাকিয়ে রইল। চুল পিছন দিকে টান করে ঘাড়ের কাছে ক্লিপ দিয়ে গোছা করা। হাত ব্যাগটা কোল দু-হাতে আঁকড়ে ধরা, চিবুকের নীচে নরম ভাঁজ, বগলের নীচে ব্রেসিয়ারের চাপে ফুলে রয়েছে চর্বি। মুখের তামাটে চামড়া তেলতেলা, কিছু একটা মেখেছে। খাটো হাতা ব্লাউজ থেকে নেমে যাওয়া বাহু দুটির ডৌলে চোখ বুলিয়ে সে প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘কাল তো বলেছি, জাহান্নামে।’
বাসন্তী চোখ সরু করে ত্যারছা তাকিয়ে বলল, ‘ওখানে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই।’ কথাটা বলে সে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। ওদের মধ্যে আর কথা হল না।
ট্যাক্সি বাঁদিকে ঘুরল। জগদীশ চন্দ্র বোস রোড ধরে কয়েক মিনিট যাওয়ার পরেই বেগবাগান। আটতলা বাড়িটার ফটকের সামনে ব্রতীন ট্যাক্সি দাঁড় করাল। বাসন্তী বিস্মিত হয়ে বলল, ‘এখানে!’
‘এখানেই জাহান্নাম, নামো।’
সেদিনের মতোই বাড়ির গেটে টুলে বসে দুটি লোক। উঠোনটা অবশ্য খুব অপরিচ্ছন্ন নয়। মোটর রয়েছে তিনটি আর একটি মোটরবাইক। ব্রতীন লিফটের জন্য বোতাম টিপে অবাক বাসন্তীকে বলল, ‘ছ-তলায় আমার বন্ধুর ফ্ল্যাট, ইনকাম ট্যাক্সের অফিসার কানপুরে বদলি হয়ে সপরিবারে গেছে। ফ্ল্যাটটা খালি, চাবি আমার কাছে।’
