দেবী বলল, ‘বাড়িতে বাবার ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে এখানে কত স্বচ্ছন্দ!’
‘এখানে ওর কয়েকঘণ্টার স্বাচ্ছন্দ্য ভোগের থেকে বরং তুই যদি ওখানে গিয়ে থাকিস তা হলে ও অনেক বেশি-।’
দেবী ঘুরে দাঁড়িয়ে কথার মানেটা বোঝার জন্য ভ্রু কুঁচকে রইল তিন-চার সেকেন্ড। ব্রতীনের ঠোঁট টিপে চোখ দিয়ে হাসা দেখে সে চোখ পাকিয়ে বলল, ‘বড়দা তুমি কিন্তু ভীষণ ফাজিল হয়ে গেছ।’
‘গেছি নাকি! তা হলে বয়সটা কমছে বল।’
‘হাঁ কমছে, প্রায় বিয়ের বয়সে পৌঁছে গেছ।’
তিনতলায় পৌঁছে ব্রতীনের নিজেকে হালকা ফুরফুরে মনে হল। গোলাপবাগান আর নিমির কথা মুছে গেছে মন থেকে এর মধ্যেই। এটাই সে চেয়েছে। অযথা মাথাটায় গিঁট দিয়ে দিয়ে জীবনটাকে জটিল করে ফেলার মানে হয় না। জট ছাড়িয়ে যতটা সম্ভব হাত-পা ছড়িয়ে না বাঁচতে পারলে তো বাঁচা যায় না! তিরিশ বছরের স্মৃতি একটা বোঝা এটাকে মাথা থেকে খানিকটা নামাতে পেরে তার ভালো লাগছে। দেবী বলল, ‘হ্যাঁ কমছে,’ বয়স কমছে! আশ্চর্য, কী করে ও জানল?
ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে ক্ষীরোদপ্রসাদ, চেয়ারের হাতলে বসে বাবাই টিভি-তে দেখছে তিনটে সিংহের বাচ্চচার শুয়ে থাকা মায়ের পিঠের উপর লাফালাফি করে নিজেদের মধ্যে হুটোপাটি। ব্রতীন ওদের পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। বাবাইয়ের পরের পর প্রশ্ন বাচ্চচাগুলোর মতো লাফালাফি করে মুখ থেকে বেরোচ্ছে।
‘দাদু সিংহের বাচ্চচারা কোথায় খেলা করছে?’
‘আফ্রিকায় সেরেঙ্গেটি নামে একটা জায়গা আছে সেখানে।’
‘চিড়িয়াখানায় সিংহ আছে?’
‘আছে, কাল তুমি দেখবে।’
‘বাচ্চচাদের দেখব?’
‘দেখবে।’
‘ওদের বাবা কোথায়?’
‘খাবার আনতে গেছে?’
‘কী খাবার খাবে?’
‘হরিণ খাবে।’
‘ওদের মা রেঁধে দিল তারপর খাবে, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’
দেবী ঘরে এসে বলল, ‘বাবাই আর পাঁচ মিনিট, তারপর খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়বে।’
‘না এখন খাব না। সিংহ খাবার আনুক, বাচ্চচারা খাক তারপর।’
দেবী বলল, ‘সিংহের অনেক দেরি হবে খাবার আনতে ততক্ষণ তোমাকে বসে থাকতে হবে না।’
জেদি গলায় বাবাই বলল, ‘হবে। আমি এখন খাব না। সিংহের বাচ্চচারা আগে খাবে তারপর আমি খাব।’
দেবী হতাশ চোখে ব্রতীনের দিকে তাকাল। ব্রতীন বলল, ‘দেখছে, দেখুক না।’
‘তুমি জানো না বড়দা, টিভি বাচ্চচাদের কাছে প্রচণ্ড একটা নেশার জিনিস।’
টেলিফোন বেজে উঠল। রিসিভার তুলল দেবী। ‘হ্যাঁ আমি, দেবী। বলো বাসুদি।’
ব্রতীন মুখ ফিরিয়ে দেবীর দিকে একবার তাকাল। সে ধরে নিল সকালে সরকারহাটে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে বাসু কিছু বলার জন্য ফোন করেছে।
‘কমলের মা যেই বলল তোমাকে নিয়ে যেতে সোয়ামি এসেছে তখনই বুঝলুম চিত্তির হয়ে গেছে। বড়দা শুনেই বলল বাসুর কপালে দুখ্যু আছে। যাই হোক তোমার জন্য রান্নাটা ফেলা যায়নি কাজে লেগে গেছে, ওখানেই একজন খাবার লোক আমরা পেয়ে গেছি।… কে বড়দা? এই তো সামনেই দাঁড়িয়ে, কথা বলবে?’
দেবী রিসিভারটা বাড়িয়ে দিল ব্রতীনের দিকে। বাইরে থেকে কমলের মা-র গলা শোনা গেল, ‘দিদিমণি একবার এদিকে এসো তো, বেতের ঝুড়ির ডালাটা বন্ধ হচ্ছে না।’
দেবী ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই ব্রতীন ফোন কানে লাগিয়ে বলল,’তোমার কাছে কেউ রয়েছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘তোমার স্বামী?’
‘হ্যাঁ।’
‘তা হলে তো আমাকেই কথা বলে যেতে হবে। একটু আগে দেবী বলল, আমার বয়স কমে গিয়ে বিয়ের বয়সে পৌঁছে গেছে। তোমার কী মনে হয়?’
‘দেবী তুই এবার বিয়ে কর।’
‘তোমার হাতে মেয়ে আছে?’
‘আমি কোথায় ছেলে পাব? বাবা কি বড়দাকে বল ওরা পাত্তর খুঁজে দেবে তবে আগেরবারের মতো ভুল যেন না করে।’
‘আমিও তো তাই চাই। সম্বন্ধ করে বিয়ে করার ফল তো হাতে হাতেই তুমি পেয়েছ, এখনও কিন্তু ভুল সংশোধনের সুযোগ আছে। চুল একটু-আধটু পেকেছে তো কী হয়েছে শরীরটাকে তো মনে হল তিরিশ বছরে ধরা রয়েছে। বাসু তোমার কাছ থেকে যতটুকু শুনেছি তাতে মনে হয়েছে স্বামী সম্পর্কে তুমি বীতশ্রদ্ধ, বলেছিলে একসময় আত্মহত্যা করার ইচ্ছে হয়েছিল। আমার ধারণা স্বামীও আর তোমায় ভালোবাসে না। এই প্রেমহীন সম্পর্কটাকে একটা খাটিয়ায় শুইয়ে সাদা চাদরে ঢেকে তোমরা দুজনে এখন কাঁধে বয়ে নিয়ে চলেছ লোক দেখিয়ে, কী দরকার এই ভণিতায়। এই নকল দাম্পত্য প্রেমের খোলস ভেঙে তুমি তো বেরিয়ে আসতে পার। শিক্ষিত তুমি, একটু চেষ্টা করলেই চাকরি জোগাড় করে নিতে পারবে। বেরিয়ে এসো অন্ধকূপ থেকে, ছেলে তো যথেষ্ট বড়ো হয়ে গেছে, সে তোমার অপমান দেখেছে, তোমার পক্ষেই সে থাকবে, সমর্থনও করবে। লোকে কী বলবে, লোকে ভাববে এইসব চিন্তায় কুঁকড়ে থেকো না-।’
‘কীসব আজেবাজে কথা বলছিস দেবী? তোকে কেউ বিয়ে করবে না এমন ধারণা হল কী করে? আমি যদি ছেলে হতুম এখুনি তোকে বিয়ে করতুম।’
‘সত্যি বলছ বাসু?’ ব্রতীন ঠাট্টার স্বর বদল করে গাঢ় করল। একটা পুরুষ গলা সে শুনতে পেল বোধহয় বাসুর স্বামীর। বাসু খুক খুক কেশে গলা পরিষ্কার করল।
‘এই শোন তোর জামাইবাবু আমাকে বলল বিয়ে যদি করে তা হলে টাক পড়ে গেছে এমন লোককে যেন করে। আসলে নিজের মাথায় টাক তো। আমার মতো চুল পাকার কোনো চান্স নেই।’
‘বাসু তোমার বোধহয় কথা বলতে অসুবিধে হচ্ছে।’
‘তা তো হচ্ছেই, চুল পাকলে মন খারাপ সবার হয়।’
