‘আরে বতুদা এতক্ষণ তোমার জন্য অপেক্ষা করে করে ফিশ ফ্রাইটা শেষকালে খেয়ে ফেললুম, অনবদ্য! নর্থ ক্যালকাটায় এমন যে দেবভোগ্য বস্তু মেলে আগে জানতুম না।’ সলিল দরজা বন্ধ করে একগাল হেসে দেবীর দিকে তাকাল।
‘এখন জানলি তো মাঝে মাঝে এসে খেয়ে যাস। দেবভোগ্য নয় ওটা দেবীভোগ্য। মলয় কেবিনের বড়ো পেট্রন হল দেবী আর আমার কাকা, তোর আলাপ হল কাকার সঙ্গে?’
‘হয়েছে, তবে আমার থেকে বাবাইয়ের সঙ্গেই ওনার বেশি আলাপ হল।’
‘তাহলে এতক্ষণ বসে বসে করলি কী। শুধু ফ্রাইই সাঁটিয়ে গেলি?’ ব্রতীনের গলায় ফুরফুরে মেজাজের ছাপ ফুটে উঠল। এটাই সে চেয়েছে নতুন করে।
বাবাইয়ের কাঁধে হাত রেখে দেবী দাঁড়িয়ে শুনছিল দুজনের কথা। এবার বলল, ‘ডাক্তারবাবুকে বলছিলাম আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতার কথা। একা অদ্দূর ভেতো বাঙালি মেয়ে প্লেনে যাচ্ছে, ইংরিজি বলতে গেলে আগে মনে মনে বাংলা থেকে ট্র্যানস্লেট করে নিয়ে বলি,কাঁটা হয়ে থাকি এই বুঝি গ্রামার ভুল করলুম, সে যে কী আতঙ্ক! তবে পবিত্র নিউ ইয়র্কে আমার দায়িত্ব নেবার পর ইংরিজি বলা থেকে আমায় আড়াল করে রাখে। আমেরিকান উচ্চচারণে খুব সুন্দর ইংরিজি বলে পবিত্র।’
‘আমারও ঠিক একই ব্যাপার। বিলেতে প্রথম প্রথম ওদের ইংরিজি বুঝতে অসুবিধে হত, চারু ওদেশে বাচ্চচা বয়স থেকে রয়েছে ওর সঙ্গে ইংরিজিতে কথা বলে বলে সড়গড় হই।’
ব্রতীন একটু অবাক হল, একজন প্রাক্তন স্বামীর আর একজন মৃতা স্ত্রীর প্রশংসা পরস্পরকে শোনাতে যেন একটু ব্যস্তই। তার মনে হল, সম্ভব হলে সলিল এই রাস্তায় দাঁড়িয়েই আড্ডা দিয়ে রাতকাবার করে দেবে।
‘বড়দা কাল আমরা চিড়িয়াখানা যাচ্ছি। তুমি যাবে?’ দেবী বলল।
‘আমরা মানে কারা?’
উত্তর দিল সলিল, ‘দেবী আমি আর বাবাই, আপনিও চলুন না।’
‘চিড়িয়াখানায় বার চারেক গেছি স্কুলে পড়ার সময়। আমাদের দেশে পশুপাখিদের যেভাবে রাখা হয় দেখলে কষ্ট হয়, তোরা বরং দেখে আয়। সেই একই বাঘ একই ভাল্লুক একই বাঁদর। খাবার-দাবার নিয়ে যাস কিন্তু।’
‘অবশ্যই।’ সলিল একটা অবলম্বন যেন পেল আর কিছুক্ষণ কথা চালিয়ে যাওয়ার। ‘আমি বললুম যাওয়ার সময় স্যান্ডউইচ, পেস্ট্রি ফ্লুরিজ থেকে আর আপেল কলা নিউ মার্কেট থেকে কিনে নেব। কিন্তু উনি তো।’ দেবীর দিকে হাত নেড়ে সলিল বলে চলল, ‘এক কথায় নাকচ করে বললেন ওসব শুকনো অখাদ্য জিনিস গিলতে পারব না’
‘ঠিকই তো,’ দেবীর গলায় প্রায় গাছকোমর করার সুর, ‘আচ্ছা তুমিই বলো বড়দা, দুপুরবেলায় স্যান্ডউইচ খাব? আমাদের কি সাহেবদের পেট? লুচি-বেগুনভাজা কি ওর থেকে খারাপ লাগবে? পেস্ট্রির বদলে হরিমোদকের কাঁচাগোল্লা?’
বাবলু বায়নার সুরে বলে উঠল, ‘মাসিমণি আমি কাঁচাগোল্লা খাব।’
‘ওই শুনুন ছেলে কী বলছে।’
সলিল স্বরে নকল গাম্ভীর্য মাখিয়ে বলল, ‘উসকে দিলে তো বলবেই।’
ব্রতীনের মজাই লাগল দুজনের খুনসুটিতে। কে বলবে মাত্র আজ সকালেই ওদের মধ্যে প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেছে অথচ দশঘণ্টার মধ্যেই বাবাইকে কেন্দ্র করে ওরা কাছে চলে এসেছে। দুজনের মনের গড়ন একই ধরনের বলে বোধহয় এটা হয়েছে। চার বছরে চব্বিশশো ঘণ্টা বাসুর সঙ্গে এক টেবলে বসেও তারা কাছাকাছি আসতে পারেনি, মনের গড়নে অনেক তফাত ছিল। সেই গড়নটা কি বদলানো যায় না?’
‘শুনুন মশাই যা কেনার তা আজ রাতেই সেরে ফেলুন। বাড়ি ফেরার পথে হাতিবাগান বাজার পড়বে, গোটা ছয়েক ডিম, ফুটপাথেই কলা আর আপেল পাবেন, আর মিনারেল ওয়াটারের তিনটে বোতল, এগুলো নিয়ে কাল সকালেই হাজির হবেন। আর যা কিছু তৈরি করার কমলের মা সকালেই করে ফেলবে। এগারোটার মধ্যে বেরোব। এবার কেটে পড়ুন, বাবাইয়ের খাওয়ার সময় হয়েছে, তাড়াতাড়ি ঘুমোতে হবে।’
দেবী টানা কথাগুলো বলে গেল হালকা দাপুটে গলায়। সলিল বোকার মতো হেসে আড়চোখে ব্রতীনের দিকে একবার তাকাল। ব্রতীনের মনে হল সলিল উপভোগ করছে দেবীর এই কর্ত্রীত্বপনা। ও যেন বুঝে নিয়েছে সলিলের মধ্যে সহজ নরম জীবনযাপনের জন্য একটা ইচ্ছা আশ্রয় খুঁজছে।
ব্যস্ত হয়ে সলিল বলে উঠল, ‘নাহ এবার কেটে পড়াই ভালো।’
গাড়ির দরজা খুলে সলিল স্টিয়ারিংয়ে বসল। ব্রতীন আশ্চর্য হল বাবাইকে দেবীর হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।
‘চললাম বতুদা, কাল দেখা হবে।’ স্টার্ট দিয়ে সলিল রাস্তার দিকে সোজা তাকাল। দেবী মুখ নামিয়ে বাবাইয়ের মাথায় হাত বুলোচ্ছে। কেউ কাউকে যেন চেনে না এমন একটা ভাব দুজনের মধ্যে দেখে ব্রতীনের মজা লাগল। সলিল গাড়ি ছেড়ে দেবার পর ব্রতীন বলল, ‘হ্যাঁ রে দেবী, বাবাই গেল না যে?’
‘আমার কাছে আজ রাতে থাকবে বলে কান্না শুরু করল। থাকুক। কাল চিড়িয়াখানা দেখে একেবারে বাড়ি ফিরবে। মা-মরা ছেলেটা কী অযত্নে মানুষ হচ্ছে!’
‘সত্যিই ছেলেটা স্নেহ ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে আগাছার মতো বাড়ছে।’ ব্রতীন বলল সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়।
‘মাসিমণি তুমি হাঙরের দাঁত দেখেছ?’
‘না দেখিনি।’
‘আমি দেখেছি টিভি-তে। দাদু বলল ওরা নাকি লোহা চিবিয়ে গুঁড়ো করে দেয়! বাঘ কী করে হরিণ ধরে টিভিতে দেখায়, দেখবে তো তাড়াতাড়ি চলো।’
বাবাই ওদের ফেলে দুড়দুড় করে তিনতলায় উঠে গেল তার নতুন পাওয়া দাদুর সঙ্গে টিভি দেখার জন্য।
