ব্রতীন গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, ‘একটা ব্যাপার জানার ছিল। সত্যি কথা বলবেন, লজ্জা করবেন না। আচ্ছা আমি একদিন স্কুল যাচ্ছি তখন আপনি একটা চিঠি ছুড়ে দিয়েছিলেন বারান্দা থেকে। মনে পড়ে?’
‘চিঠি? আমি!’ অন্ধকারে হঠাৎ মুখে জোরালো টর্চের আলো পড়লে খরগোশের যে অবস্থা হয় বুড়ির মুখ সেইরকম দেখাল।
‘কই আমার তো মনে পড়ছে না কখনো চিঠি ছুড়েছি।’
‘ঠিক আমার সামনে ফেললেন, দলা পাকিয়ে।’ ব্রতীন সামনে ঝুঁকে তীক্ষ্ন নজরে তাকাল।
বুড়ি চোখ বুজে রইল কয়েক সেকেন্ড। টাইমবোমার ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে চলার মতো শব্দ ব্রতীনের বুকের মধ্যে। বুড়ি চোখ খুলল, চোখে হাসি। মনে পড়েছে। ‘নটবর মানে চন্দনাটাকে ছোলা দিয়ে খালি ঠোঙাটা পাকিয়ে রাস্তায় ছুড়ে দিয়েছিলুম আর ঠিক সেই সময়ই আপনি আসছিলেন। আমি তো লজ্জায় জিভ কেটে ফেলেছিলুম, ভাগ্যিস গায়ে পড়েনি। মনে হল আপনি একটু ঝুঁকলেন তারপর হেঁটে চলে গেলেন। শম্ভু জ্যাঠা রক থেকে উঠে এসে ঠোঙাটা কুড়িয়ে নিয়ে খুলে দেখে ফেলে দিল। আপনি ওটাকে চিঠি ভেবেছেন! হায় পোড়া কপাল।’ বুড়ি শব্দ না করে হেসে উঠল।
ব্রতীনের প্রথমেই মনে হল, কেন বোকার মতো জিজ্ঞাসা করতে গেলুম। তা হলে বুড়ির এই হাসিটা দেখতে হত না। এবার তার মনে পড়ল ‘বাগদি ডাকাতে’র লাইনগুলো, ‘রাত্রির সেই পাথরের মতো জমাট অন্ধকার ও নিস্তব্ধতাকে কে যেন খুব মোটা দাঁতওয়ালা ভীষণ ভারী করাত দিয়ে চিরছে।’
সে টের পেতে লাগল তার মাথার মধ্যে একটা অন্ধকার পাথরের মতো জমাট বাঁধছে আর বুড়ির নিঃশব্দ হাসিটা ভারী দাঁতওয়ালা করাতের মতো সেটা চিরছে কিন্তু ‘সেই অন্ধকারের একটা কণাও খসে পড়ছে না।’ ব্রতীন নিজের মনে বলার মতো করে বলল, ‘আপনি ঠিক বলছেন চিঠি নয় ঠোঙা, ভুল করছেন না তো?’
‘ওরে বাবা চিঠি ফেলব শম্ভু জ্যাঠার সামনে! সারা পাড়ায় ঢি ঢি পড়ে যাবে না। বাবার কানে গেলে পিঠের চামড়া তুলে দেবে!’
ঠিক এই সময় ঘরের ইলেকট্রিক বালবটা জ্বলে উঠল। গোলাপবাগান জুড়ে স্বস্তির চাপা একটা ধ্বনি উঠল, ‘হা আ আ।’
‘আপনি চললেন?’
উঠে দাঁড়িয়েছে ব্রতীন। জমাট অন্ধকারের জায়গায় একটা অন্ধ ক্রোধ এখন তার মাথার মধ্যে দখল নিয়েছে। মূর্খ, মূর্খ, এভাবে বোকা বনে গেলুম! কী দরকার ছিল কৌতূহল মেটাতে এখানে আসার। দরজা দিয়ে গলিতে বেরিয়ে কয়েক পা এগিয়ে এসেই থমকে দাঁড়াল সে। নিমি আসছে দেয়ালে হাত রেখে অল্প খুঁড়িয়ে।
‘এই যে মলি।’ কঠিন গলায় ব্রতীন বলল। ‘বেড়াতে গেছলে? পা তা হলে ঠিক হয়ে গেছে?’
‘এই পাশের এক বউদির বাড়িতে গেছলুম। পায়ে বেশ ব্যথা রয়েছে।’
জায়গাটা অন্ধকার, নিমির মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছ না। তবে ওর গলার স্বরে ব্রতীন বুঝল অপ্রতিভ হয়ে পড়েছে কারণটা বোধহয় নিমির বদলে মলি সম্বোধন শুনে।
‘ব্যথা? দিব্বি তো হেঁটে বেড়াচ্ছ। ফ্ল্যাটের চাবিটা আমার কাছেই রয়েছে, কাল যাবে? ট্যাক্সি করে নিয়ে যাব ফিরিয়ে আনব।’
কর্কশ স্বরে ব্রতীন বলল। মাথার মধ্যে রাগটা দপদপ করছে। নিজেকে ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে ফেলা একটা ইচ্ছে তাকে ঠেলতে ঠেলতে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সে জানে না। শুধু জানে শোধ নিতে হবে, নিজের উপর রাগটা সে নিমির দিকে ঘুরিয়ে নিজেকে ফেলে দিয়েছে গভীর গর্তে।
‘কী বলছেন আপনি?’ নিমি বিস্ময়ের ধাক্কা সামনে বলল, ‘আপনাকে তো আমি ভালো লোক বলে জানতুম, আর পাঁচটা লোকের মতো নন।’
‘আমি কেমন লোক তা দিয়ে তোমার দরকার কী? দরকার তো টাকার, আমি দেব। কত নেবে?’
‘পথ ছাড়ুন, লোক এসে পড়বে। যদি চেঁচাই তা হলে আপনার ইজ্জত থাকবে না।’
নিমি পাশ কাটিয়ে যেতে গেল। ব্রতীন খপ করে ওর বাঁ হাতের কবজিটা মুঠোয় ধরে নিয়ে বলল, ‘এখানকার লোকেরা জানে কি তুমি কী কাজ করো পার্লারে?’
‘জানলে তো ভারি বয়েই যাবে।’ নিমির স্বর রুক্ষ হয়ে একটু উচ্চচগ্রামে উঠল। ‘সেদিন তো বেশ ভদ্দর ছিলেন হঠাৎ আজ ছোটোলোক হলেন যে?’
ব্রতীন ছেড়ে দিল নিমির হাত। এগিয়ে গেল সে বাড়ির দিকে। ব্রতীন দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এল গোলাপবাগান বস্তি থেকে। তার মাথার মধ্যে রাগটা কুণ্ডলি পাকিয়ে চলেছে, গর্তের মধ্য থেকে উঠে আসার জন্য তার দরকার একটা শক্ত রশি। হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছোল চিলড্রেনস পার্কে। চল্লিশ বছর আগে এই পার্কে সে দোলনায় দুলেছে, চারকোণে ছোটো ছোটো বাঁশের বেড়া ঘেরা বাগান ছিল পাতাবাহার আর ফুলগাছের। এখন আর গাছ নেই দোলনাও নেই। পার্কের মধ্যে ঢুকে দেখল দু-তিনটি মাত্র বেঞ্চ এবং তাতে লোক বসে রয়েছে। জমিতে ঘাস নেইই প্রায়। মেট্রোরেল তৈরির জন্য পার্কে গুদাম করা হয়েছিল। পার্কটা বিধ্বস্ত হয়ে যায়। এখনও আগের সবুজ ফিরে পায়নি। খুঁজে খুঁজে কোনোক্রমে বসার মতো ঘাস পেয়ে সে বসল।
মিনিট পাঁচেক পর ব্রতীন উঠে পড়ল। এভাবে একা বসে থাকলে তার মাথার আগুন নিভবে না। এখন তার কথা বলার জন্য লোক চাই নয়তো পড়ায় ডুবে যাবার মতো কোনো বই কিংবা টিভি-তে মিষ্টি প্রেমের সিনেমা। গোলাপবাগানকে স্মৃতি থেকে উপড়ে ফেলার জন্য চাই কোদাল বা শাবলের মতো একটা কিছু, নয়তো একটা নতুন গোলাপবাগান।
বাড়ির কাছাকাছি এসে দূর থেকে সে দেখতে পেল সলিল, দেবী আর বাবাই গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে, চাবি লাগিয়ে সলিল দরজা খুলল। একটু দূর থেকেই ব্রতীন চেঁচিয়ে বলল, ‘সলিল চললি নাকি রে!’
