‘বড়দা বছরে দু-একবার মাত্র উঁকি দিয়ে যায়! শুনেছি শ্বশুর মারা যাওয়ায় তিন কাঠা জমি পেয়েছে টালিগঞ্জে, সেখানেই বাড়ি করবে। মেজদা তো আর ফিরলই না। আমার এক বন্ধুর দাদা প্যারিস থেকে ফিরেছে, তার কাছে শুনলুম, বিয়ে করেছে মেজদা। রাঙাদা গত বছর ডি ফিল পেল, চেষ্টা করছে আমেরিকা যাবার। আমার লেখাপড়ার দিকে কেই বা নজর দেবে বলুন।’
নারানের গলায় ক্ষোভ ফুটে উঠলেও তারকের মনে হল দাদাদের নিয়ে যেন ঈষৎ গর্বিত। তারক এজন্য কিছু মনে করল না। বনেদি ঘরের ছেলে, ওর বাবা গগন বসুমল্লিক চাকরি না করেই সারাজীবন কাটিয়ে গেছে। কলকাতার বুকে সাত বিঘের উপর জমি আর বসত বাড়ি। এক এক কাঠার দামই তো কম করে পনেরো হাজার টাকা।
‘তোমার কাকারা এখন, গেট দিয়ে ঢুকেই ডানদিকের কাঁটালি চাঁপা গাছটার দিকে যে অংশ ওখানেই থাকেন, না?’
‘ওরা এখন সামনের দিকে থাকে। পার্টিশান হবার পর ওরা তো প্রায় গোটা বাড়িই পেয়েছে, জমিও। আমরা পেছন দিকে থাকি।’
তারক শুনেছিল শেয়ারবাজারে টাকা খাটাতে গিয়ে গগন বসুমল্লিকের দেনা হয়। ভাইয়েদের কাছে সম্পত্তির অংশ বিক্রি করে দেন। বিক্রি না করলে শুধু জমি বাবদই এখন কত টাকা নারানের ভাগে থাকত তার একটা হিসেব তারক মনে মনে কসে ফেলল। কাকাদের এবং তিনদাদার অংশ বাদ দিলে প্রায় এক লাখ পনেরো হাজার টাকা! তারকের চোখে আক্ষেপ ফুটে উঠল। এতগুলো টাকা যদি নারানের আজ থাকত! গগন বসুমল্লিকের একটা ভুলের জন্য তার ছেলেরা গরিব হয়ে গেল। এমন ভুল বঙ্কুবিহারী কখনোই করত না। অবশ্য অত টাকাই বা কোথায় যে শেয়ার বাজারে নামবে। হাজার পনেরো টাকার চার-পারসেন্ট সুদের ডিবেঞ্চার কেনা পর্যন্তই তো দৌড়। আর ঝি-চাকর-গয়লাদের শতকরা বায়াত্তর টাকা সুদে পঁচিশ-পঞ্চাশ করে ধার দেওয়া। তারক ভাবল, তবু তো একটা বাড়ি, পনেরো হাজার টাকা আর দুটো ভাড়াটে তার জন্য বঙ্কুবিহারী রেখে যাবে।
‘আর কোথাও চেষ্টা করছ?’
‘না, তবে শর্টহ্যান্ড শিখছি!’
‘ওতে কিছু হবে না, ব্যবসায় চেষ্টা কর না কেন?’
‘টাকা কোথায়!’
‘টাকা না হলে কি ব্যবসা হয় না। গুজরাটি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, মাড়োয়ারিরা কি টাকা নিয়ে এদেশে আসে? আসলে পরিশ্রমটাই হচ্ছে মূলধন। বাঙালি জাতটাই এত বাবু হয়ে গেছে না, নইলে কলকাতার বুকে বসে অবাঙালিরা বড়ো বড়ো ইন্ডাস্ট্রি করে লাল হয়ে গেল আর আমরা কিনা তাদের গোলামি করি!’
তারক হঠাৎ থেমে গেল। তার মনে হল সে যেন হিরণ্ময়ের গলা নকল করছে। অবশ্য হিরণ্ময়, বাঙালি-অবাঙালি বলে না। শোষকশ্রেণি আর জনগণ, মানুষ ওর কাছে দু-ভাগে বিভক্ত এবং খুব দ্রুত মানুষকে সে ভাগ করে ফেলতে পারে। তারকের ঈষৎ ইচ্ছা হল, নারানকে শোষক শ্রেণিভুক্ত হওয়ার দিকে উত্তেজিত করে তুলতে।
কিন্তু নারানের বিষণ্ণ মুখে, ব্যবসা করে বড়োলোক হবার কোনো ইচ্ছা ফোটেনি দেখে তারক অপ্রতিভ বোধ করতে লাগল। সেটা কাটিয়ে ওঠার জন্য বলল, ‘তোমাদের গেটের পাশেই একটা পামগাছ ছিল, আছে এখনও? অনেকদিন তোমাদের বাড়ির দিকে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।’
‘আছে, তবে পাতাটাতা আর নেই। গাছটা মরে যাচ্ছে। বয়স তো কম হল না।’
‘কত?’
‘তা ধরুন, বাড়ির বয়স প্রায় একশো তিরিশ-পঁয়ত্রিশ তখনকারই গাছ।’
‘গাছটার পাশেই ইলেকট্রিক মিটারের ঘর। ওর দরজাটা ছিল টিনের। বল লাগলেই আওয়াজ হত। আর তখন তোমার সেজোকাকার চিৎকার শুনতে হত। খুব খিটখিটে ছিল। তবে তোমার বাবা কিছু বলতেন না। প্রায়ই দোতালার বারান্দায় দাঁড়িয়ে খেলা দেখতেন। রাশভারি লোক। তুমি তো দেখনি কি মেজাজ ছিল। তোমাদের পাড়ার সার্বজনীন দুর্গাপুজো তো উনিই আরম্ভ করেন। প্রথমবার একাই সব খরচ দেন।’
‘স্কুলে দেখেছি একটা পাথরে বাবার নাম লেখা আছে। কুড়ি হাজার টাকা ডোনেট করেছিলেন।’
‘আমরা একবার ব্যাট-বল কেনার পয়সা চাইতে তোমাদের দোতলায় গেছলুম, ওঁর কাছে। গোপাল, তোমার মেজদা, আমাদের সঙ্গেই খেলত। সে তো দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েই হাওয়া। কেউ আর সাহস করে ঢোকেই না। এ ওকে ঠেলে, সে তাকে ঠেলে। এমন সময় ভেতর থেকে গম্ভীর গলায় ‘কী চাই’, শোনামাত্র সবাই দুড়দুড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে পালাল। কিন্তু আমি রয়ে গেলুম। তারপর ভেতরে ডাকলেন। কোনোরকমে তো চোখ বুজে বলে ফেললুম। সঙ্গে সঙ্গে দশ টাকার একটা নোট বের করে দিলেন।’
তারক দেখল নারান হাসবার চেষ্টা করে মুখখানা বুড়োটে করে ফেলেছে। কিন্তু তার নিজের মধ্যে একটা টগবগে ইচ্ছা ফেঁপে ওঠার উপক্রম করছে। এখন এন্তার কথা বলে যেতে পারে। ষোলো-সতেরো বছর বয়সটা যেন অতীত থেকে তীব্রবেগে ধেয়ে এসে, তার শরীর ফুঁড়ে সেঁধিয়ে যাচ্ছে।
‘আপনি তো আগে আমাদের বাড়ি খুব যেতেন। মা বলছিলেন, অনেকদিন আসেন না।’
‘যাব। আসলে সময়ই পাই না। গোপালটাও বিদেশ চলে গেল, খুব বন্ধু ছিল আমার, বলতে গেলে একমাত্র বন্ধু। ও না থাকলে আমার খেলা অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত, রঞ্জি ট্রফি পর্যন্ত আর হত না। তা ছাড়া-‘ তারক থেমে কী যেন ভাবতে গিয়ে চোখটা নারানের থেকে সরাতেই দেখল সুপারিনটেনডেন্ট তেওয়ারি ঘর থেকে বেরিয়ে রেফারেন্স সেকশনের দিকে যাচ্ছে। তারক হঠাৎ ভীত বোধ করল এবং সেটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় দুম করে বেপরোয়ার মতো বলল, ‘তোমার দিদি তো এখন বরানগর থাকে, তাই না?’
