কোনো আপত্তি তুলল না সলিল। দেবীর হাত ধরে বাবাই তার পিছনে ওরা দুজন। ‘দেবী সলিলকে ওপরে নিয়ে যা। কাকাকাবুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দে। এ বাড়িতে ও আগে কখনো আসেনি, অনিল এসেছে। অনেকবার।’ সলিলের দাদা অনিল, ব্রতীনের বন্ধু।
‘বড়দা তুমিও এসো।’
‘আমি একটু বেরোব, কাজ আছে। সলিল কিছু মনে কোরো না, এখুনিই ফিরে আসব।’
দোতলা থেকে ব্রতীন দ্রুত নেমে এল। কাজ আছে। কলকাতায় আর তিন-চার দিন মাত্র সে থাকবে। তার মধ্যেই কাজটা মিটিয়ে ফেলতে হবে। মুম্বই থেকে রওনা হবার সময় এগুলো সে সঙ্গে করে আনেনি এমনকী তার চিন্তায়ও ছিল না। স্কুলের প্রতিদিনের রাস্তা দিয়ে তিরিশ বছর পর হাঁটার ইচ্ছাটা যদি হঠাৎ মাথায় চেপে না বসত তা হলে এত বছর ধরে যে একটা কৌতূহল তার মধ্যে ঘাপটি মেরে আছে সেটা সে জানতেই পারত না। যেমন জানতেই পারত না বাসুর চেহারা এত সুন্দর হয়ে উঠবে বয়স বাড়ার সঙ্গে, এত সহজভাবে ও বলবে ‘একথাটা তিরিশ বছর আগে বলোনি কেন?’
তালগোল পাকিয়ে মেয়েটি রাস্তায় তার সামনে ছুড়ে দিয়েছিল যে কাগজটা তাতে কী লেখা ছিল? অবশ্যই প্রেমপত্র। একটা সতেরো বছরের ছেলের প্রথম প্রেমপত্র পাওয়ার অনুভূতি তিরিশ বছর পর আবার যে ফিরে আসবে, ‘ওয়াই’ হয়ে যাওয়া দুটো রাস্তার মোড়ের কাছে পৌঁছোবার আগে পর্যন্ত এটা একদমই সে অনুমান করতে পারেনি।
আর কী অদ্ভুতভাবে সে পেয়ে গেল নিমিকে! ব্রতীন কোনোদিনই বিশ্বাস করেনি নিয়তিতে, বিজ্ঞানে বিশ্বাসী বরাবর এবং এখনও। তিরিশ বছর আগের মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়াটাকে সে কাকতালীয় ধরে নিয়েছে। সেইভাবে বুড়িকে যখন আবিষ্কার করেই ফেলেছে তখন ছুড়ে দেওয়া চিঠিতে কী লিখেছিল সেটাও জেনে নেওয়া যেতে পারে। এখন তো তারা দুজনেই পরিণত এবং বয়স্ক। বুড়ি কিন্তু সত্যিই বুড়ি হয়ে গেছে! ওর সঙ্গে আগের দিন কথা বলে তার মনে হয়েছে কৈশোরের ছেলেমানুষি হঠকারিতা কবুল করতে এখন ওর লজ্জা করবে না। বাসু তো স্পষ্টই মেনে নিল, তিরিশ বছর আগে যদি সে জানত ব্রতীন তার প্রতি অনুরক্ত কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছে না তা হলে আজ তাকে এই দুর্দশায় পড়তে হত না। বয়স বাড়লে, অভিজ্ঞতার চড়চাপড় খেতে খেতে মানুষ এক সময় বুঝে যায় সে কী জিনিস হারিয়েছে। বাসু এটা এখন বুঝতে পেরেছে কিন্তু সে নিজে কি বুঝতে পারছে। তিরিশ বছর আগের সেই মেয়েটি এখন গোলাপবাগানের বস্তিতে, সে কি ভাবছে তার রোগজীর্ণ শরীর আর দারিদ্র্য নিয়ে? সেদিনের স্কুলের ছেলেটা যদি চিঠিটা কুড়িয়ে নিত তা হলে আজ তাকে এইরকম দুর্দশায় পড়তে হত না!
জানতে হবে তাকে। হাঁটতে হাঁটতে ব্রতীন ভেবে চলেছে। মুম্বই ফিরে যাবার আগেই তাকে জেনে নিতে হবে সে বাসুকে হারিয়েছে না বুড়ি তাকে হারিয়েছে।
সেন্ট্রাল অ্যাভিনুর ওপারটা অন্ধকার। পাওয়ার কাট চলছে। রাস্তা পার হয়ে ব্রতীন দ্রুত পায়ে গোলাপবাগানের দিকে এগোল। দোকানগুলোয় মোমবাতি আর হারিকেন জ্বলছে। দু-তিনটে বাড়ি থেকে জেনারেটরের আলো রাস্তায় পড়ে বাকি অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে তুলেছে। গোলাপবাগান বস্তিতে ঢোকার মুখে কিছু স্ত্রী-পুরুষ বসে গরম থেকে রেহাই পেতে। তারা মুখ তুলে ব্রতীনের দিকে তাকিয়ে লোকটা কে ঠাওর করার চেষ্টা করল।
ঘরের দরজা খোলা, ছোটো একটা হারিকেন জ্বলছে। পলতেটা নামানো তেল বাঁচানোর জন্য। ব্রতীন দাঁড়িয়ে ভিতরে তাকাল। তক্তাপোশে বুড়ি শুয়ে। ঘরে আর কেউ নেই।
‘কে?’
‘আমি।’
‘ওহঃ আপনি।’
বুড়ি উঠে বসল। গায়ে মাথায় কাপড় ঠিক করতে করতে বলল, ‘নিমি এই মাত্তর বেরোল। একজনদের ঘরে গেছে। ওর পায়ের ছবি দেখে ডাক্তার বলেছে ভাঙেনি তবে চিড় ধরেছে।’
‘চিড় ধরলে চলাফেরা বন্ধ রাখতে হয় নয়তো বেড়ে যাবে।’ ব্রতীন কথাটা বলে এধার-ওধার তাকাল বসার মতো কিছু একটা পাওয়ার খোঁজে। সেলাই মেশিনটার কাছে একটা টুল দেখতে পেয়ে টেনে এনে বসল বুড়ির মুখোমুখি।
‘আমিও তো ওকে তাই বললুম, হাঁটাহাঁটি করার দরকার কী ঘরে বসে থাক, কে আর শোনে আমার কথা। কথা না শুনলে এক সময় ওকে পিটিয়েছি, এখন আর গায়ে জোর নেই, তা ছাড়া নিমি তো এখন আর ছোটো নেই।’ ধীরে ধীরে শ্বাস টেনে বুড়ি কথাগুলো বলল।
‘নিমির বয়স কত হল?’
‘আঠারো চলছে সামনের অঘ্রানে উনিশে পড়বে।’
‘পড়াশুনো কদ্দূর করেছে?’
‘কর্পোরেশন ইস্কুলে ক্লাস ফোর পর্যন্ত, নিজেই পড়া ছেড়ে দিল ওর বাবা মরে যেতে।’
‘এখন যে কাজটা করে সেটা পেল কী করে?’
‘এখানকারই একটা বউ ওই পার্লারে কাজ করে, সে-ই কাজটা পাইয়ে দিয়েছে। নিমি তো ওর ঘরেই গেছে টিভি দেখতে তারপরই লোডশেডিং হল। আপনার কথা নিমি আজ সকালেও বলছিল।’
ব্রতীন কৌতূহলী হয়ে উঠল। কী বলেছে মেয়েটা? নিশ্চয় খারাপ কিছু তার সম্পর্কে বলেনি। তা বললে মায়ের কাছে নিজের সম্পর্কে কিছুই আর গোপন করে রাখতে পারবে না। তা ছাড়া তাকে খারাপ চরিত্রের লোক বলার মতো কিছুই তো ঘটেনি।
‘আপনার মতো মানুষ ও কখনো দেখেনি। যদি ওকে তুলে না আনতেন তা হলে ওর বাড়ি ফেরাই হত না। অনেক টাকা নাকি ওর জন্য খরচ করেছেন। নিজের মেয়ের মতো করে একজন অচেনা লোক যে এমন যত্ন করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে, ট্যাসকি করে ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দেবে এটা ও ভাবতেই পারেনি।’ বুড়ির গলা ধরে এল আবেগে। ‘আমিও ভাবতে পারিনি। ভগবান আপনাকে ঠিক সময়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। নিমির ভাগ্যি।’
