‘থাক না এখনে।’ ব্রতীন বলল।
দেবী বলল, ‘আমার কোনো অসুবিধা হবে না।’
সলিল কিছু না বলে নীচে নেমে গেল। প্রমিতা খেতে বসেছে পরিবেশন করছে দেবী। শিবু খেয়ে উঠেই শুয়ে পড়েছে। ব্রতীন বারান্দায় এসে দাঁড়াল। রাস্তা দিয়ে দু-চারজন লোক যাচ্ছে। সামনের খালের নোংরা জলে স্নান করছে কতকগুলো বাচ্চচা ছেলে। একজন স্ত্রীলোক সাবান ঘষে চুল পরিষ্কার করছে। একটু দূরে বড়ো রাস্তা দিয়ে সরকারি বাস চলে গেল। বারান্দার রেলিং ধরে সে আকাশে তাকাল। ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন আকাশ। বেশিক্ষণ চোখ রাখা যায় না। আজ সকাল থেকে দিনটা উজ্জ্বল থাকত যদি বাসন্তীকে ওইভাবে চলে যেতে না হত। ট্যাক্সিতে উঠে চলে যাবার সময় ও তাকিয়েছিল। চোখের চাহনিতে কিছু একটা বলতে চেয়েছিল। কী চেয়েছিল সেটা আর জানা হয়নি। আর কোনোদিন জানা হবেও না।
ব্রতীনের মনে পড়ল, আর একটা না জানা কথা জানতে বাকি রয়ে গেছে। গোলাপবাগানের বুড়ি তিরিশ বছর আগে দলা পাকিয়ে যে চিঠিটা তার সামনে ফেলেছিল তাতে কী লিখেছিল? যে দুটো লোক রকে বসেছিল তাদের একজন চিঠিটা কুড়িয়ে নেয়। নিশ্চয় পড়েছে, পড়ে হাসাহাসি করেছে। তা মনে পড়লে সে বিব্রত হয় এখনও। ওটাই ছিল তার জীবনে প্রথম পাওয়া প্রেমপত্র আর ওটাই শেষ। চিঠিটা পেয়েও পাওয়া হয়নি, লজ্জায় সে কুড়োতে পারেনি। মলি বলেছিল ‘ঘরে যাবেন না?’ এভাবে ডাক পাওয়াও জীবনে প্রথম, বিতৃষ্ণায় কি প্রত্যাখ্যান করেছে না কি লজ্জায়!
ব্রতীন অনেকগুলো প্রশ্ন তুলে আকাশে চেয়ে রইল। তারপর এক সময় ঘরে এসে ঘুমন্ত শিবুর পাশে শুয়ে পড়ল।
নীল মারুতিটা সলিলের। সে নিজেই বলল পৌঁছে দেবে। পিছনের আসনে দেবী সঙ্গে নাছোড়বান্দা বাবাই। সেও সঙ্গে যাবে যতক্ষণ পারে মাসিমণির কাছে থাকতে চায়। সারা পথ অজস্র প্রশ্নে সে জেরবার করল দেবীকে।
‘মাসিমণি তুমি নিক্কোপার্ক দেখেছ?’
‘না, তুমি দেখেছ?’
‘না। ওখানে বাঘ আছে?’
‘না, ওখানে অনেক রকমের মজার খেলা আছে। বাঘ আছে চিড়িয়াখানায়।’
‘তুমি চিড়িয়াখানা দেখছ?’
‘দেখেছি। তুমি দেখেছ?’
‘না, তুমি আমাকে বাঘ দেখাবে?’
‘বাবাকে বলো, বাবা তোমাকে দেখিয়ে আনবে।’
বাবাই চুপ করে রইল। ব্রতীনের মনে হল বাবাই তার বাবা সম্পর্কে আড়ষ্ট, বোধহয় ভয়ও পায়। ছটফটে কৌতূহলী নিঃসঙ্গ ছেলেকে সামলাতে ধমকে চুপ করিয়ে দেওয়াকেই অস্ত্র করেছে সলিল, যেজন্য ছেলের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়নি। ব্রতীন বলল, ‘দেবী তুই তো ওকে বাঘ দেখিয়ে আনতে পারিস। সলিল ব্যস্ত মানুষ, সময় করে উঠতে পারে না।’
দেবী বলল, ‘ইচ্ছে থাকলে সময় ঠিকই করে উঠতে পারা যায়। ঠিক আছে আমিই বাবাইকে বাঘ দেখিয়ে আনব অবশ্য ওর বাবার যদি তাতে আপত্তি না থাকে। আমি প্রথম চিড়িয়াখানায় যাই এক বছর বয়সে বাবার কোলে চড়ে।’
ব্রতীন বলল, ‘কী রে সলিল তোর কি আপত্তি আছে দেবী যদি ওকে চিড়িয়াখানা দেখিয়ে আনে।’
‘না না আপত্তি হবে কেন, এ তো খুবই ভালো কথা। আমি অনেকদিনই ভেবেছি ওকে নিয়ে সপ্তায় একদিন বেরোব, সারাদিন ওর সঙ্গে কাটাব। বাবাই সারাদিনই একা একা কাটায় ওর কম্পানি দরকার। কিন্তু কী জানো, অপারেশন, চেম্বার রোগী দেখা এ সবের পর এত টায়ার্ড থাকি-।’ অরবিন্দ সেতুতে ওঠার মুখে সলিল ব্রেক কষে গাড়ির সামনে থতমত হয়ে থাকা এক প্রৌঢ়ের উদ্দেশ্যে জানলা দিয়ে মুখ বার করে বলে উঠল, ‘দু সেকেন্ড তর সয়না? এভাবে রাস্তা পার হয়?’
ফার্স্ট গিয়ার দিয়ে দলিল গাড়ি ছেড়ে বলল, ‘নিজে মরত আমাদেরও বিপদে ফেলত।’
দেবী বলল, ‘আস্তে চালান।’
‘তাই তো চালাচ্ছি। এর থেকে আস্তে চালালে গোরুর গাড়িতে যাওয়াই ভালো।’ গজগজে সুরে সলিল বলল।
সে ফার্স্ট গিয়ারে রেখেই গাড়ি চালাল। কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। গাড়ি ঢুকছে উত্তর কলকাতায় সবথেকে ভিড় এলাকা হাতিবাগানে। সলিল সতর্ক এবং বিরক্ত চোখে সামনে তাকিয়ে। হাতিবাগান মোড় পার হবার আগে গাড়ি প্রায় চার মিনিট অপেক্ষা করে। এঞ্জিন বন্ধ করে তখন সলিল বলল, ‘বতুদা এক এক সময় মনে হয় গাড়ি রাস্তায় আর বার করব না, বেরোলেই টেনশনে পড়ে যাই তার ওপর এই ছেলে!’
‘কেন বাবাই আবার কী টেনশন বাড়াল আপনার?’ পিছন থেকে দেবী বলল অবাক সুরে।
সলিল মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘মাত্র কয়েক ঘণ্টা তো ওকে দেখেছেন, দিনের পর দিন যদি দেখতে হত তা হলে-‘
‘তা হলে পাগল হয়ে যেতুম, কেমন?’ দেবী বলল তীব্র এবং বাঁকা স্বরে।
‘হ্যাঁ হতেন।’ সলিল নিশ্চিত গলায় বলল।
দেবী এবার বাবাইকে বলল, ‘বাবাই তুমি আমাকে পাগল করে দেবে?’
‘হ্যাঁ আ আ,’ বাবাই ‘হ্যাঁ’টাকে টেনে লম্বা করল।
‘তা হলে বাঘ দেখাতে নিয়ে যাব না।’
‘পাগল না করলে নিয়ে যাবে?’
‘যাব।’
‘তা হলে পাগল করব না।’
সামনের গাড়ি এগোতেই সলিল এঞ্জিন চালু করে বলল, ‘বাবাইয়ের এই ‘করব না’র আয়ু দশ মিনিটের বেশি টিঁকবে না।’
‘বাবাই শুনলে তো বাবা কী বললেন। তুমি নাকি দশ মিনিট পরেই আমাকে পাগল করে দেবে।’
‘দশ নয় এগারো মিনিট পরে।’ বাবাই নিশ্চিত স্বরে বলল। দশ মিনিটের আগেই ওরা বাড়ির সামনে পৌঁছে গেল।’
গাড়ি রেখে ওদের সঙ্গে সলিল আর বাবাইও নামল। ব্রতীন বলল, ‘সলিল বাড়িটা চিনে যা, ওপরে আয়।’
