সবাই এল চেম্বারে। দেবী ঘরে চোখ বুলিয়ে হতাশ স্বরে বলল, ‘যন্ত্রপাতি কই?’
‘যেখানে থাকার কথা যেখানে ঠিকই আছে। এখানে শুধু পরীক্ষা হয়,’ গম্ভীর স্বরে বলল সলিল।
‘পরীক্ষা করতে তো যন্ত্রপাতি লাগে।’ দেবী তর্ক করার জন্য তৈরি হচ্ছিল। শিবু বাধা দিয়ে বলল, ‘যন্ত্রের থেকেও বেশি এফিসিয়েন্ট ডাক্তার সরকারের হাত চোখ আর মাথা।’
‘টেবলে শুয়ে পড়ুন।’
পাতলা ছোবড়া আর তুলোর উপর রেক্সিন মোড়া টেবলটা। একটা রুগণ যৎসামান্য বালিশ। পা রেখে ওঠার জন্য একটা টুল। দেবী উঠে বসল।
‘শুয়ে পড়ুন, উপুড় হয়ে।’
দেবী চিত হয়ে শুয়ে গড়িয়ে উপুড় হল। সিল্কের শাড়ি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলল তার নিতম্ব। ব্রতীন চট করে সলিলের মুখের দিকে তাকিয়ে নিল। মনে হল ওর চোখে পলকের জন্য তারিফের মতো একটা ভাব ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। পেশাদার লোক, মুহূর্তে চোখের ভাবে ব্যস্ততা এনে ফেলল। ব্লাউজ আর কোমরের শাড়ির প্রান্ত, তার মাঝে অনাবৃত ইঞ্চি ছয়েক পিঠ। সলিল তার দুটো আঙুল শিরদাঁড়ার নীচের দিকে রেখে চাপ দিল।
‘লাগছে?’
‘না।’
আঙুল দুটো একটু নীচে নামল। ‘লাগছে?’
‘না।’
আঙুল দুটো আরও নীচে শাড়ির কিনারে এল। ‘লাগছে?’
অস্বস্তি ভরে ‘না।’
এবার আঙুল দুটো যেখানে পৌঁছোল তাতে ব্রতীন ‘থাক’ শব্দটা শোনার আশা করল। তেমন কিছু শোনা গেল না শুধু দেবীর কোমরের নীচের অংশ সামান্য নড়ে উঠল, মুখটা বালিশে চেপে ধরল লজ্জা লুকোতে। পাশে দুটো দাদা দাঁড়িয়ে দেখছে এটা ওর মাথায় রয়েছে।
‘লাগছে?’
‘হ্যাঁ।’
ব্রতীন বুঝল ‘না’ বললে আঙুল দুটো আরও নীচে নামবে তাই ‘হ্যাঁ’ বলে থামিয়ে দিল।
‘সলিল আমার মনে হয় দেবী ঠিক জায়গাটা বুঝতে পারছে না। তুমি আর একটু দেখো তো।’
‘না না ওখানেই।’ দেবী তাড়াতাড়ি কাত হয়ে উঠে বসতে গেল। সলিল দু-হাতে কোমর ধরে আবার উপুড় করে দিল।
‘যখন বলব তখন উঠবেন।’ সলিলের গলায় ডাক্তারি হুকুম।
‘ঠিক করে বলুন, এখানে লাগছে?’
‘হ্যাঁ।’
সলিল আঙুল বুলিয়ে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করে বলল, ‘ঠিক আছে উঠে বসুন।’
দেবী উঠে পা ঝুলিয়ে বসল। সবাই সলিলের মুখের দিকে তাকিয়ে, জানতে চায় ডাক্তারের অনুসন্ধানের ফল।
‘কিচ্ছু হয়নি, শুধু কতকগুলো ব্যায়াম দরকার।’
শিবু বলল, ‘স্পন্ডালাইসিস? এক্স রে করতে হবে?’
‘না। তবে টাকা খরচ করতে চান যদি কলকাতায় অনেক বড়ো বড়ো ডাক্তার পাবেন। আমি অহেতুক টাকা খরচ করাই না, ট্রিটমেন্ট করি। জটিল হতে পারে যদি ব্যায়ামগুলো না করে।’
‘কী ব্যায়াম করব?’ দেবী জানতে চাইল।
‘দেখিয়ে দিচ্ছি। পা জোড়া করে সোজা সামনে তুলুন মাথার পিছনে দুটো হাত রেখে। শরীরটা হবে ইংরিজি ‘এল’-এর মতো। করুন করুন।’ নির্দেশমতো টেবলের কিনারে বসে সে জোড়া পা তুলল। ‘সোজা করে রাখুন।’ দেবী দুটো ঠোঁট কামড়ে ধরে সোজা রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ‘পিঠ সোজা করুন।’ দেবী সোজা করল।
ব্রতীন দেখল দেবীর উরুর পেশি ফুলে উঠেছে। পা দুটো কাঁপছে সোজা করে ধরে রাখতে পারছে না। সলিল দু-হাত পায়ের নীচে রেখে উঁচু করে তুলে দিল। ‘একইভাবে থাকবে।’
ঝপাৎ করে পা নামিয়ে দেবী উঠে দাঁড়াল, ‘পারব না অতক্ষণ রাখতে।’ বলেই সবাইকে অবাক করে দপদপিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বাবাই তার পিছু নিল। বাচ্চচা ছেলে অনুভূতি দিয়ে জেনে গেছে আত্মরক্ষার দুর্গটি কোথায়।
ওরা বসার ঘরে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রমিতা দোতলা থেকে নেমে এল।
‘বড়দা, দেবী বলেছিল তিনজন আসবেন, এলেন তো দুজন। বাকি রান্নাটা খাবে কে?’
‘এটা কি খুব বড়ো একটা সমস্যা?’ ব্রতীন মুখ ঘুরিয়ে সলিলের দিকে তাকাল। ‘ডাক্তারের ফি বাবদ ওকে নেমন্তন্ন করো।’
‘আমি! না না আমার ভাত করা আছে।’
‘থাক না করা। ও বেলা খেয়ে নেবেন।’ প্রমিতা বলল।
‘সলিল মাঝে মাঝে স্বাদ বদল করে দেখিস, ভালো লাগবে। কী রেঁধেছ প্রমিতা?’ ব্রতীন জানতে চাইল।
‘অল্প রান্না। চালকুমড়োর পাতুরি সর্ষেবাটা দিয়ে, মুগের ডাল, বড়ি ভাজা আর কাঁকড়ার ঝাল, জলপাইয়ের চাটনি। দই মিষ্টি আর রাখিনি।’
ব্রতীন লাফিয়ে উঠে বলল, ‘প্রচণ্ড প্রচণ্ড। কাঁকড়া? পাতুরি? সলিল রাজি না হলে বুঝব তুই একটা গোরু।’
নিজেকে গোরু প্রমাণের বাসনা সলিলের মধ্যে ছিল না। দোতলায় খাবার টেবলে চারজনের সঙ্গে বাবাইকেও দেখা গেল দেবীর পাশে একটা চেয়ারে। পরিবেশনে ব্যস্ত প্রমিতা।
‘বউদি ওকে শুধু ভাত আর ডাল। সর্ষেবাটা লঙ্কাবাটার কোনো রান্না নয়।’ দেবী খেতে বসেই আগাম নির্দেশ দিল প্রমিতাকে।
‘না আ আ আমি কাঁকড়া খাব।’ বাবাই নাকিসুরে আবদার জুড়ল।
কড়া গলায় দেবী মৃদু ধমক দিল, ‘যা বলছি শোনো। ওসব বড়োদের খাবার। তুমি যখন বড়ো হবে তখন খাবে। এখন খেলে শচীনের মতো গায়ে জোর হবে না, ছয় মারতে পারবে না।’
বাবাইকে ডাল ভাত মেখে দিল দেবী।
‘তুমি খাইয়ে দাও।’
‘নিজের হাতে খাও। খেতে শেখো।’ দেবী নিজের পাত থেকে খেয়ে দেখিয়ে বলল, ‘এইভাবে ভাতের গরাস তৈরি করে গপ করে মুখে পুরে দাও। ভালো করে চিবোও।’
হইচই করে সবাই খাওয়া শেষ করল। সলিল নীচে নেমে যাবার আগে বাবাইকে ডাকল, ‘চলো এবার ঘুমোবে।’
‘না।’ বাবাই এখন যথেষ্ট সাহসী। ‘মাসিমণির কাছে ঘুমোব।’
‘মাসিমণি!’ সলিল অবাক হয়ে তাকাল দেবী তারপর ব্রতীনের দিকে।
