‘বাইরে ছেলের সঙ্গে খেলছে কে, অমিত?’
‘হ্যাঁ।’
‘চাকর-বাকরের হাতে ছেলে মানুষ হচ্ছে এটা কিন্তু ভালো নয়।’
‘কী করব, যেমন ভাগ্য করে এসেছে বাবাই। আমি যতটা পারি ওর সঙ্গে সকালটা কাটাই। বাকি দিন ও কী করে আমি জানি না, রাতে যখন ফিরি তখন ও ঘুমোচ্ছে। এবার ওকে স্কুলে দেব। তুমি যে আজ আসবে সেটা শিবুবাবু কাল বললেন। ক-দিন থাকবে?’
‘আর তিন-চার দিন।’
‘যাক অনেকদিন পর দেখা হল। দেখে মনে হচ্ছে ভালোই আছ। মাসিমা কেমন আছেন?’
‘রোজ বাজার যান নিজের ঘর নিজে মোছেন সুতরাং কেমন আছেন বুঝে নে, এখন বয়স একাত্তর।’
‘ওঁকে আনলে না কেন?’
‘চার বছর পর শহরে গুরুদেব এসেছেন এখন ওঁকে মুম্বইয়ের বাইরে বার করা যাবে না। শোন এবার বিয়ে কর। ছেলেটার মুখ চেয়ে কাজটা করে ফেল।’
ঠিক তখনই দোতলার বারান্দা থেকে দেবীর তীক্ষ্ন গলা শোনা গেল। ‘ওকি তুমি ছেলেটাকে বল দিয়ে মারলে? অতবড়ো লোক ওইটুকু বাচ্চচার মুখে বলটা ছুড়ে দিলে!’
‘মারলাম কোথায় বলটা তো লেগে গেল।’
‘মারা আর লেগে যাওয়ার তফাতটা কি বুঝিনা? শিগগিরি ওর চোখে ঠান্ডা জল দাও।’
‘বতুদা কে কথা বলল? বেশ দাপট আছে মনে হচ্ছে। অমিত একদম চুপ।’
‘শিবুর বোন দেবী। ওর লাম্বার রিজিয়নে স্পাইনালকর্ডে একটা ব্যথা ক-দিন হল হয়েছে, বেকায়দায় নড়াচড়া হলেই চিড়িক দিয়ে উঠছে। তোকে দেখাব বলে এনেছি।’
জানলার বাইরে দেবীর গলা শোনা গেল, এবার স্বর একদম অন্যরকম, ‘না না কিছু লাগেনি। বড়ো বড়ো ব্যাটসম্যানদের অমন একটু-আধটু লাগে তাই বলে কি তারা কাঁদে? চলো বরফ জল চোখে দিয়ে দিচ্ছি।’ দেবীর গলার স্বর এবার কঠিন হয়ে উঠল। ‘ওহে তখন বললুম ওর চোখে ঠান্ডা জল লাগাতে, কথাটা গ্রাহ্যেই আনলে না। ঘরে ফ্রিজ আছে? বোতলে ঠান্ডা জল আছে?’
‘আছে।’
‘আছে তো দাঁড়িয়ে আছ কেন?’
ব্রতীন আর সলিল মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, জানলার কাছে গিয়ে পরদা সরিয়ে সলিল উঁকি দিল। এই প্রথম সে দেবীকে দেখল। বাবাইয়ের মাথাটা পেটে চেপে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ঝুঁকে কী বলছে চাপা গলায়। প্রায় দৌড়ে এল অমিত, হাতে জলের বোতল। দেবী শাড়ির আঁচল জলে ভিজিয়ে বাবাইয়ের চোখে বুলিয়ে দিল।
‘এবার চোখ খুলে তাকাও তো আমার দিকে।’
বাবাই চোখ পিটপিট করে তাকাল দেবীর দিকে।
‘দারুণ! এই তো শচীন টেণ্ডুলকরের মতো তাকাচ্ছ। দেখি আর একবার বল মারো তো।’ দেবী বলটা হাতে নিয়ে পিছিয়ে গেল।
দোতলা থেকে নেমে এসেছে শিবু, তার সঙ্গে কথা শুরু করল ব্রতীন। ঘর থেকে বেরিয়ে সলিল চাতালে গিয়ে দাঁড়াল। সলিলের বয়স সবে চল্লিশ পেরিয়েছে। লম্বা ছিপছিপে টাউজার্স টিশার্ট পরা গৌরবর্ণ, পায়ে চটি। চারবার বল করার পর দেবীর ব্যথাটা চেগে উঠতেই সে খেলা বন্ধ করে বাবাইকে বলল, ‘আর নয়। পরে খেলব। আমার কোমরে ব্যথা।’
‘ঠান্ডা জল দাও না, সেরে যাবে।’ মাটিতে রাখা বোতলটা তুলে নিল।
‘আরে না না, জল দিয়ে এ ব্যথা সারানো যায় না।’
‘হ্যাঁ যায়।’ বোতলের ঢাকনা খুলে বাবাই, দেবী সরে যাওয়ার আগেই খানিকটা জল তার কোমরের কাছে ঢেলে দিল।
‘বাবাই।’
কঠিন স্বরে ধমক দিয়ে সলিল চাতাল থেকে ছুটে এল। ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল বাবাইয়ের মুখ, সে দেবীর পিছনে সরে গিয়ে আঁকড়ে ধরল তার হাত। দেবী দু-হাত পিছনে বাড়িয়ে বাবাইয়ের কাঁধ ধরে রাখল।
‘এদিকে এসো, ছেড়ে দাও ওনাকে।’ সলিল চোখে আগুন ঝরাল।
দেবী অনুভব করল ছেলেটা কাঁপছে ভয়ে, সে ঘুরে সলিলের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বাবাইকে জড়িয়ে ধরল।
‘মারবেন না ওকে, মারবেন না।’ দেবী মিনতি জানাল।
‘অসভ্য বাঁদর হচ্ছে দিনকে দিন।’ সলিল গর্জে উঠল।
অমিত ফুট কাটল, ‘এরকম রোজ করে আমার সঙ্গে।’
‘কেন করে সেটা তো আগে দেখতে হবে।’ দেবী বলল।
দোতলার বারান্দা থেকে প্রমিতা চেঁচিয়ে বলল, ‘ঠাকুরঝি ওপরে এসো, শাড়িটা পালটে নাও।’
দেবী রওনা হতে গিয়ে থমকে পড়ল। বাবাই তার হাত আঁকড়ে রয়েছে।
‘আমি যাব তোমার সঙ্গে।’ বাবার দিকে ভীত দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে।
‘নিশ্চয় যাবে।’ দেবী আশ্বস্ত করল।
বাবাইকে কোলে তুলে নিয়ে, সলিলের দিকে কড়াদৃষ্টি হেনে দেবী সিঁড়ির দরজার দিকে উদ্ধত পায়ে এগোল। বিস্মিত অপ্রতিভ চোখে সলিল তাকিয়ে রইল। জানলায় দাঁড়িয়ে শিবপ্রসাদ আর ব্রতীন।
শিবু বলল, ‘বড়দা দেবীটা আর বদলাল না।’
‘দরকার কী বদলাবার, ঠিকই তো আছে।’
‘ঠিক থাকলে ডিভোর্সটা আর করত না। অপেক্ষা করে থাকলে দেখত ঘরের ছেলে ঠিক ঘরে ফিরে এসেছে।’
‘তাতে দেবীর আত্মামর্যাদা কতটা থাকত?’
সলিল ঘরে ঢুকল। শিবুকে আর জবাব দেবার দায় নিতে হল না। ব্রতীন বলল, ‘ওই হল তোর পেশেন্ট, একবার দেখে দে। শিবু ডেকে আন তো দেবীকে।’
একতলা ফ্ল্যাট থেকে দোতলায় ওঠার সিঁড়িতে যাওয়া যায় একটা দরজা খুললেই। দরজাটা বেশিরভাগ সময় বন্ধই থাকে। আজ সেটা খোলা।
কয়েক মিনিট পর শিবু নেমে এল সঙ্গে দেবী, ময়ূরকণ্ঠী রঙের সিল্কের শাড়ি পরনে, ব্রতীন ও সলিল অবাক হল ওর কাঁখে গলা জড়িয়ে থাকা বাবাইকে দেখে।
‘তোর কোমরে ব্যথা না!’ ব্রতীন বলল।
‘কী করব ছাড়ল না। যা ভয় পেয়েছে।’ দেবী চোখ কুঁচকে সলিলকে দেখে নিয়ে বলল, ‘কোথায় দেখবেন, ওই ঘরে?’
‘হ্যাঁ চলুন।’ সলিলের গলা থমথমে।
