‘আমিও তো তখন তাই ভাবলুম, বাপের বাড়িতে মেয়ে দুটোদিন বেশি তো থাকতেই পারে। সদ্য বিয়ে হওয়া হলে নয় কথা ছিল, তাতো নয়। শুনেছি লোকটা খিটখিটে মেজাজের। হয়তো এই নিয়ে অনেক কথা শোনাবে বাসুদিকে।’
‘যাক গে, তুই তৈরি হয়ে নে। রাত্রে টেলিফোন করে জেনে নিস, কী হল।’
দশটার সময় ওরা দুজন বাড়ি থেকে বেরোল। ট্যাক্সি ধরতে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে দাঁড়াল। দেবীই ব্রতীনকে দেখাল, ‘ওই দেখো বড়দা, বাসুদিরাও দাঁড়িয়ে ট্যাক্সির জন্য।’
তাদের উলটোদিকে রাস্তার ওপারে বাসন্তীর পাশে শীর্ণকায়, ট্রাউজার্স হাওয়াই শার্ট পরা টাকমাথা একটি লোক দাঁড়িয়ে। লোকটি দূরে তাকিয়ে খালি ট্যাক্সি আসছে কি না দেখছে। দেবী হাত তুলে বাসন্তীর উদ্দেশে নাড়ল। না দেখার ভান করে বাসন্তী মুখ ঘুরিয়ে নিল। দেবী আবার হাত তুলল।
‘থাক দেবী। বাসু দেখেছে আমাদের।’
একটি ট্যাক্সি বাসুদেব সামনে থামল। লোকটি ঝুঁকে ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে পিছনের দরজা খুলে বাসন্তীকে উঠতে বলল। ট্যাক্সি ছাড়ামাত্র বাসন্তী জানলা দিয়ে তাদের দিকে তাকাল। দু-তিন সেকেন্ডের জন্য বাসন্তীর চোখ দুটো তার চোখ ঘষে দিয়ে চলে গেল। ব্রতীন চোখে হাত রাখল, জ্বালা করছে। তখনই দেবী বলে উঠল, ‘বড়দা খালি ট্যাক্সি আসছে, ধরো ধরো।’
সল্টলেক উপনগরীতে ব্রতীন আগে দু-বার এসেছে। এক অধ্যাপকের আর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহপাঠীর বাড়িতে। বাসে এসেছিল। কত নম্বর ট্যাক স্টপে যেন নেমেছিল আজ আর তা মনে নেই। শুধু মনে আছে বি ডি মার্কেট নামটা। আর একটা নাম মনে আছে লালকুঠি। আজ যা দেখছে তাতেই সে অবাক হচ্ছে। দশ-বারো বছরেই এত বাড়ি আর দোকান হয়ে গেছে! বহু বাড়িই দেখতে সুন্দর। একটা জায়গায় বড়ো বড়ো কয়েকটা বাড়ি দেখে সে দেবীকে জিজ্ঞাসা করল, ‘এগুলো কীসের বাড়ি রে?’
‘সরকারি অফিস। সেচ ভবন, বিদ্যুৎ ভবন, ময়ূখ ভবন, পূর্ত ভবন, বিকাশ ভবন নাম শুনেই বুঝতে পারছ কী কাজ হয় এইসব বাড়িতে।’ দেবী বহুবার এসেছে সল্টলেকে, এখানকার সোজা সোজা রাস্তার অনেকগুলোই তার চেনা।
‘আমাকে যদি ঠিকানা দিয়ে খোঁজার জন্য এখানে ছেড়ে দিস তা হলে আমি ঘুরপাক খেয়ে মরব। কিন্তু দর্জিপাড়া কি কুমোরটুলিতে ছেড়ে দিলে কাউকে জিজ্ঞেস না করে ঠিক বাড়ি বার করে নোব। কলকাতার রাস্তাগুলোর আলাদা আলাদা চরিত্র আছে এখানে সবই একরকম।’
দেবীর নির্দেশমতো ট্যাক্সি পৌঁছোল ডি এল ব্লকে একটা পাঁচিল ঘেরা দোতলা বাড়ির লোহার ফটকের সামনে। বাড়ির সামনে একটা নোংরা জলের খাল, ফটকের পাশে নেমপ্লেটে ইংরেজিতে লেখা : ডা. সলিল সরকার এফ আর সি এস (ইঙ্গ), এফ আর সি এস (এডিন)। ফটকটা খোলাই রয়েছে। ফটক দিয়ে ঢুকে সিমেন্ট বাঁধানো পথ ধরে সোজা গেলেই গ্যারাজ, একটা নীল মারুতি গ্যারাজের সামনে দোতলায় যাবার সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে। দোতলায় রয়েছে শিবপ্রসাদ আর প্রমিতা।
ফটকের ডানদিকে বড়ো একটা উঠোনের মাপের ফাঁকা জায়গা। কয়েকটি ফুলগাছ আর একটা দোতলার উচ্চচতার দেবদারু গাছ। ঢাকা একটা চাতাল সেটা দিয়ে সলিলের ফ্ল্যাটে যেতে হয়। চাতালের লাগোয়া দুটো দরজা। তার একটি দিয়ে ঢুকতে হয় রোগী দেখার চেম্বারে অন্যটি তার ব্যক্তিগত বসার ঘরের।
ফটক দিয়ে ঢুকতেই দেবীর চোখ পড়ল দেবদারু গাছের পাশে একটা বছর চারেকের বাচ্চচা ছেলের উপর। হাতে ছোট্ট ক্রিকেট ব্যাট।
তাকে রবারের বল ছুড়ে দিচ্ছে পাজামা আর শার্ট পরা তিরিশ-বত্রিশ বছর বয়সি একটি লোক। লোকটি জোরে বল ছুড়ল, ছেলেটি ব্যাট চালিয়ে ফসকাল। দেবী দাঁড়িয়ে পড়ল।
‘অত জোরে দেবে না, আস্তে তুলে উঁচু করে দাও।’ ছেলেটি বলল।
‘বড়দা ছেলেটা কে?’
‘সলিলের ছেলে, ওর মা মারাঠি মেয়ে, মোটর অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে মুম্বইয়ে। তখন ওর একবছর বয়স। মাসি ওকে নিয়ে গিয়ে রাখে। সলিল মুম্বাইয়ে থাকত, বউ মারা যেতে কলকাতায় চলে আসে। আমিই শিবুকে বলে এখানে ওঁর থাকার ব্যবস্থা করে দিই।’
লোকটি এবার খুব উঁচু করে বল দিল, ছেলেটি মুখ উঁচু করে ব্যাট তুলল। বলটা তার মাথার পিছনে পড়ল ব্যাটটা চালাবার পর। ছেলেটি রেগে ব্যাট ছুড়ে ফেলে দিল। এর আগে বোধহয় অনেকবার বল ফসকেছে।
‘বল করার কী ছিরি। বাচ্চচাদের কী করে বল করতে হয় তাও জানে না।’ দেবী ক্ষোভের সঙ্গে মন্তব্য করল, ‘লোকটা কে?’
‘বোধহয় সলিলের চাকর। চল ভেতরে। তুই ওপরে যা আমি সলিলের সঙ্গে একটু কথা বলে নিই।’
চেম্বারে রোগী পরীক্ষার টেবলে একটি লোক শুয়ে, সলিল তার ব্লাডপ্রেশার মাপছে। ব্রতীনকে দেখে সে বলল, ‘বতুদা তুমি পাশের ঘরে বোসো আমি এখুনি আসছি।’
মিনিট পাঁচেক পর সলিল বসার ঘরে এল। ব্রতীন খবরের কাগজটা রেখে দিয়ে বলল, ‘তোর তো রুগি-টুগি দেখছি না, চলে কী করে? হাসপাতালেও চাকরি করিস না!’
সলিল একগাল হেসে বলল, ‘চলে যায়। দুটো নার্সিংহোমে অপারেশন, সন্ধ্যেয় দুটো জায়গায় বসি। বাড়িতে দু-চারটে রুগি আসে পথ ভুলে। অনেকে তো জায়গাটা চেনেই না, একদিক দিয়ে ভালো। সকালটা শান্তিতে কাটানো যায়।’
‘ছেলেকে দেখে কে?’
‘ভগবান, একটা নয় দুটো ভগবান, পার্বতী আর অমিত। একজন দেখে রান্নাবান্না ঘর সংসার অন্যজন বাইরের সবকিছু।’
