‘আপনি ফিরে এলেন কেন?’ যা দেখাতে চেয়েছেন তা দেখানো হয়েছে বলে?’
‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। তা ছাড়া আমার মনে হয়েছিল বিয়ে যখন করেছি তখন আমারও একটা দায়িত্ব আছে স্বামী সম্পর্কে। আমি ওকে বুঝিয়েছি কেউ তোমাকে দেখে মনে মনে হাসে না, পৃথিবীতে কয়েক কোটি মানুষ আছে যারা তোমার থেকেও কম হাইটের। আমি তো জেনেশুনেই বিয়েতে রাজি হয়েছি। শান্তিনিকেতন থেকে ওই আমায় ফিরিয়ে আনে। আমি ওকে নিয়ে সিনেমায় গেছি, দোকান বাজার করেছি, বিয়েবাড়ি গেছি। ওকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছি কেউ হাসেনি। ও বলত সামনে হাসছে না কিন্তু মনে মনে তো হাসছে। কী বিপদ দেখুন, মনে মনে তো বহু ব্যাপারেই মানুষ হাসে। ঢ্যাঙা লোকের পাশে বেঁটে বউ আকছার দেখতে পাবেন। তাই নিয়ে হাসতে কার দায় পড়েছে?’
‘আপনার চলে যাওয়াটা বোধহয় ওকে প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়েছিল।’
‘একদম ভেঙে পড়েছিল, দেখে মায়া হয়েছিল। যাই দেখি, সুচিত্রা কী তালগোল পাকাচ্ছে।’ রঞ্জনা উঠে দাঁড়াল হাসিমুখে। ‘লুচিতে আপত্তি নেই তো? বন্ধু নেই বলে আতিথেয়তার অযত্ন হল বলতে দেব না।’
‘না না লুচিতে বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই সঙ্গে যদি বেগুনভাজা পাই।’
‘পাবেন।’
ঘর থেকে রঞ্জনা বেরিয়ে গেল। ব্রতীন ভাবতে শুরু করল রঞ্জনার কথাগুলো। অনেক কথা জমেছিল বলার মতো লোক পাচ্ছিল না। চিন্তাটা সে নিজের দিকে ঘোরাল। কী এমন তার মধ্যে মেয়েরা দেখতে পায় যেজন্য গলগল করে মনের কথা বলে ফেলে। খুব ভালোমানুষ? হৃদয়বান? বন্ধুর মতো?
সুচিত্রা এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি আর এক কাপ চা খাবেন?’
‘খুব ভালো চা করেছিলে, শিখলে কোথায়?’
‘বউদির কাছে।’
‘থাকো কোথায়?’
‘গোলাপবাগানে। দিনের বেলায় এখানে থাকি।’
সোজা হয়ে বসল ব্রতীন। ‘ওখানে নিমি বলে একটা মেয়ে থাকে, তাকে চেনো?’
সুচিত্রা অবাক হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। ইতস্তত করে বলল, ‘চিনি।’
‘ওর মা আছে, বুড়ি নাম।’
‘আপনি ওদের চিনলেন কী করে?’
‘তিরিশ বছর আগে বুড়িকে চিনতুম তখন ও তোমার বয়সি ছিল।’
‘নিমি তো খারাপ হয়ে গেছে।’
‘তুমি জানো?’
‘বস্তির সবাই জানে।’
ব্রতীন সিঁটিয়ে উঠল। একে আর কোনো প্রশ্ন নয়।
‘এবার চা নিয়ে এসো, চিনি ছাড়া।’
সুচিত্রা রান্নাঘরে গিয়ে নিশ্চয় রঞ্জনাকে বলবে, যে লোকটা এসেছে সে তাদের বস্তির একটা মেয়ের কথা তাকে জিজ্ঞাসা করেছে। কী অস্বস্তিতে পড়া গেল, না জিজ্ঞেস করলেই হত। ব্রতীন চলে যাবার জন্য মনে মনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বলার বউয়ের কথা তো শোনা হয়ে গেছে এবার যত তাড়াতাড়ি বেরোনো যায়।
চা নিয়ে এল রঞ্জনা। ব্রতীন নজর করল ওর মুখভাব। কোনো ভাবান্তর চোখে পড়ল না। সুচিত্রা বোধহয় এখনও কিছু বলেনি হয়তো পরে বলবে। রঞ্জনা তাকে জিজ্ঞাসা করল বাড়ির কথা, কাজের কথা, মুম্বইয়ের কথা। সে যথাসম্ভব উত্তর দিয়ে গেল সংক্ষেপে। তার মাথায় ঘুরছে, ‘নিমি তো খারাপ হয়ে গেছে; বস্তির সবাই জানে।’ কথাগুলো বলার সময় সুচিত্রার মুখে কিছু ফুটে উঠেছিল কি? কোনোরকম অবাক হওয়ার চিহ্ন? তন্নতন্ন করে সে ওর মুখটা মনে ফুটিয়ে তুলতে লাগল।
রঞ্জনা উঠে ভিতরে গেল। ফিরে এল রেকাবি ভরতি ফুলকো লুচি, বেগুনভাজা আর একটা প্লেটে সন্দেশ নিয়ে।
‘একে ডায়বিটিস সন্দেশ বলে, চিনি ছাড়া, স্যাকারিনে তৈরি। আমাদের পাড়ায় একটা দোকানই করে। খেয়ে দেখুন।’
‘তা খাচ্ছি কিন্তু লুচি অর্ধেক করুন।’
‘মাত্র ছ-টা, খুব পারবেন।’
গলার স্বরে ব্রতীন বুঝল সবকটা তাকে খেতেই হবে। সে আর অনুরোধে গেল না, খেতে শুরু করে দিল। দশ মিনিটেই শেষ করে দিল রেকাবি।
দুই গ্রাসে দুটো সন্দেশ শেষ করে, হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়াল, ঘড়ি দেখল।
‘সাতটায় একজনের বাড়িতে আসার কথা আছে, আমি এবার যাব। খুব ভালো লাগল আলাপ হয়ে। বলাটা থাকলে ভালো হত। আপনার কথা অনেকদিন মনে টাটকা হয়ে থাকবে। আমি ভাবতেই পারিনি ও এমন ভাগ্য করে এসেছে, এত ভালো বউ পাবে।’
‘আমিও ভাবনি ওর এত ভালো খাইয়ে বন্ধু আছে। আবার কলকাতায় এলে অতি অবশ্য আসবেন কিন্তু।’
সামান্য একটা মিথ্যা বলতে হল, সাতটায় কারোরই আসার কথা নেই। সে যে নিমিকে পাঁজাকোলা করে গোলাপবাগানের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে এ খবরটা কি সুচিত্রা জানতে পারবে! জানলে রঞ্জনাকে পরে বলবে। বাড়ি ফেরার সময় ব্রতীন শুধু এই কথাটা নিয়েই ভাবল, রঞ্জনা মনে মনে কী ধারণা করবে তার সম্পর্কে!
রবিবার সকালে ব্রতীন দেবীকে বলল, ‘কমলের মাকে একবার বাসুদের বাড়িতে পাঠা, ওকে মনে করিয়ে দিয়ে আসুক ঠিক দশটায় আমরা বেরোব।’
কমলের মা গেল এবং ফিরে এসে বলল, ‘বাসুদি যেতে পারবে না। বলল ওকে নিয়ে যেতে ওর সোয়ামি এসেছে। এখুনি সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। দেখলুম টাকমাথা একটা লোক ঘরে বসে বাসুদির মায়ের সঙ্গে কথা বলছে।’
শুনেই দেবী মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘সর্বনাশ করেছে বড়দা। বাসুদি ফোনে সেদিন বলল, মা পড়ে গিয়ে কোমরে চোট পেয়েছে এক্স রে হয়েছে তাই সোমবারের আগে যেতে পারবে না। এখন জামাইবাবু নিজের চোখ দেখলেন পুরোটাই মিথ্যে। বাসুদি বোধহয় ভাবতে পারেনি জামাইবাবু এসে হাজির হবে শাশুড়িকে দেখতে।’
ব্রতীনের মুখ শুকিয়ে গেল। সন্দেহবাতিকগ্রস্ত লোক। বউকে বিশ্বাস করে না। সে যদি জোর করে রবিবার পর্যন্ত থাকতে না বলত তা হলে বাসুকে এই বিপদের সামনে পড়তে হত না। ভারাক্রান্ত গলায় সে বলল, ‘শাশুড়িকে দেখতে এসেছে কি না জানি না তবে বাসুর কপালে দুখ্যু আছে। এভাবে মিথ্যা কথা কেন যে বলতে গেল!’
