‘আমি ব্রতীন। আপনি নিশ্চয় রঞ্জনা।’
‘হ্যাঁ। একেবারে কাঁটায় কাঁটায় আধঘণ্টার মাথায় এলেন। ভেতরে আসুন।’
বোধহয় দু-বার সে এই বাড়িতে এসেছে। ব্রতীনের মনে হল ডানদিকে একটা বৈঠকখানায় সে বসেছিল। আর বাঁদিকে উপরে যাবার খোলা সিঁড়ি ছিল, এখনকার মতো দরজা ফুটিয়ে শেকল তুলে দেওয়া ছিল না। দোতলায় বোধহয় সহদেব থাকে, বাড়ি যে ভাগ হয়ে গেছে সেটা বোঝা যায় উঠোনের মাঝে পাঁচিলটা দেখে।
‘কাঁটায় কাঁটায় পৌঁছোবার জন্য মিনিট চারেক রাস্তায় ঘোরাঘুরি করেছি চানা খেতে খেতে।’ ব্রতীন হাতের ঠোঙাটা দেখিয়ে বলল, ‘খাবেন নাকি?’
‘চানাভাজা আমার ভালো লাগে না।’ হেসে প্রত্যাখ্যান করল রঞ্জনা।
সেই বৈঠকখানা ঘরটা এখন শোবার ঘর। সেইখানেই ব্রতীন বসল একটা চেয়ারে। মুখোমুখি খাটে পা ঝুলিয়ে বসল রঞ্জনা। সালোয়ার কামিজ পরা এক কিশোরী ঘরে ছিল। রঞ্জনা তাকে বলল, ‘সুচিত্রা চায়ের জল বসা।’ মেয়েটি বেরিয়ে গেল। ‘কী প্রশংসা আপনার, চেহারা নাকি একটুও বদলায়নি!’
‘বলেনি, একটুও ভুঁড়ি হয়নি! আজ দু-বার কথাটা শুনতে হয়েছে।’
‘তৃতীয়বার শোনার সুযোগ নেই কারণ তিরিশ বছর আগে আপনাকে আমি দেখিনি।’ বলে হাসল। ব্রতীনের চোখে পড়ল পানের ছোপধরা দাঁত।
‘আপনাদের বিয়ে কতদিন হয়েছে? পুত্রকন্যা?’
‘তা বছর পনেরো। ছেলেমেয়ে নেই।’ রঞ্জনা হাসার চেষ্টা করল। হাসিটা বেদনা জড়ানো। ব্রতীন তা লক্ষ করল।
‘তা হলে নির্ঝঞ্ঝাটে আছেন!’
‘তা একরকম বলতে পারেন। ছেলেমেয়েকে ভালো স্কুলে ভরতি করাবার হ্যাপা পোয়াতে হয়নি, কেজি স্কুলে পৌঁছে দিয়ে দু-ঘণ্টা লোকের বাড়ির রকে বসে সময় কাটাতে হয়নি, হিন্দি সিনেমা দেখা আটকাতে টিভি পাহারা দিতে হয়নি, ছেলে নকশাল কিংবা মস্তান হবে কি না তাই নিয়ে ভয়ে ভয়ে দিন কাটাতে হয়নি। নির্ঝঞ্ঝাট বলতে তো এগুলোই বোঝায়। দোতলায় থাকে আমার দেওর আর জা, দুটি ছেলে, এখন তারা থ্রি আর ফোরে পড়ছে। ওদের দেখেই মনে হয় ভালোই হয়েছে ছেলেপুলে না হয়ে।’ রঞ্জনা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল একটু চেষ্টা করে।
‘তা হলে আমিও বেঁচে গেছি।’ ব্রতীন স্বস্তি পেল রঞ্জনার সঙ্গে একই স্তরে পৌঁছোতে পেরে। এখন সহজে কথা বলা যাবে। ‘ভালো কথা, আমি চিনি ছাড়া চা খাই কিন্তু।’
রঞ্জনা উঠে গেল ঘর থেকে। সুচিত্রাকে নির্দেশ দিয়ে ফিরে এসে বসল।
‘উনিও ডায়বিটিস হবার আতঙ্কে আছেন, বাবার ছিল। ইদানীং পাতে নুন খাওয়াটাও বন্ধ করেছেন। রেগুলার প্রেশার চেক করেন।’
‘বলা খুব খুঁতখুঁতে, সাসপিসাসও। ওর সন্দেহ হত, জানি না এখনও সেটা আছে কি না, সবাই ওর দিকে তাকাচ্ছে আর মনে মনে হাসছে।’ কথাগুলো বলেই ব্রতীনের মনে হল বউয়ের কানে এগুলো ভালো শোনাবে না।
‘কেন, ওর হাইটের জন্য?’
রঞ্জনার স্বর খুব স্বাভাবিক প্রায় কৌতুকের মতোই।
‘ঠিক ধরেছেন।’
একটা প্লাস্টিকের ট্রেতে সুচিত্রা দু-কাপ চা নিয়ে এল। ওর গায়ের রং, মুখের গড়ন এবং স্বাস্থ্য ব্রতীনকে মনে পড়াল মলিকে। মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে গেছে কি না কে জানে! চায়ে চুমুক দিয়ে বুঝল দামি চা এবং সুচিত্রা নষ্ট করে ফেলেনি।
‘বাহঃ ভালো বানিয়েছে তো।’
দাঁড়িয়ে থাকা সুচিত্রা লাজুক হয়ে উঠল প্রশংসা শুনে।
‘এই একটি কাজই ও ভালো পারে আর সব ব্যাপারেই উলটোপালটা কাজ করে। যা ময়দাটা মেখে ফেল।’ রঞ্জনার স্বরে প্রশ্রয় চোখে স্নেহ।
‘আপনার বন্ধু হাইট নিয়ে এখন আর মাথা ঘামায় না।’
‘সে কী! কবে থেকে।’
‘দশ-বারো বছর। শুনলুম আপনি আঠারো-কুড়ি বছর কলকাতা ছাড়া। ওর সঙ্গে কালই আপনার প্রথম দেখা হল তাই জানেন না।’
‘এই সন্দেহ করার বাতিকটা তা হলে গেছে। বাঁচা গেল। কিন্তু গেল কী করে?’ ব্রতীন চোখ কুঁচকে রইল উত্তরের আশায়। মনে মনে হাসল, দেখি কী বলে।
‘একবার আমি কলকাতার বাইরে যাই চাকরি নিয়ে, ওকে কিছু না বলে। ব্যস চোখে অন্ধকার দেখতে লাগল।’ রঞ্জনা হাসি চাপল মুখ নামিয়ে। ব্রতীন অবাক হয়ে ভাবল, বেশ সুন্দরী তো!
‘কতদূরে গেছলেন?’
‘বেশিদূরে নয় শান্তিনিকেতনে। কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দেখেছিলুম, এক বৃদ্ধার দেখাশোনা করার জন্য ভদ্র গরিব ঘরের নির্ঝঞ্ঝাট বয়স্কা মহিলা চাই। থাকা খাওয়া বাদে দুশো টাকা মাইনে। তখন দুশো টাকার অনেক দাম। দিলুম এক চিঠি। বয়সটা একটু বাড়িয়েই লিখলুম, আমাকে তো বয়স্কাই দেখায়। আর লিখলুম বাপের বাড়ি থাকি, স্বামী পরিত্যক্তা। উত্তর খুব তাড়াতাড়িই এল। একটা পুঁটলি নিয়ে চলে গেলুম।’
ব্রতীন ওর বলার ধরনটা লক্ষ করে গেল। স্বামীকে ছেড়ে চলে যাওয়াটা যেন কোনো ব্যাপারই নয়। জীবনের এতবড়ো ঘটনাটা ঘটাল শুধু আত্মসম্মান বজায় রাখতে। এ কাজ বাসুও তো পারত বা এখনও পারে।
‘চলে গেলুম মানে নিঃশব্দে কাউকে কিছু না বলে?’
‘ঠিক তাই। ট্রেন কখন জেনে নিয়েছিলাম। দুপুরে ও অফিসে বেরোতে কিছুক্ষণ পর আমিও বেরিয়ে যাই। চিঠি-ফিঠি লিখে যাইনি।’
‘আপনি কি আর ফিরবেন না স্থির করেই বেরিয়েছিলেন?’
‘প্রথমে তাইই ভেবেছিলুম। মাত্র মাধ্যমিক পাশ খুব সাধারণ ছাত্রী ছিলাম। কী আর কাজ পাব। তবু ঠিক করলুম নিজের পায়ে দাঁড়াব। আপনার বন্ধুকে দেখিয়ে দোব।’
‘কী দেখিয়ে দেবেন?’
রঞ্জনার স্বর কঠিন হয়ে উঠছিল। চোখে বিদ্যুৎ চমকেছে বার দুয়েক। ব্রতীনের ব্যগ্র প্রশ্নটা শুনে চুপ করে রইল, কিছুক্ষণ পর মাথা নেড়ে রঞ্জনা বলল, ‘থাক ওসব কথা। অন্যের অসাক্ষাতে তাকে নিয়ে আলোচনা করাটা ঠিক হবে না।’
