‘বউদির কাছে শুনেছি ছোড়দা ভীষণ খাচ্ছে।’
‘এদের বারণ করে লাভ নেই। উন্নতির পথ এরা দেখতে পেয়ে গেছে। এই এপিডেমিকের খপ্পরে বাসু পড়েছিল, চাকরি ছেড়ে দিয়ে বেঁচে গেছে। ওর মুখেই শুনে নিস। এখন আমি ঘুমোব, ওপরে যা। যেতে পারবি তো?’
দেবী খাট থেকে নামল একটু কুঁজো হয়ে। ধীরে ধীরে সোজা হল এবং কাঠের মতো খাড়া থেকে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আলো নিভিয়ে শুয়ে ব্রতীন চোখ কচলাল। জ্বালা করছে চোখ। একটা দিন কাটল। তার জীবনে এমনদিন আগে কখনো আসেনি। সকাল থেকে কী কী ঘটেছে মনে করতে করতে সে গভীর ঘুমের মধ্যে ঢুকে গেল।
পরদিন বিকেলে ব্রতীন ফোন করল বলদেবের বাড়িতে। ওধার থেকে স্ত্রী কণ্ঠে উত্তর এল, ‘হ্যালো।’
‘বলদেব বাড়ি আছে?’
‘উনি তো এখন অফিসে। আপনি কে বলছেন?’
বলদেব এখন বাড়ি থাকবে না জেনেই ব্রতীন ফোনটা করল।
‘আমি ওর বন্ধু ব্রতীন। আমি কার সঙ্গে কথা বলছি জানতে পারি কি?’
‘আমি ওর স্ত্রী রঞ্জনা। আপনার কথা কাল রাতে উনি অফিস থেকে ফিরেই করলেন। আপনি নাকি খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। এখন মুম্বইয়ে থাকেন, খুব বড়ো কোম্পানিতে চাকরি করেন। অনেকক্ষণ স্কুলের গল্প করেছিলেন। আপনি আসুন না আমাদের বাড়ি।’
মিষ্টি অথচ ভারী স্বর। স্বচ্ছন্দ ঝরঝরে ভঙ্গিতে অপরিচিত মহিলাটি যেভাবে কথাগুলো বললেন তাতে ব্রতীনের মনে হল স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও চিন্তা ইনি পছন্দ করেন। চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে কাজও সেইভাবে করতে পারেন অন্তত করে তো দেখিয়েছেন। একে তো একবার দেখতেই হয়।
‘যাব তো কিন্তু বলা তো বাড়ি নেই।’
‘তাতে কী হয়েছে আমি তো আছি। বন্ধুর সঙ্গে তো দেখা হয়েইছে আমাকে দেখেননি, আমিও আপনাকে দেখিনি। আলাপটা হয়ে যাক, স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আসুন এখুনি। কাছেই তো থাকেন।’
‘কাছেই থাকি, আপনার সঙ্গে আলাপটাও সেরে নিতে চাই কিন্তু স্ত্রীকে তো সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না।’
‘কেন!’ বিস্মিত হল রঞ্জনা।
‘উনি নেই।’
‘আহহ।’
শোকসূচক একটি ধ্বনি টেলিফোনের তার দিয়ে ব্রতীনের কানে পৌঁছতেই সে হেসে উঠল। ‘নেই মানে কোনো এক ভদ্রমহিলা আমার স্ত্রী হওয়ার যাতনা থেকে রক্ষা পেয়ে গেছেন। আমি বিয়েই করিনি।’
‘তিনি বেঁচে গেছেন না আপনি বেঁচে গেছেন।’ প্রশ্ন নয়, বিস্ময় নয়, সহজ বিবৃতি বেরিয়ে এল রঞ্জনার গলা দিয়ে।
কণ্ঠের প্রথম দিকের ঋজুতা এখন অনেক নমনীয় তরল হয়ে এসেছে। ব্রতীন বুঝল বলার বউ আলাপী এবং আলাপকে অনেক দূর ছড়িয়ে দিতে পারে।
‘কে বেঁচে গেছেন সেটা একটা ডিবেটের বিষয় হতে পারে তবে ফোনে নয়। আমি আধঘণ্টার মধ্যে পৌঁছোচ্ছি।’
ফোন নামিয়ে ব্রতীন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দেবীর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘বলার উৎপাতে ইনি বাড়ি সংসার ছেড়ে চলে গেছলেন। ফিরে এসে ঠিক কাজ করেছেন কি না সেটা জেনে আসি। তোকে তো বেশ ফিট মনে হচ্ছে।’
‘জায়গাটা টিপলে চিড়িক করে ওঠে।’
‘কই দেখি।’ ব্রতীন আঙুল বাড়াল দেবীর শিরদাঁড়ার নীচের দিকে।
হাতটা সরিয়ে দিয়ে ‘থাক’ বলে দেবী পিছিয়ে গেল।
ব্রতীন অপ্রতিভ মুখে তাকিয়ে রইল। বয়সে অনেক বড়ো, সম্পর্কে দাদা হলেও কোনো তরুণীর অঙ্গের কিছু কিছু জায়গা যে স্পর্শ করার পক্ষে ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ এটা তার মনে রাখা উচিত ছিল। অপ্রতিভতা কাটিয়ে উঠতে সে একটু বেশি সপ্রতিভ হল।
‘কাল বাসু বলল, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হার্ট দুর্বল হতে থাকে ব্লাডপ্রেশার আর একরকম থাকে না। কথাটার দু-রকম মানে হয়। বলতে পারিস মানে দুটো কি?’
দেবী চিন্তিত ও বিব্রত ভাব মুখে ফুটিয়ে বলল, ‘একটা তো পরিষ্কার ফিজিক্যাল মানে। বয়স হলে ভেতরের ভাইটাল অর্গ্যানগুলো ঢিলে হয়, শুকিয়ে যায়, কাজের ক্ষমতা হারায়। দ্বিতীয় মানে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে ক্ষয় মানে, আয়ুর ক্ষয় অর্থাৎ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া। মৃত্যুকে কোনো মানুষ সহজে মেনে নিতে চায় না যেহেতু বহু রকমের বাসনা মানুষের অপূর্ণ থেকে যাবেই আর তারই ফলে জীবনকে শেষবারের মতো ভোগ করে নেওয়ার একটা ইচ্ছা জাগে। বাসুদি হয়তো এই অপূর্ণতাকে পূরণ করার ইচ্ছার কথাটাই অন্যভাবে তোমায় মনে করিয়ে দিয়েছে।’
‘ওরে বাব্বা, তুই তো বেশ ভাবিস-টাবিস দেখছি। কিন্তু অপূর্ণতাটা কার, আমার না বাসুর?’
‘দুজনেরই। তোমার দিকটা তুমিই ভেবে দেখো, একবার পিছনে তাকিয়ে হিসেব নাও।’
‘নিয়ে কোনো লাভ নেই লোকসানও নেই। একসময় ভাবতুম গাওস্করের মতো ক্রিকেটার হব, হলুম না; সত্যেন বোস হব, পারলুম না;জীবনানন্দের মতো কবিতা লিখব, হল না। তার বদলে হলুম বায়োকেমিস্ট এটাই বা খারাপ কী?’
‘তুমি যে ক-জনের নাম করলে তারা কেউই আইবুড়ো থাকেননি। তুমি এদিক থেকে অন্তত ওঁদের সমান হতে পারতে।’
‘এভাবে সমান তো এ দেশে কম করে অন্তত পঞ্চাশ কোটি মেয়ে-পুরুষ, তাতে হলটা কী? বিয়ে করিনি বলে আমি অপূর্ণ রয়ে গেছি, কই কখনো তো আমার তা মনে হয়নি! তোর মনে হয়?’
‘এখনও মনে হয়নি তবে কখনো তো মনে হতেও পারে। ছেলে আর মেয়েদের মন একভাবে কাজ করে না।’ দেবী চূড়ান্ত রায় দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ব্রতীন হাতঘড়ি দেখে বলদেবের বাড়ি কখন পৌঁছোতে পারবে সেটা আন্দাজ করে নিল।
সদর দরজায় লোহার কড়ার আর কলিংবেলের বোতাম দুইই রয়েছে। অভ্যাসমতো ব্রতীন কড়া নাড়ল। দশ সেকেন্ডের মধ্যেই দরজা খুলল এক স্ত্রীলোক, বোধহয় খোলার জন্য তৈরিই ছিল। দেখতে সাধারণ, তাঁতের শাড়িটাও সাধারণ, সাদার ওপর কালো ডুরে; হাতে সোনার চুড়ি; সিঁদুর, শাঁখা ও লোহা; মাথায় আধঘোমটা। একটু আগেই স্নান করার জন্য মুখের চামড়া উজ্জ্বল। দেহ কিঞ্চিৎ স্থূল। চোখদুটিতে বালিকাসুলভ কৌতূহল এবং বুদ্ধির দীপ্তি প্রকাশ পাচ্ছে। ব্রতীনের মনে হল ইনিই রঞ্জনা।
