সিঁড়িটা মাঝামাঝি জায়গায় বাঁক নিয়ে নীচে নেমেছে। ব্রতীন একবার থমকাল, বাসন্তীও দাঁড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তের জন্য ব্রতীনের মনে হল বাসু, ঘনিষ্ঠতা চাইছে-চুমু! গাঢ় আলিঙ্গন! মলি বলেছিল, ঘরে যাবেন না? তিরিশ বছর পর তাদের প্রথম বন্ধুত্ব হল। চমৎকার এই অনুভূতি, স্থূলভাবে নষ্ট করলে এই স্বাভাবিক প্রসন্নতাটার চিরকালের মতো হারিয়ে যাবে। থাক।
বাসন্তীর বাহুধরা হাত ব্রতীন নামিয়ে নিল। বাসন্তীদের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে ব্রতীন বলল, ‘রোববার তৈরি থেকো, দশটা নাগাদ বেরোব।’
‘বতু তোমাকে কেমন যেন ক্লান্ত দেখাচ্ছে, অনেকক্ষণ ধরে দেখছি তুমি ঘামছ।’ বাসন্তী আঁচল দিয়ে ব্রতীনের কপাল, গাল মুছে দিতে লাগল।
‘সারাদিনটাই নানান অবস্থার মধ্য দিয়ে কেটেছে, একটু জুড়োবার সময় পাইনি, চরকির মতো ঘুরেছি। কলকাতায় এলেই ঘোরাঘুরি করতে ইচ্ছে করে।’
‘করুক ইচ্ছে তুমি বয়সের কথাটা মনে রাখবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হার্ট দুর্বল হতে থাকে, ব্লাডপ্রেশার আর একরকম থাকে না। এখুনি বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়ো।’ ব্রতীনের বুকে হাত রেখে বাসন্তী আলতো ঠেলা দিল। ঘরে ফিরে এসে ব্রতীন দেবীকে শুয়ে থাকতে দেখে বলল, ‘এখনও ব্যথা করছে?
দেবী ধীরে ধীরে উঠে বসল। ‘বেকায়দায় নড়াচড়া করলে চিড়িক দেয় নয়তো ঠিকই আছে। তুমি কি রাত্রে খাবে?’
‘ভাবছি উপোস দোব, খিদে নেই। আচ্ছা দেবী একটা পার্সোনাল কথা তোকে জিজ্ঞাসা করব, ঠিকঠিক জবাব দিবি।’ তীক্ষ্ন চোখে ব্রতীন খুড়তুতো বোনের দিকে তাকিয়ে রইল। দেবীর চোখে অস্বস্তি। ঢোঁক গিলে বলল, ‘কী জানতে চাও।’
ব্রতীন খাটের একধারে বসল পা ঝুলিয়ে। ‘বিয়ের তিন মাস পর আমেরিকায় পবিত্রর কাছে গেলি আর সাতদিনের মধ্যে চলে এলি। ব্যাপারটা কী?’
দেবীর মুখ থেকে উৎকণ্ঠা সরে গিয়ে হাসি ফুটল। ‘ওহ এই তোমার পার্সোনাল জিজ্ঞাসা! আমি ভাবলুম না জানি গুরুতর কিছু জানতে চাইবে।’
‘এটা গুরুতর নয়?’
‘আমার কাছে অবশ্যই কিন্তু এখন অতটা গুরুতর নয়। পবিত্র একবছর ধরে ন্যান্সি মিলার নামে একটা মেয়ের সঙ্গে রয়েছে। মেয়েটা ওর কলেজেই পড়ত, কলেজ ছেড়ে দিয়ে একটা কম্পুটার কোম্পানিতে ওয়েবসাইট ডিজাইনারের চাকরি নিয়েছে। ন্যান্সিকে দেখিনি তবে ওরা যে একসঙ্গে বসবাস করে সেটা গিয়েই বুঝেছিলাম। আমি আসব বলে ও কয়েকদিনের জন্য অন্য জায়গায় চলে যায়। পবিত্র আমাকে রিসিভ করে নিউ ইয়র্কে কেনেডি এয়ারপোর্টে। সেখান থেকে আবার দেড় ঘণ্টার ফ্লাইট। পথেই পবিত্র আমাকে খোলাখুলি ন্যান্সির সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা বলে।’
‘পবিত্রর পড়াবার বিষয় কী?’
‘ইকনমিক হিস্ট্রি। কথাবার্তা আচরণে অত্যন্ত ভদ্র, মার্জিত। বড়দা আমি যে রেগে উঠব সেটাও আর পারলুম না। ও জানত আমি কী প্রশ্ন করব। নিজে থেকেই বলল, পরিবারের চাপ থেকে মুক্তি পাবার জন্য বিয়েটা করেছে। মা আত্মহত্যা করতে গেছল বিষ খেয়ে ছেলের মেম বিয়ে করা আটকাবার জন্য। আমার বায়োডাটা দেখে পবিত্রর কেন জানি ধারণা হয়, আমি ওর অবস্থাটা বুঝব আর মাপ করে দোব তাই ঝামেলা এড়াতে বিয়েতে রাজি হয়ে যায়।’
‘মাপ মানে ডিভোর্স? তিলে খচ্চচর!’ ব্রতীন ঠোঁট বাঁকাল তাচ্ছিল্যে। ‘অন্তত দেড় লাখ টাকার গহনাই কাকাবাবু তোকে দিয়েছিলেন, সেগুলোর কী হল?’
‘সব ও ফেরত দিয়ে গেছে।’
ব্রতীন চমকে উঠল। ‘দিয়ে গেছে, মেরে দেয়নি?’
‘বিয়ের জন্য যত টাকা খরচ হয়েছে, ডিভোর্সের মামলার জন্য যত খরচ হবে, আন্দাজমতো ডলারে তিন লাখ টাকার একটা চেক আমার নামে পাঠিয়ে দেয়। প্রথমে ভেবেছিলুম নোব না পরে ভেবে দেখলুম, কেন নোব না। উনি মুক্তি পাবার জন্য বিয়ে-বিয়ে খেলা খেলবেন আর তার জন্য খেসারত দেবে আমার বাবা?’
‘কাকাবাবু যদি কলকাতার কোনো ডিটেকটিভ এজেন্সিকে দিয়ে বিয়ের আগে খোঁজ নিতেন, অনেক এজেন্সিরই বিদেশে অফিস আছে তা হলে সব খবরই পেয়ে যেতেন।’ ব্রতীন আফশোস করল। ‘উনি শুধু বাড়ির লোক, বাড়ির অবস্থা, বনেদি বংশ আর আমেরিকায় থাকে শুনেই নেচে উঠেছিলেন।’
দেবী করুণস্বরে বলল, ‘বড়দা বাবাকে তুমি কিছু বোলো না, বয়স হয়েছে, ছোড়দা একদিন যাচ্ছেতাই করে বাবাকে বলেছে সেই থেকে চুপচাপ রয়েছেন। দেখলে কষ্ট হয়।’
ব্রতীন মুখটা গোঁজ করে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হেসে উঠল। ‘তোর হাতে এখন অনেক টাকা, কী করবি টাকাগুলো নিয়ে?’
‘কী করা যায় বলো তো? একবার ভেবেছিলুম শাড়ির ব্যবসা করব, তারপর ভাবলুম কোনো পারফিউম কোম্পানির এজেন্সি নোব নয়তো হ্যান্ডিক্র্যাফটসের দোকান দেব। শুধু ভেবেই গেছি কোনোটার সম্পর্কে ছিটেফোঁটা অভিজ্ঞতাও নেই।’
‘অভিজ্ঞতা যাতে নেই তাতে নামতে যাসনি। টাকাগুলো এখন থাক। পরে ভেবেচিন্তে কিছু একটা করিস। ভালো কথা তুই তো বিয়ে করতে পারিস, করছিস না কেন?’
ব্রতীন এতক্ষণ ভূমিকা ফেঁদে এবার আসল কথায় এল।
দেবী হঠাৎ বিয়ের কথার সামনে পড়ে গিয়ে অপ্রতিভ হয়ে ইতস্তত করে বলল, ‘বিয়ে? বাসুদি একবার বলল বটে, আমি এসব নিয়ে কখনো ভেবে দেখিনি, তেমন কারোর সঙ্গে তো আলাপ-পরিচয়ও হয়নি।’
‘বাড়িতে বসে থাকলে লোকের সঙ্গে পরিচয় হবে কী করে। তবে সম্বন্ধ করে আর বিয়ে নয়। নিজে দেখেশুনে বাজিয়ে নিয়ে বিয়ে করবি। মুম্বইয়ে দু-তিনটে ভালো ছেলে চিনি কিন্তু ওদের লাইফস্টাইল দেখে ভরসা হয় না ভগ্নীপতি করতে। কে জানে কতদিন বাঁচবে। এই সেদিন ক্লাবে হরিশ মানচান্দনি নামে বছর ত্রিশের একটা ছেলে টেবলটেনিস খেলতে খেলতে ধপ করে পড়ল, তিন মিনিটের মধ্যেই মরে গেল। হজেস অ্যান্ড টেম্পলটন একটা বিদেশি ফিনান্সিয়াল ফার্ম, তার এক্সিকিউটিভ হয়েছিল হরিশ এত অল্পবয়সেই। ওপরে ওঠার জন্য উদয়াস্ত খেটেছে। রাতে ক্লাবে এসে এন্তার মদ খেয়ে বাড়ি ফিরত। ভালো স্বাস্থ্য, রোগভোগ নেই, হার্টেরও কোনোরকম ট্রাবল ছিল না। শিক্ষিত ভদ্র, ওকে আমি খুব ভালোবাসতাম। এইসব অ্যাম্বিশাস ছেলেদের সামনে ওপরে ওঠার রাস্তাটা গত দশ বছরে খুলে গেছে, কে আগে উঠবে তাই নিয়ে গোঁতাগুতি, তার সঙ্গে চাকরি রক্ষার দুশ্চিন্তা সঙ্গে ইনসোমনিয়া আর মদ খাওয়া। এদের প্রত্যেকের ভুঁড়ি হবেই হবে। বলছিলিস না আমার ভুঁড়িই হয়নি শিবুর হয়েছে। শিবুটা টাকার পেছনে দৌড়চ্ছে, নির্ঘাত ও মদ খাচ্ছে।’
