ব্রতীন বাসন্তীর প্রশ্নটা ধরে বলল, ‘হয়তো চরিত্র নিয়েই, কেননা বউকে ঘায়েল করতে স্বামীদের এটাই ব্রহ্মাস্ত্র তবে স্বামীদের মাথায় কলকবজা ঢিলে করে দিতে বউয়েরাও যথেষ্ট সাহায্য করে, অবশ্য সচেতনভাবে নয়। বলার বউ নাকি অনেক দিন সহ্য করে আর না পেরে একদিন হঠাৎ বাড়ি থেকে হাওয়া হয়ে গেল।’
‘তারপর বাপের বাড়ি গিয়ে উঠল, যা মেয়েরা করে।’ নিশ্চিত স্বরে দেবী বলল।
‘না।’
‘কোনো আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের বাড়িও যায়নি স্রেফ উবে গেল।’
‘তা হলে গেল কোথায়? কোনো ছেলের সঙ্গে-!’ দেবীর রুচিতে আটকে গেল বাকি অংশটা।
‘তা হলে গেল কোথায়? এটা বলারও প্রশ্ন ছিল আর ছিল বাড়ির লোক পাড়াপ্রতিবেশী আত্মীয়স্বজনের কাছে তার লজ্জা। বলা পুলিশেও যেতে পারছে না লোক জানাজানি হবার ভয়ে। শেষে গল্প বানাল বউ কেদারনাথ না বদরিনাথে যাবার পথে পাহাড় থেকে পিছলে খাদে পড়ে মারা গেছে।’ ব্রতীন এবার মিটিমিটি হাসতে লাগল। বাসন্তীর মুখে কোনো ভাবান্তর নেই তবে মন দিয়ে শুনছে এটা বোঝা যায় ওর মাথা কাত করে রাখা দেখে। খুব মজার একটা গল্প শুনেছ এমন ভাব দেবীর চোখে মুখে।
ব্রতীন আবার শুরু করল। ‘অনুমান করছি বউয়ের শ্রাদ্ধশান্তিও বলা করে লোক দেখিয়ে। এরপর একদিন গুণো শান্তিনিকেতনে দেখতে পেল বলার বউকে, পক্ষাঘাতে একদিকের অঙ্গ পড়ে যাওয়া বৃদ্ধাকে ধরে ধরে হাঁটছে। তার মানে নার্সই বলো আর আয়াই বলো সেবাশুশ্রূষা করার চাকরি করছে। ফিরে এসে গুণো বলাকে আড়ালে ডেকে যা দেখেছে বলল। বলা গিয়ে বউকে ফিরিয়ে আনল।’
দেবী সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘কিন্তু বউ মরে গেছে বলে যে ইতিমধ্যে গল্প রটিয়েছে!’
ব্রতীন একচোট হেসে নিয়ে বলল, ‘বলাকে কী সহজে দমানো যায়। ভাওয়াল সন্ন্যাসীর কাহিনি পড়া আছে, তা ছাড়া হিন্দি ফিল্মও যথেষ্ট দেখেছে, বলা রটিয়ে দিল একজন সন্ন্যাসী বউকে অজ্ঞান অবস্থায় কুড়িয়ে পেয়ে তুলে নিয়ে যায় তাদের আশ্রমে, শেকড়বাকড় খাইয়ে সারিয়ে তোলে কিন্তু বউয়ের মেমারি লস হয়ে কিছুই সে আর মনে করতে পারে না, তারপর হঠাৎই একদিন অতীত জীবনকে তার মনে পড়ে যায়। তারপর আর কী, বলদেব খবর পেয়ে ছুটে গিয়ে জ্যান্ত বউ নিয়ে ফিরে এল। আশ্চর্যের কথা, সবাই ওর এই গল্পটাকে বিশ্বাস করে নিয়েছে।’
দেবী বলল, ‘কিন্তু তোমার বন্ধু গুণো তো আসল ব্যাপারটা জানে, সে যদি সবাইকে বলে দেয়!’
‘দেয়নি, দেবেও না। এবার কলকাতায় এসে গুণোই আমার একটা আবিষ্কার। গুণো ঠোঁটকাটা বরাবরই, বেশিরভাগ লোকই ওকে পছন্দ করে না, দুষ্টুবুদ্ধি ওর মাথায় সবসময় ঘোরে, কিন্তু বন্ধুকে বিপদে ফেলবে লজ্জায় ফেলবে এমন কাজ ও কখনো করবে না। বন্ধুত্বের মর্যাদা যেভাবেই হোক ও রাখবেই। বলার এই কাণ্ডটা গুণো নিজের বউয়ের কাছেও গল্প করে বলেনি পাছে ফাঁস হয়ে যায়।’ কথাগুলো বলে ব্রতীন আড়চোখে টেবলে রাখা চশমা আর চাবির দিকে তাকাল। চোখে পড়লে দেবী হয়তো কৌতূহলী হয়ে কী করে ওগুলো এল জিজ্ঞাসা করবে, তা হলেই মলি-প্রসঙ্গ এসে পড়বে।
বাসন্তী বলল, ‘বলদেব, গুণো এদের মনে হয় আমি এ পাড়ায় দেখেছি, তোমার কাছে আসত। বলদেবের বউকে অবশ্য দেখিনি, তুমি দেখেছ?’
‘না, তবে দেখতে ইচ্ছে করছে। ভাবছি কাল বলার বাড়ি যাব। কার্ড দিয়েছে, টেলিফোন করে যাব।’
‘এবার আমি যাই।’ বাসন্তী খাট থেকে উঠে দাঁড়াল। পাশে বসা দেবী তার সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েই ‘আহহহ’ বলে উঠে কোমরের পিছন দিকে হাত চেপে আবার খাটে বসে পড়ল।
‘কী হল দেবী?’ বাসন্তী উৎকণ্ঠিত স্বরে বলল।
‘গত একমাস এখানে মাঝে মাঝে একটা ব্যথা হচ্ছে। হঠাৎ করে উঠতে গেলেই লাগে।’ মুখবিকৃত করে দেবী জায়গাটা আঙুল দিয়ে টিপেই আবার ‘আহহ’ করে উঠল।
‘তোর বসাটাই ছিল বিশ্রী ভঙ্গিতে। অমন কুঁজো হয়ে বসলে হাড়ে তো বাঁকাভাবে চাপ পড়বেই।’ ব্রতীন মৃদু ধমক দিল। ‘আস্তে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়া।’
দেবী সাবধানে খাট থেকে নেমে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে টান করাল দেহ। বাসন্তী বলল, ‘এখনও লাগছে?’
‘শিরদাঁড়ার এই জায়গাটা’ দেবী নিতম্বের মাঝামাঝি হাত রাখল।
‘চোট-টোট কখনো লেগেছিল?’ ব্রতীন জানতে চাইল।
‘না। চুপচাপ একভাবে শুয়ে থাকলে সেঁক দিলে আপনা থেকেই কমে যায়।’
‘রোববার শিবুর বাড়ি যাচ্ছি তো ওখানে সলিলকে দিয়ে দেখিয়ে দোব। ও হাড়ের ডাক্তার অর্থোপেডিক সার্জন। তুই এখন নড়াচড়া না করে খাটে লম্বা হয়ে শুয়ে থাক। চলো বাসু তোমাকে এগিয়ে দি।’ ব্রতীন দরজার দিকে এগোল। বাসন্তীর জন্য পরদাটা সরিয়ে অপেক্ষা করল। দেবী দেখল, বাসন্তী দরজা পার হচ্ছে যখন ব্রতীন তার কনুইয়ের কাছে হাতটা ধরল।
ব্রতীন হাতটা আলতো করে ধরে, বাসন্তীর কাছে এটা অপ্রত্যাশিত। এই মুহূর্তে বারান্দা আর সিঁড়িটা নির্জন। তার শরীর শিরশির করে উঠল। সিঁড়ি দিয়ে পাশাপাশি নামার সময় ব্রতীনের মনে হল তাদের শরীর যতটুকু ছোঁয়ার তার থেকে একটু বেশিই ছুঁয়ে যাচ্ছে। পরিবেশটা তৈরি, স্বামীর প্রতি বিতৃষ্ণ বাসু, খোলাখুলিই ঘৃণা দেখিয়েছে। এখন বাসু মানসিকভাবে দুর্বল। তিরিশ বছর আগে একবার যদি সে প্রণয়ার্থী হত তা হলে বাসু আজ সুখী জীবনযাপন করত একথা এতদিন পর বলতে গেল কেন? এই রহস্যটা রহস্যই হয়ে থাক।
