ব্রতীন জবাব না দিয়ে উঠে গিয়ে টেবল থেকে খবরের কাগজের আধখানা পাতা ছিঁড়ে এনে বাসন্তীর হাতে খানিকটা, দেবীর হাতে খানিকটা দিয়ে বলল, ‘হাতের তেলটা মুছে নাও।’ কমলের মা তখনও দাঁড়িয়ে আছে দেখে বলল, ‘যাও, বলে দাও তিনজন যাব।’ কমলের মা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
‘এটা কিন্তু জবরদস্তি। বাড়িতে বলা আছে-‘
‘বলা আছে তো কী হয়েছে, বাড়িতে ফোন আছে তো। ওপরে গিয়ে ফোন করে বলে দাও রোববার রাত্রে ফিরবে।’ ব্রতীন স্থির দৃষ্টিতে বাসন্তীর অস্বস্তিভরা চোখে চোখ রাখল। ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে উজ্জ্বলতা ফিরে এল বাসন্তীর চোখে। দেবী তা লক্ষ করে মনে মনে হাসল।
‘ফোন করতে যাবে তো বাসুদি, চলো।’
ব্রতীনের দিকে ভ্রূকুটি করে কোপ দেখিয়ে বাসন্তী বলল, ‘চল। পড়েছি মোগলের হাতে রবিবার খানা তো খেতেই হবে।’
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় দেবী বলল, ‘তোমাদের একসময় খুব ভাব ছিল মনে হল।’
‘ভাব!’ বাসন্তীর চোখ প্রায় কপালে উঠল। ‘তিন বছর প্রায় পাশাপাশি বসে উমাপদবাবুর কাছে পড়েছি, তিনটে সেন্টেন্স আমরা বলেছি কিনা মনে পড়ছে না।’
দাঁড়িয়ে পড়ল দেবী। অবাক হয়ে বলল, ‘কিন্তু দেখে মনে হচ্ছিল একটা সম্পর্ক যেন তৈরি হয়েছিল।’
‘বয়স হলে মেয়েরা একটু ফাজিল হয়ে যায়, আমার ছেলেকে দেখিসনি, লম্বায় বাপকে ছাড়িয়ে গেছে এর মধ্যেই। বয়স হলে হাসিঠাট্টার লাইসেন্স পেয়ে যায় মায়েরা। তোর বড়দাও তো আর খোকাটি নয়। চল ফোনটা সেরে ফেলি।’
বড়োঘরে ইজিচেয়ারে শুয়ে ক্ষীরোদপ্রসাদ টিভি দেখছিলেন, বাসন্তী প্রণাম করতে রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টিপে টিভি বন্ধ করে দিলেন।
‘আরে বাসু এসো। দেবী তখন বলল বটে তুমি এসেছ। কিন্তু চুল এর মধ্যেই-‘।
‘ওহহ জ্যাঠামশাই। পাকা চুলের জন্য জবাবদিহি কতবার কতজনকে যে করতে হল, আরও কতজনের কাছে যে করতে হবে! কেন কালো আকাশে ঝিকমিক করা রুপোলি তারা দেখতে খারাপ লাগে?’
‘খারাপ! বলছ কী? তোমার মুখটা আরও সুন্দর করে দিয়েছে। আছ কেমন? সতীকান্ত মারা যাবার পর আর তোমাদের খোঁজখবর রাখা হয় না। উমাপদবাবুও চলে গেলেন। এখন আমিই-‘।
‘বাবা বাসুদি একটা ফোন করবে।’ দেবী থামিয়ে দিল তার বাবার বিলাপ। একবার শুরু হলে চলবে ঘণ্টাখানেক।
টেলিফোন রয়েছে ঘরের আর একদিকে নীচু একটা টি-পয়-এর উপর। বাসন্তী ডায়াল করেই ওপ্রান্ত থেকে সাড়া পেল, নীচু গলায় সে বলল, ‘কে বাবলু, মা বলছি। শোন তোর বাবাকে বলিস রোববার সকালে যেতে পারব না। দুপুরে দিদা পিছলে পড়ে গিয়ে বোধহয় কোমরের হাড় ভেঙেছে, এক্সরে করাতে নিয়ে গেছলুম, প্লেট কাল সকালে পাব। রোববার রাতে নয়তো সোমবার সকালে যাব। ঠিক করে বুঝিয়ে বলে দিস, আমি পাশের বাড়ি থেকে ফোন করছি। রাখছি এখন।’
ফোন রেখে দেখল দেবী কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকিয়ে। বাসন্তী হেসে বলল, ‘দেখলি দিব্যি কেমন মায়ের কোমর ভেঙে দিলুম। তোর বড়দার জন্য এই পাষণ্ড কাজটা করতে হল!’
ব্রতীন ‘বাগদি ডাকাত’ আবার পড়তে শুরু করেছিল তখন দেবী আর বাসন্তী ফিরে এল।
‘বড়দা তোমার দুপুরের ভাত তোলা আছে ফ্রিজে, রাতে খাবে কি?’
‘দুপুরে বড্ড খাওয়া হয়ে গেছে এখনও খিদে পাচ্ছে না তার ওপর এতবড়ো একটা ফিশফ্রাই খেলুম, বেশ বানিয়েছে। আজ গুণোর কাছে আমাদের স্কুলের এক বন্ধু বলদেব ওরফে বলা সম্পর্কে মজার এক খবর পেলুম। বলা খবরের কাগজের চাকরি করে, বেঁটে, ফুট পাঁচেক লম্বা এ জন্যই বিয়ে হচ্ছিল না। অবশেষে বিয়ে হল, বউ ওর থেকে লম্বা আর এখানেই হল মুশকিল।’
দেবী বলে উঠল, ‘মুশকিল হত না বেঁটে মেয়ে বিয়ে করলে। পাঁচ ফুটের কম হাইটের মেয়ে তো হাজারে হাজারে পাওয়া যায়।’
‘তা যায়। হয়তো বলা তার পছন্দ অনুযায়ী মেয়েটি বেঁটেদের মধ্যে পায়নি কিংবা তেমনভাবে খোঁজখবর করেনি। যাই হোক, লম্বা বউ বাড়িতে আছে ঠিক আছে। বউকে নিয়ে বাড়ির বাইরে বেরোলে লোকেরা তাকিয়ে থাকে। এই প্রসঙ্গে একটা মজার কথা বলি, সুনীল গাওস্কর পাঁচ ফুট আড়াই ইঞ্চি এটা সবাই জানে। ইংল্যান্ডে সমারসেটে কাউন্টি ক্লাবের হয়ে একবছর খেলেছিল। ওকে রেখেছিল যে বাড়িতে সেই বাড়িতে ক্লাব রেখেছিল আরও একজন ক্রিকেটারকে, নামটা ভুলে গেছি তেমন নামি কেউ নয়। তবে তার হাইট ছিল ছ-ফুট পাঁচ ইঞ্চি। খেলার দিন দুজনকে মাঠে নিয়ে যাবার জন্য গাড়ি আসত। দুজনে একসঙ্গে বেরিয়ে গাড়িতে উঠত। গাওস্করকে একটা ম্যাগাজিন প্রশ্ন করেছিল তোমার জীবনের সবথেকে এমব্যারাসিং মুহূর্ত কোনটে? গাওস্কর উত্তরে বলেছিল ওই সময়টা, যখন আমরা দুজনে পাশাপাশি হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠতাম আর আমাদের দেখার জন্য বারান্দার জানালায় সারি দিয়ে লোক দাঁড়িয়ে থাকত।’
বাসন্তী বলল, ‘গাওস্কর খ্যাতিতে এমন উচ্চচতায় উঠেছে বলেই নিজের শরীরের উচ্চচতা নিয়ে রসিকতা করতে পারে। তোমার বন্ধুটি মোটেই মুশকিলে পড়ত না যদি রসিক হত।’
ব্রতীন বলল, ‘হতে পারেনি বলেই মুশকিল হল। বলার বাইরেটা যেমন খাটো ভেতরটাও তেমনি খাটো। ফলে হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করল আর তাই থেকেই শুরু হল বউয়ের ওপর মানসিক অত্যাচার।’
বাসন্তী দ্রুত বলল, ‘নিশ্চয় চরিত্র নিয়ে সন্দেহ।’
ব্রতীন কয়েক সেকেন্ড বাসন্তীর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। বাসু একথা কেন বলল, সেটা সে বুঝতে পেরেছে, দেবী পারেনি তাই সে হালকাসুরে বলল, ‘লম্বা হওয়ার কী জ্বালারে বাবা! পবিত্র ছ-ফুট তিন ইঞ্চি আমি পাঁচফুট দু ইঞ্চি, বাইরে ও সবসময় একটু তফাতে থাকার চেষ্টা করত দেখেছি।’ পবিত্র দেবীর প্রাক্তন স্বামী।
