‘তুমি কি বিশ্বাস করো উনি ঘুষ নিয়েছেন?’
‘এখন বিশ্বাস করি। লোকটা সৎ ছিল, পরিবারের আর সামাজিক সম্মান রক্ষার চাপে পড়ে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারেনি। বতু উনি ইকনমিক্সের এম এ, ভাবতে পারো!’
‘আত্মহত্যার চিন্তাটা কি এখনও তোমার আছে?’
‘না’।
পরদার ওধার থেকে দেবীর গলা শোনা গেল। ‘পরদাটা একটু সরাও না বাসুদি।’
বাসন্তী উঠে গিয়ে পরদা সরিয়ে ধরতে চায়ের ট্রে হাতে দেবী ঘরে ঢুকল। ‘কমলের মাকে বাবা ফিশফ্রাই কিনতে পাঠিয়েছে আমাকেই চা করতে হল, দাদার তো চিনি ছাড়া, এই কাপটা তোমার।’ দেবী সোনালি ঘের দেওয়া একটা কাপ থুতনি তুলে দেখাল, ব্রতীন তুলে নিল।
‘ডায়াবেটিসের ভয়? বতু বরাবরই স্বাস্থ্য সচেতন।’ বাসন্তী চায়ে চুমুক দিয়ে বলল।
‘বরাবর?’ ব্রতীন চোখ কুঁচকে তাকাল।
‘তখন সাধন নামে একজন চাকর ছিল। তুমি খাবার জল চাইলে, জলের গ্লাস হাতে দেবার সময় সাধন কথা বলেছিল, তুমি সেই জল না খেয়ে ফেলে দিয়েছিলে, মনে আছে?’
‘বাব্বা, বাসুদির স্মৃতিশক্তিও দেখছি কম নয়।’
বাসন্তী বলল, ‘দেবী, অনেক কথা অনেক ব্যাপার ভুলে যায় মানুষের কিন্তু খুব তুচ্ছ ছোটোখাটো ব্যাপার চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর পরও মনে থেকে যায়।’
‘ঠিক কথা, আজ স্কুলে যাবার সময় পথে অনেক কথা মনে পড়ছিল বিশেষ করে একটা মেয়ের কথা।’ ব্রতীন লক্ষ করল দেবী আর বাসন্তী উৎসুক চোখে তার দিকে তাকাল। সে হেসে ফেলল। ‘যা ভাবছ তা নয়। মেয়েটা হাতে করে একটা চন্দনা পাখিকে ছোলা খাওয়াত রোজ আমার স্কুলে যাবার সময়।’ তার বলতে ইচ্ছে হল আজ সেই মেয়েটার সঙ্গেই তার দেখা হয়ে গেল অদ্ভুত একটা পরিস্থিতিতে। কিন্তু সেকথা এদের বলল না। বললে অনেক কিছুই বলতে হবে, বুড়ি, নিমি, গুণো এরা এসে যাবে কথার মধ্যে।
সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ। দেবী বলল, ‘কমলের মা, ফিশফ্রাই এল। বাসুদি খাবে তো? মলয় কেবিনের!’
‘খাব। বতু, তুমি তো খুব চিংড়ির কাটলেট খেতে মলয় কেবিনে লুকিয়ে লুকিয়ে, মনে আছে? জানিস দেবী, তখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি, কলেজের এক বান্ধবীকে নিয়ে মলয় কেবিনে ঢুকেছি চা খেতে। দেখি কোণের টেবলে বাবু কাটলেট সাঁটাচ্ছেন দরজার দিকে পিছন ফিরে বসে। কাটলেটটা শেষ হতেই আর একটা কাটলেট এল। পরপর দুটো! চা খেয়ে বেরিয়ে এলুম তাই আর তৃতীয়টা খাওয়া দেখা হল না।’
‘খেলে সাধ মিটিয়ে খাওয়া উচিত, সত্যিই ওদের চিংড়ির কাটলেটের তুলনা হয় না কিন্তু বাসু লুকিয়ে লুকিয়ে বললে কেন?’
‘যেভাবে দেওয়ালের দিকে মুখ করে কোণে বসে খাচ্ছিলে তাই তো মনে হয়েছিল পাছে কেউ দেখে ফেলে!’
‘চোখ আর মন জগৎ থেকে সরিয়ে নিয়ে খাদ্যে গেঁথে না দিলে ভালো খাবারের স্বাদ ঠিকমতো পাওয়া যায় না, একই কথা মেয়েদের সৌন্দর্যের স্বাদ পাওয়ার ব্যাপারেও খাটে। তোমরা যে আমার পিছনের টেবলে বসে চা খাচ্ছিলে সেটা কিন্তু আমি তোমার গলার আওয়াজেই জেনে গেছলুম, চায়ের দামটা যে তোমার বান্ধবীই দিয়েছিল সেটা দেখেছি। তখন যদি একবার বলতে ‘আরে বতু নাকি! কী খাচ্ছ, কাটলেট?’ তাহলেই তোমাদের দুজনকে কাটলেট খাওয়াতুম।’
‘ইসস তোমার মনের ইচ্ছাটা তখন যদি জানতুম তাহলে কাটলেট মিস করতুম না। আসলে মানসিক জড়তা তখন আমার ভীষণভাবে ছিল এজন্য অনেক কিছু মিস করতে হয়েছে।’ কথাগুলো বলে বাসন্তী হাসল। ব্রতীন কথার এবং হাসির অর্থ যে ধরতে পেরেছে সেটা বোঝাতে চোখ বন্ধ করে মাথা নেড়ে বলল, ‘মিস আমিও করেছি, দুটি মেয়েকে খাওয়ানোর সুযোগ।’
পিঠ দিয়ে পরদা সরিয়ে ঘরে ঢুকল কমলের মা হাতে ট্রে। তিনটি প্লেটে ফিশফ্রাই। ব্রতীন বলল, ‘কাকাবাবুর জন্য আছে তো?’
‘আছে। পাঁচটা এনেছি, উনি দুটো খাবেন।’ কমলের মা হাসল। ‘দুটোর কম উনি খান না।’
শুনে আশ্বস্ত হল ব্রতীন। ক্ষীরোদপ্রসাদ কৈশোর থেকে হোটেল রেস্তোরাঁয় খাওয়ার ভক্ত। অনেকবার তিনি ন-কাকার গল্প করেছেন, তাকে ধরে পার্ক স্ট্রিটে চিনা রেস্তোরাঁ পিপিংয়ে যাওয়া, ছ আনায় বড়ো বড়ো দুটো চিংড়ির কাটলেট, আট আনায় ইয়া বড়ো শুয়োরের মাংসের পোর্ক চপ। সে সব স্বাধীনতার আগের আমলের কথা। তিনভাই মিলে রেস্তোরাঁটা চালাত। দু-ভাই ওয়েটার একভাই কাউন্টারে, তিনবউ রান্নাঘরে। ছেলেমেয়েরা বাসনকোসন ধোয় টেবল গোছায়। সবারই হাসিখুশি মুখ।
‘কাকাবাবুর ধাত আমি খানিকটা পেয়েছি। বাসু তো নিজের চোখেই দেখেছে মলয় কেবিনে। আজ স্কুলের পুরনো বন্ধু গুণোর সঙ্গে দেখা হল, ধরে নিয়ে গেল ট্যাংরায় চিনে রেস্তোরাঁয়। প্রচুর বাগদা চিংড়ি খেলুম।’
‘ভাগ্যবান তুমি।’ ফিশফ্রাইয়ের টুকরো মুখে ঢুকিয়ে বাসন্তী বলল, ‘বাগদা চিংড়ি কী জিনিস ভুলেই গেছি। বাজারে যেদিন আসে, তিনশো সাড়ে তিনশো টাকা কিলো তাও খুব বড়ো সাইজের নয়। ফিশটা মনে হচ্ছে ভেটকিই। শোল মাছ নয়।’
তিনতলা থেকে কমলের মা নেমে এসে বলল, ‘সল্ট লেক থেকে বউদি ফোন করেছে, আপনি রোববার যাচ্ছেন তো? জানতে চাইছে।’
‘বলে দাও তিনজন যাচ্ছি- আমি, দেবী আর বাসন্তীদিদি।’
যাবার কথা দুজনের, ব্রতীন যোগ করে দিল বাসন্তীকেও। চোখ বড়ো করে বাসন্তী বলল, ‘সে কী, আমি আবার কেন! আমি তো রোববার সকালেই সরকারহাট চলে যাব। না না আমাকে বাদ দাও, আমি তো ওদের কাছে একেবারেই অচেনা।’
