শুনে ব্রতীন বিষণ্ণ হয়ে পড়ল। যে ক-জন মানুষকে সে শ্রদ্ধা করেছে তার মধ্যে সে রেখেছে এই গৃহশিক্ষককে। সাদাসিধে জীবন, সততা, ঠান্ডা স্বভাব। সে যতদূর সম্ভব অনুসরণ করার চেষ্টা করে উমাপদবাবুকে। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্রতীন বলল, ‘তোমার হার্ট এখন কেমন অবস্থায়?’
‘ভালো। আর কোনো গণ্ডগোল করেনি।’
‘বলেছিলে তোমার স্বামীর কিডনির অসুখ শুরু হয়েছিল, এখন কেমন আছেন?’
বাসন্তী ইতস্তত করে নিরুত্তর রইল। ব্রতীন উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে দেখে বলল, ‘ভালো আছেন তবে বিনা অসুখে মানুষ কতদিন আর থাকতে পারে। কিডনি থেকে অসুখটা এখন মনে।’
‘তার মানে!’
‘সব কিছুতেই ওর সন্দেহ, এমনকী আমাকেও সন্দেহ করেন।’
‘কী সন্দেহ?’ ব্রতীন কৌতূহল চাপতে পারল না। বলরামের কথা মনে পড়ল। বউকে মেন্টাল টর্চার করত আর সেটা তো স্বামীরা একই কায়দায় করে-চরিত্র নিয়ে সন্দেহ। বাসুকে আর কোনো প্রশ্ন করা ঠিক হবে কি না ব্রতীন বুঝে উঠতে পারছে না। বাসন্তী থমথমে মুখে মেঝের দিকে তাকিয়ে। অস্বস্তিকর অবস্থা। ব্রতীনের মনে হল বাসুর মধ্যে অনেক কথা জমে রয়েছে সেগুলো শোনাবার মতো এমন একটা লোক পেয়েছে যে তাকে চেনে জানে এবং যার সঙ্গে আর কবে দেখা হবে সে জানে না।
‘বাসু মনে হচ্ছে তুমি কিছু বলতে চাও।’ নরম স্বরে ব্রতীন এমনভাবে বলল যাতে ইঙ্গিত রয়েছে, ‘তুমি বলতে পারো আমি শুনব।’
‘চাই। কাউকে আমায় বলতে হবে নয়তো আমি পাগল হয়ে যাব বতু। এই বয়সে এমন সব কথা শুনতে হয় তাও ছেলের সামনে যে সামনের বছর হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবে, মনে হয় তখন আত্মহত্যা করি।’
বাসন্তী উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। সেটা চাপার চেষ্টায় স্বর নামিয়ে কথা বলার জন্য গলা কর্কশ শোনাল। ব্রতীন ওর মুখের দিকে অপলকে তাকিয়ে। তার দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল যা দেখে বাসন্তী ‘আত্মহত্যা করি’ বলেই থমকে গেল।
‘কী দেখছ বতু?’
‘তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।’
‘একথাটা তিরিশ বছর আগে বলনি কেন?’ বাসন্তীর স্বর কঠিন।
‘বললে কী হত?’ ব্রতীনের স্বরে চাপল্য।
‘তা হলে আজ আমাকে এই দুর্দশায় পড়তে হত না।’
‘তুমি কী নিশ্চিত দুর্দশায় পড়তে না?’
বাসন্তীকে থতমত দেখাল। কিছু না ভেবেই সে বলল, ‘না পড়তুম না, তুমি অন্য ধাতুতে গড়া।’
‘তিরিশ বছর আগে তোমাকে প্রণয় নিবেদন করলে তুমি তা গ্রহণ করতে, আজ আমরা তা হলে স্বামী-স্ত্রী হতুম, তোমার জীবন অন্যরকম হত। এই বোধটা এখন তোমার মধ্যে উদয় হল। আমি কিন্তু ইতিমধ্যে বিয়ে করে ছেলেমেয়ের সুখী বাবা হয়ে যেতে পারতুম, তখনও কী তুমি আমার সম্পর্কে এমনভাবে ভাবতে পারতে?’
‘হ্যাঁ পারতুম।’ জেদি গলায় ঘাড় বেঁকিয়ে বাসন্তী তাকিয়ে রইল ব্রতীনের মুখের দিকে।
এবার ব্রতীনকে থতমত দেখাল, বাসু কেমন যেন বেপরোয়া হয়ে গেছে তার মানে ভীষণভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছে স্বামীর বিরুদ্ধে, বিবাহিত জীবনকে ধিক্কার দিয়ে। রক্ত ছুটে এসেছে মুখে, উজ্জ্বল তপ্ত দেখাচ্ছে সারা মুখ, ব্রতীনের মনে হল বাসু যেন সেই পনেরো বছর বয়সের কিশোরী। বই খাতা গুছিয়ে হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরোবার আগে একবার আড়চোখে তাকানো মেয়েটি। ওকে আর একটু ঘাঁটিয়ে দেখা দরকার। দরকার এইজন্য, এখন রীতিমতো একটা টান বাসুর জন্য সে অনুভব করে চলেছে। ওর রুপালি চুলগুলো তার সারা দেহের রোমকূপের গোড়ায় বসে গেছে।
‘তোমার স্বামীর সন্দেহ করার রোগটা শুরু হল কবে থেকে?’
‘আট বছর আগে টাকাপয়সার গোলমাল করেছিলেন বলে সাসপেন্ড হন, এনকোয়ারি শুরু হয়। তখন বলতে শুরু করেন, আমাকে ফাঁসিয়েছে, বিশ্বাস করে স্যাংশন করেছিলুম, ঘুষ নিলে আজ এই চক্রান্তের শিকার হতুম না, অফিসের কয়েকজন আর দুজন কন্ট্রাক্টরের নাম করে মাঝরাতে বিছানায় বসে গালাগাল দিতেন। একটাই কথা বারবার বলতেন, এরপর লোকের কাছে মুখ দেখাব কেমন করে! এনকোয়ারিতে নির্দোষ প্রমাণ হন, কিন্তু বদলি করে ফুড ডিপার্টমেন্টে একটা তুচ্ছ চেয়ারে বসিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে ওর আচরণ কথাবার্তা অস্বাভাবিক হতে শুরু করে।’
‘তোমার উপর সন্দেহ শুরু হল কেন?’
‘সবার উপরই শুরু হয়, সব ব্যাপারেই উনি চক্রান্ত খোঁজেন আর সেটা দেখতে পান, বাড়ির সবাইকে উদব্যস্ত করে তুলতে থাকেন। ঝি-চাকরদের সঙ্গে ঝগড়া, ওরা নাকি চোর, মুদি ওজন মারছে, স্টেশনার দাম বেশি নিচ্ছে, ছেলে টাকা চুরি করছে, কী অশান্তিকর ব্যাপার যে। এর মধ্যে আমি একবার বলেছিলুম, ননদের বিয়েতে কুড়ি ভরি সোনা দিতে হয়েছিল, না দিলেই ভালো হত, এখন কেউ লাখটাকার সোনা গায়ে চাপিয়ে দেখায় না, লোকে হাসে। তা ছাড়া অত সোনা দেবার মতো অবস্থাও আমাদের নয়। শাশুড়ি তার ছেলেকে চাপ দিয়ে বাধ্য করে, বোনের জন্য এইটুকু স্যাক্রিফাইস করতে পারবে না? এতবড়ো ঘরে বোনের বিয়ে হবে! ঘর মানে চামড়ার ব্যবসা। কানপুরে জুতো চটি তৈরি করে। কুড়ি ভরি সোনা তার সঙ্গে আনুষঙ্গিক ফ্রিজ, টিভি, সোফা, খাট, বিছানা ইত্যাদি ইত্যাদি কেনার জন্য আরও পঞ্চাশ হাজার টাকা। এরপর লোক খাওয়াতে আরও হাজার পঞ্চাশ। অপরাধের মধ্যে আমি একদিন বলেছিলুম, এত টাকা তুমি ম্যানেজ করলে কোত্থেকে? ব্যস, তুলকালাম চিৎকার, আমি নাকি বলেছি বোনের বিয়ে দেবার জন্য ঘুষ নিয়েছি, বলেছি উনি করাপ্ট। এরপর উনি উঠেপড়ে প্রমাণ করার চেষ্টা শুরু করলেন আমি অন্য পুরুষের সঙ্গে মেন্টালি অ্যান্ড ফিজিক্যালি ইনভলভড। স্তম্ভিত হয়ে গেলুম, এত নীচে মানুষ নামতে পারে! বতু আমি তখনই আত্মহত্যার কথা ভেবেছিলুম।’
