দেবী বলল, ‘আচ্ছা বাসুদি, বড়দার চেহারার কোনো পরিবর্তন লক্ষ করছ? অনেক বছর পর তো দেখছ।’
‘অনেক বছর পর, কত বছর হল বতু?’
ব্রতীন অন্তত তিরিশ বছর পর বাসন্তীর মুখে তার নামটা উচ্চচারিত হতে শুনল, কেমন যেন নতুন-নতুন শোনাল। আজও তো পুরনো বন্ধুদের মুখে ‘বতু’ শুনেছে, কই এমনটা তো লাগল না।
‘পনেরো বছর।’
বাসন্তী ভ্রূ তুলে বলল, ‘পনেরো, মনে আছে তোমার!’
ব্রতীন স্মিত হেসে মাথা হেলাল। ‘মনে আছে সেদিন সবুজ শাড়ি, খয়েরি ব্লাউজ, দু-গাছা সোনার চুড়ি, একটা খয়েরি টিপও ছিল।’
‘দেখেছিস দেবী কী স্মৃতিশক্তি! উপপাদ্যগুলো ওর মতো মুখস্থ করতে পারলে মাধ্যমিকে একশোয় একানব্বুই না পেয়ে একশোই পেতুম।’ মুখ দেবীর দিকে ফিরিয়ে রেখে বাসন্তী তির্যকদৃষ্টিতে ব্রতীনের দিকে তাকিয়ে বলল। ব্রতীন লক্ষ করল বাসুর শরীর একটু ভারী হয়েছে, ফরসা গলায় দুটো খয়েরি দাগ, চিবুকের নীচে চর্বির পুঁটলি, তলপেট একটু উঁচু লাগছে, কপালে টিপ নেই, ভ্রূ আর পঞ্চমীর চাঁদের মতো বাঁকা নয়, কানের লতি খালি তবে চুড়ি দু-গাছা হাতে রয়েছে। ব্যাপার কী? তার চোখ আপনা থেকেই বাসুর সিঁথিতে উঠে গেল। সিঁথি চুলে ঢেকে রয়েছে, বোঝা গেল না কিছু। সে বিভ্রান্ত বোধ করল নিজের চিন্তা নিয়ে। বাসু বিধবা, এমন একটা ধারণা তার মনে এল কেন?
দেবী বলল, ‘বড়দার স্মৃতিশক্তির একটা পরীক্ষা নিই তা হলে। আচ্ছা তুমি তো পাঠশালায় পড়েছ ছোটোবেলায়, তখনকার পড়া একটা পদ্যের দুটো লাইন বলতে পারবে?’
দেবীর কথা শেষ হওয়া মাত্র ব্রতীন বলল, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড়ো হবে।’ দুটো লাইন হয়ে গেছে আরও বলব? ‘মুখে হাসি বুকে বল তেজে ভরা মন’-।’
‘থাক থাক, খুব হয়েছে।’ হাত তুলে বাসন্তী থামিয়ে দিল।
ব্রতীন বলল, ‘কার লেখা জানো, জীবনানন্দ দাশের মা কুসুমকুমারী দাশের। এটা অবশ্য পরে জেনেছি।’
হঠাৎ দেবী বলল, ‘চা খাবে বড়দা? বড়ো চা তেষ্টা পেয়েছে। বাসুদি?’
বাসন্তী বলল, ‘খাব।’
‘আমিও।’ ব্রতীন বলল।
দেবী ঘর থেকে বেরিয়ে চেঁচিয়ে দু-তিনবার কমলের মাকে ডেকে সাড়া না পেয়ে তিনতলায় উঠে গেল।
‘তোমাকে বেশ শুকনো দেখাচ্ছে, ‘ব্রতীন মৃদু স্বরে বলল, ঘরে পাশাপাশি শুধু দুজন খাটে বসে, পনেরো বছর পর দেখা, এখন আর কী বলা যায়! এমন একটা কথা সে বলল যার উত্তরে হাসা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। কিন্তু বাসন্তী হাসল না, বলল, ‘তোমাকে শেষ যেমনটি দেখেছি আজও তেমনটি রয়েছ।’
ব্রতীন হাসল, ‘বলেছিলে বর্ধমানে যাতায়াত করতে কষ্ট হয় কাজটা ছেড়ে দেবে, দিয়েছ?’
‘হ্যাঁ। তারপর বাগবাজারে উইমেনস কলেজে চার বছর কাজ করলাম, কলকাতাটাকে দক্ষিণ থেকে উত্তরে পুরো পার হয়ে বাসে যাতায়াত সে যে কী কষ্ট, ভাবতে পারো! তখনও মেট্রোরেল চালু হয়নি, হলে অর্ধেক কষ্ট কমত।’
বাসুর গলায় সেই সময়ের কষ্ট লেগে রয়েছে। ব্রতীন ভেবে পেল না, এত কষ্ট করে পড়াতে যাওয়া তো টাকার জন্য, কী এমন টাকার দরকার হল! ওর স্বামী তো সরকারি অফিসার, হাজার তেরো-চোদ্দো মাইনে এখন নিশ্চয় পায়। তাতে কি চলে যায় না!
‘একদিন ফেরার সময় মিনিবাসে অজ্ঞান হয়ে যাই অবশ্য মিনিটখানেক পরেই জ্ঞান ফিরে আসে, তারপরই চাকরিটা ছেড়ে দিই,’ বাসন্তী মুখটা নামিয়ে আবার তুলে জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ছাড়ার আগে অনেক ভাবতে হয়েছিল।’
‘কেন?’
‘বাড়িটা করার জন্য ধার করতে হয়েছিল সেটা তখনও শোধ হয়নি। তখন ওঁর কিডনির অসুখটা শুরু হয়েছে, ননদের জন্য ভালো একটা সম্বন্ধ এসেছে কানপুর থেকে, তারা বিয়েটা তাড়াতাড়ি দিতে চান, সেও অনেক টাকার ধাক্কা। তার উপর আমার হার্টের প্রবলেম, কী করব ভেবে ভেবে রাতে ঘুম আসে না, শ্বশুর শাশুড়ি চাননি আমি চাকরি ছাড়ি।’
‘তোমার স্বামী?’
‘তিনিও চাননি, তারপর আবার একদিন অজ্ঞান হয়ে পড়লুম, তবে বাসে নয় বাড়িতেই।’ বাসন্তী মুখ টিপে হাসল এমনভাবে যেন খুব মজার একটা ঘটনার কথা বলছে। ‘ডাক্তার চার-পাঁচ রকম পরীক্ষা করল, শেষে বলল স্ট্রেস থেকে তৈরি হাইপার টেনশনে ভুগছি, এখুনি চাকরিটা ছাড়া দরকার। শুনে আমার কী আনন্দ যে হল, পরের সপ্তাহেই চাকরিতে ইস্তফা দিলুম। আমার চা খাওয়া কিন্তু উচিত নয়।’
‘তা হলে খেয়ো না।’
‘না না খাব, এক কাপ খেলে কিছু হবে না। দেবী বোধহয় চা নিজেই করে আনছে।’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাসন্তী চিন্তিত মুখে বলল, ‘ও কি এভাবেই জীবন কাটাবে? বয়স তো খুবই কম আটাশ-উনত্রিশ, ওর কিছু একটা ব্যবস্থা করো।’
‘আটাশ-উনত্রিশ খুব কম বয়েস নয়, ব্যবস্থা মানে তো বিয়ে। কাকা বিজ্ঞাপন দেখে কথাবার্তা বলে বিয়ে দিয়েছিলেন। এবার দেবী নিজেই দেখেশুনে বিয়ে করুক। দেখতে ভালো, লেখাপড়া জানে, বুদ্ধিমতী, পার্সোনালিটি আছে, সবথেকে বড়ো কথা মায়া-মমতা সেটা ওর অ্যাডিশনাল প্লাস পয়েন্ট। তুমিই তো দেবীকে বলতে পারো।’
‘ঠারেঠোরে বলেছি, খুব একটা গা করল না। তুমি ঘরের লোক, বলে দেখতে পারো। ভালো কথা, উমাপদবাবুকে মনে আছে?’
‘থাকবে না! ওঁর কৃপাতেই তো লেখাপড়ার বনেদটা তৈরি হয়েছে, আমার আর তোমারও।’
একশোবার। উমাপদবাবু পণ্ডিচেরিতে চলে যান, শুনলাম সেখানেই মারা গেছেন।’
